সার্ভারে ঢুকে ১৮ রোহিঙ্গার জন্মনিবন্ধন সনদ ইস্যু করল হ্যাকাররা!

50

 

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে জন্মনিবন্ধন সনদ ইস্যুর জন্য সুরক্ষিত সার্ভারে ঢুকে পড়লেন হ্যাকাররা। শুধু ঢুকেই থেমে থাকেননি। একে একে ১৮টি জন্মনিবন্ধন সনদ ইস্যুও করে বসলেন তারা। বিষয়টি কর্পোরেশনের নজরে আসার পর নগরীর দুই থানায় ঠুকে দেয়া হল তিনটি মামলা। মামলায় কার কার নামে এবং কোন কোন ঠিকানা ব্যবহার করে জন্মনিবন্ধন সনদ ইস্যু করা হয়েছে তার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। এ নিয়ে তোলপাড় চলছে। ষ্পর্শকাতর এ ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলো তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট চট্টগ্রাম। এসব জন্মসনদের মধ্যে ৪০নং উত্তর পতেঙ্গা ওয়ার্ড থেকে ৭টি, ৪১নং দক্ষিণ পতেঙ্গা ওয়ার্ড থেকে ৪টি এবং চকবাজার ওয়ার্ড থেকে ৭টি ইস্যু করা হয়। চকবাজার ওয়ার্ড থেকে ইস্যু দেখানো সনদগুলোতে ৭ জনই বর্তমান ঠিকানার কলামে নগরীর ঠিকানা ব্যবহার করেছেন। আর বাকী ১১টিতে স্থায়ী ও বর্তমান দুই ঠিকানাই ব্যবহার করা হয়েছে কক্সবাজার জেলা। ১৮টি সনদই হ্যাকাররা রোহিঙ্গাদের জন্য ইস্যু করেছেন বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
চট্টগ্রাম আদালতের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে প্রাপ্ত মামলার এসব এজাহারে থাকা তথ্যের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সিটি কর্পোরেশনের আইন কর্মকর্তা (যুগ্ম জজ) মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানান, সিটি কর্পোরেশনের তিনটি ওয়ার্ডের সার্ভার হ্যাক করে মোট ১৮টি জন্মসনদ ইস্যু করা হয়। এ নিয়ে পতেঙ্গা থানায় দুটি এবং চকবাজার থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। এ ব্যাপারে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কাজ চলছে বলেও জানান কর্পোরেশনের এ আইন কর্মকর্তা।
উত্তর পতেঙ্গা ওয়ার্ড থেকে ইস্যু হওয়া জন্মনিবন্ধনের বিষয়ে ওই ওয়ার্ডের জন্মনিবন্ধন সহকারি মো. এমদাদুল হকের দায়ের করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, সিটি কর্পোরেশনের যাবতীয় জন্মনিবন্ধন বর্তমানে অনলাইনে সফটওয়্যারের মাধ্যমে করা হয়। জন্মনিবন্ধন সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্যাবলীর জন্য জন্মনিবন্ধন সহকারির আইডিতে আসে। এরপর অধিকতর যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলরের আইডিতে পাঠানো হয়। সেখানে যাচাই সাপেক্ষে রেজিস্ট্রেশন নম্বর প্রদান করার পর আবার নিবন্ধন সহকারির কাছে পাঠানো হয়। জন্মনিবন্ধন সার্টিফিকেট কাগজে প্রিন্ট হলে সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলর স্বাক্ষর করেন। করোনা পরিস্থিতির এ সময়ে সফটওয়্যার হালনাগাদ কার্যক্রম চলার কারণে গত ৮ ফেব্রæয়ারি থেকে জন্মনিবন্ধন সনদ ইস্যু বন্ধ রাখা হয়। এ সময়ের মধ্যে উত্তর পতেঙ্গা ওয়ার্ড অফিস থেকে কোন জন্মনিবন্ধন সনদ ইস্যু করা হয়নি। সফটওয়্যার হালনাগাদ কার্যক্রম শেষ হলে আবার শুরু হয় নিবন্ধন। এরই প্রেক্ষিতে নিয়ম অনুসারে গত ২৮ ফেব্রæয়ারি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে নতুন করে পাসওয়ার্ড ইস্যু করা হয়। এ পাসওয়ার্ড দিয়ে ১ মার্চ থেকে কাজ শুরু করতে গেলে দেখা যায় সার্ভার হ্যাক হয়েছে। তাছাড়া হ্যাকাররা জন্মনিবন্ধন রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত ইউজার আইডিতে প্রবেশ গত ১৪ ফেব্রূয়ারি ৭টি নতুন জন্মনিবন্ধন সনদ ইস্যু করে। এসব সনদ ইস্যু করতে যাদের নাম ঠিকানা ইস্যু করা হয়েছে তারা হলেন টেকনাফের হোয়াইক্যং এলাকার মও. নুরুল আলমের মেয়ে মোছাম্মৎ সোমাইয়া, টেকনাফ ডেইলপাড়া এলাকার মৃত মো. আয়াছের মেয়ে নাজমা বেগম, টেকনাফ সদরের মোহাম্মদ আবদুল্লাহর মেয়ে ফাতেমা খাতুন, কক্সবাজার ভারুয়াখালী এলাকার ফরিদুল আলমের মেয়ে রোকেল, কক্সবাজার উত্তর কলাতলী এলাকার ছৈয়দ আলমের মেয়ে ছফুরা বেগম, রামু এলাকার মো. ইউনুছ এর ছেলে মো. আরিফুল ইসলাম আরিফ ও টেকনাফ পৌরসভা এলাকার কালামিয়ার ছেলে মোহাম্মদ মোবারক।
মামলাগুলোর এজাহারে অজ্ঞাতনামা হ্যাকারদের আসামি করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ এর ২২, ২৪, ২৬, ৩৩ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। ৮ জুন পতেঙ্গা থানায় এ মামলা দায়ের করা হয়। এর আগে এ ঘটনায় গত ৪ মার্চ সাধারণ ডায়েরিও করা হয়।
এদিকে দক্ষিণ পতেঙ্গা ওয়ার্ডে একই কায়দায় চারটি জন্মসনদ ইস্যু করার কারণে ওই ওয়ার্ডের জন্মনিবন্ধন সহকারি রতন কুমার চৌধুরী পতেঙ্গা থানায় আরেকটি মামলা দায়ের করে প্রতিকার চান। ৮ জুন দায়ের করা এ মামলার এজাহারও একই ধরনের। জন্মনিবন্ধনগুলো যাদের নামে ইস্যু দেখানো হয়েছে তারা হচ্ছেন টেকনাফ পৌরসভার বশির আহমদের মেয়ে হামিদা বেগম, রামুর গর্জনিয়া এলাকার কবির হোসেনের মেয়ে সাহেনা, একই এলাকার আলী হোসনের ছেলে মিনার ও টেকনাফ পৌরসভা এলাকার আবুল কালাম সুমি আক্তার।
এ বিষয়ে পতেঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ জোবায়ের সৈয়দ বলেন, সার্ভার হ্যাক হওয়ার ঘটনায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এগুলো গ্রহণ করে কাউন্টার টেরোজিম ইউনিটে পাঠানো হয়েছে। তদন্তে বেরিয়ে আসবে কারা এর পেছনে রয়েছে।
অন্যদিকে চকবাজার ওয়ার্ড থেকে ৭টি জন্মসনদ ইস্যু করা নিয়ে এজাহার দাখিল করেন ওই ওয়ার্ডের জন্মনিবন্ধন সহকারি মোহাম্মদ আহাসান করিম। তার দেয়া এজাহারের তথ্যগুলোও একই। ৯ জুন চকবাজার থানায় দায়ের করা মামলাটিতে অজ্ঞাত হ্যাকারদের বিরুদ্ধে উল্লেখিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে অভিযোগ আনা হয়েছে। হ্যাকাররা সনদ ইস্যুতে যাদের নাম ঠিকানা ব্যবহার করেছেন তারা হচ্ছেন আহমদ ছবির মেয়ে রিনা আক্তার। রিনা আক্তারের স্থায়ী ঠিকানা চকরিয়ার মাইজপাড়া দেখানো হলেও বর্তমান ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে ২৫৯, জমিলা হাউস, নবাব সিরাজউদ্দৌলা রোডে। একই ধরনের বর্তমান ঠিকানা ব্যবহার করে সনদ ইস্যু দেখানো হয়েছে শেখ মামুন মোরশেদের ছেলে মোস্তাছির মোর্শেদ ওয়াছি, জানে আলমের মেয়ে রাশেদা বেগম ও মো. ছিদ্দিকের ছেলে তকদির উল্লাহ’র। অবশ্য তাদের স্থায়ী ঠিকানা দেখানো হয়েছে কক্সবাজার জেলাতেই। তাছাড়া চকবাজার জয়নগর এলাকার ঠিকানা ব্যবহার করে আনোয়ার নামের একজনের মেয়ে হিসেবে তাসলিমা আকতারের সনদ ইস্যু করে হ্যাকাররা। ঠিক একই ধরনের ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে হায়দার আলীর ছেলে মো. আকবর ও মুহাম্মদ শামসুল আলমের ছেলে মুহাম্মদ মুনিরুল মান্নানের জন্মসনদ ইস্যু দেখানোর ক্ষেত্রে।
এ বিষয়ে চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলমগীর জানান, এ ধরনের একটি এজাহার আমরা পেয়েছি। এতে ৭ জনের নামে জন্মসনদ ইস্যুর বিষয়টি রয়েছে এজাহারে। মামলাটি রেকর্ড করে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে বলেও জানান এ পুলিশ কর্মকর্তা।
এ ব্যাপারে কাউন্টার টেরোজিম ইউনিটের অতিরিক্ত কমিশনার আহমদ পিয়ার জানান, সার্ভার হ্যাক করা মামলার বিষয়টি জেনেছি। তবে এখনও মামলার ফাইল আসেনি। ফাইল আসলে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় কাজ শুরু করে জড়িতদের খুঁজে বের করবো।
সিটি কর্পোরেশনের আইন কর্মকর্তা (যুগ্ম জজ) মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, এ রোহিঙ্গারা চট্টগ্রাম শহরে এসে হ্যাকারের মাধ্যমে জন্মসনদ ইস্যু করার এ কান্ড ঘটিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ যেসব সনদ ইস্যু করা হয়েছে তাদের সকলেরই স্থায়ী ঠিকানা কক্সবাজার, টেকনাফ ও চকরিয়ায়।