সারাদেশে ভূমিকম্প প্রাকৃতিক দুর্যোগে সচেতনতা জরুরি

17

 

২৬ নভেম্বর ভোরে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে এক প্রচন্ড ভূমিকম্প অনুভূত হয়। যাদের ভোরে জাগার অভ্যাস আছে এবং যারা ফজরের নামাজ পড়তে জেগে ছিল, তারা বিগত শুক্রবার ভোরে ওই ভূ-কম্পন প্রকৃতি ভালোভাবে অনুভব করেছে। ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধিত হবার পর হতে পৃথিবীব্যাপী ভূমিকম্প বেড়ে গেছে। বিশ্বে তুলনামূলকভাবে জাপানে ভূমিকম্প বেশি হয়। তাছাড়া ইরান, ভারত, বাংলাদেশসহ বহু দেশে বর্তমানে ভূমিকম্প বেড়ে গেছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের নানা কর্মকাÐের কারণে বিশ্বে ভূমিকম্পের মাত্রা এবং সংখ্যা দু’ই বাড়ছে। ভূমিকম্প প্রাকৃতিক বিষয় হলেও এর সাথে মানবজাতির সংশ্লিষ্টতা উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। ইসলাম ধর্মে ভূমিকম্পকে আল্লাহ্ গজব হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কেয়ামত বা মহা প্রলয়ে প্রচন্ড ভূমিকম্পে সমগ্র পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে এমন মত পবিত্র ঐশীগ্রন্থ আল কোরআন ও মহানবীর (দ.) হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে এক সময় আমাদের দেশে পুকুর, দিঘি, ঝর্ণা, ছড়া এবং নদীর পানির উপর দেশের মানুষের জীবন নির্ভরশীল ছিল। আধুনিক সভ্যতার বিকাশের পর মানুষ নগরায়নের সূত্রে আবদ্ধ হয়ে দেশের পুকুর, দিঘি, নদী-নালা ভরাট করে নানা কর্মকান্ড পরিচালনা করছে। যার ফলে পানীয় জল ও ব্যবহারিক জলের অভাব পড়ায় ভূ-পৃষ্ঠের অভ্যন্তরে জমা পানি নলকূপ ও গভীর নলকূপ হনন করে মানুষ পানির চাহিদা মিটাতে শুরু করেছে। শুধু আমাদের দেশ নয়, সমগ্র বিশ্বের অবস্থা একই রকম। ভূ-পৃষ্ঠের গভীরে জমা পানি উত্তোলনের ফলে ভূ-পৃষ্ঠের স্বাভাবিক অবস্থানে পরিবর্তন আসছে। ক্রমে তলিয়ে যাচ্ছে মাটি। পবিত্র কোরআনের ভাষায় ‘পাহাড় পৃথিবীর গ্রাফি বা পেরেক’, সে পেরেক কেটে মানুষ প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করছে। তাছাড়া মানবজাতি বিজ্ঞানের সহায়তায় মারাত্মক রাসয়নিকও পারমানবিক অস্ত্র তৈরি করে তা পৃথিবীর পৃষ্ঠে নানা কৌশলে পরীক্ষাকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব ভূ-পৃষ্ঠের মাটি ও সমুদ্রর পানির কার্যকারিতাকে বিনষ্ট করছে। পৃথিবীর তলদেশ থেকে জমাথাকা তেল, পানি, গ্যাস, লৌহা, কয়লা ইত্যাদি খনিজ দ্রব্য মানুষ উত্তোলন করে সভ্যতা ও প্রগতিকে করছে শাণিত। অথচ মানুষের এ সকল কর্মকান্ড পৃথিবীকে মানব বসবাসের অতিযোগ্য করার এ প্রয়াস পৃথিবী ধ্বংসের পথকে সুগম করছে। বিশ্ব মানবের এ সকল উন্নয়ন প্রক্রিয়া একদিন মানবজাতিসহ সমগ্র সৃষ্টি জগৎকে ধ্বংসের দারপ্রান্তে নিয়ে যাবে। তারপর এক সময় পৃথিবীর স্থলভাগ তিনভাগ জলের নিচে তলিয়ে যাবে। সমুদ্রে জলোচ্ছ্বাস ও সুনামি বাড়বে। ঘন ঘন ভূমিকম্পের কারণে এক সময় আমাদের দেশসহ সমগ্র পৃথিবীর দেশসমূহের স্থাপনা ধ্বংস হয়ে পড়বে। ঘটবে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। প্রকৃতির অন্যান্য জীব-জন্তু, কীট-পতঙ্গসহ সামগ্রিক প্রাকৃতিক পরিবেশ ভঙ্গুর হয়ে পড়বে। আমাদের প্রগতির উৎকর্ষ আমাদের ধ্বংস করে দেবে। এ ধ্বংসের হাত থেকে পৃথিবীর কোন কিছুই রক্ষা পাবে বলে মনে হয় না। প্রাকৃতিক পরিবেশকে কৃত্রিম পরিবেশ যখন আগ্রাসন করছে, এমতাবস্থায় পৃথিবীতে ভূমিকম্পের মাত্রা ও সংখ্যা বাড়তে থাকবে। ভূমিকম্পের ভয়াবহতা রক্ষার কোন অস্ত্র এখনো মানবজাতি আবিষ্কার করতে পারেনি। অদূর ভবিষ্যতে আবিষ্কার করতে পারবে বলেও মনে হয় না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ তথা ভূমিকম্প, সুনামি, ঝড়, বজ্রপাত, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদির ভয়াবহতাকে প্রতিরোধ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু বিশ্বের মানুষ প্রাকৃতিকভাবে জীবন যাপনে অধিক মনযোগী হলে বিচিত্র দুর্যোগের মাত্রা কম হতে পারে। উপস্থিত ক্ষেত্রে বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ তার বুদ্ধির জোরে বিপদ কাটিয়ে উঠতে পারে। তাই যেকোন প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষ সতর্কভাবে পদক্ষেপ নিতে পারলে অধিক ক্ষতির হাত হতে রক্ষা পাবার সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। গৃহ নির্মাণ হতে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে আগাম সর্তকতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
গেল ২৬ নভেম্বরের ভূমিকম্পে চট্টগ্রাম মহানগরীতে তিনটি ভবন হেলে গেছে। যা দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার প্রতিবেদন হতে জানতে পেরেছি। ভবনের মালিকরা ভবন নির্মাণের পূর্বে সচেতনতা অবলম্বন করলে হয়তো এমনটা ঘটতো না। ভূমিকম্পের সময় সম্ভব হলে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করা ভালো। এতে প্রাণ নাশের সম্ভাবনা কম থাকে। কিন্তু মৃত্যুদূত চলে আসলে মানুষের পক্ষে জীবনরক্ষা সম্ভব নয়। বিজ্ঞান এবং আধুনিক প্রযুক্তি ভূমিকম্পের উৎপত্তি স্থল চিহ্নিত করতে পারে, ভূমিকম্পের মাত্রা পরিমাপ করতে পারে। কিন্ত ভূমিকম্প প্রতিরোধ করতে পারে না। শুধু ভূমিকম্প নয়, কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষ এবং মানব সৃষ্ট বিজ্ঞান প্রতিরোধের ক্ষমতা তৈরি করতে পারেনি। ভবিষ্যতে পারবে কিনা তার কোন নিশ্চয়তা বিজ্ঞান এখনো দিতে পারেনি, পারবে কিনা তাতেও সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। তাই ভূমিকম্পের সময় করণীয় কি সে সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষে দেশের প্রচার মাধ্যম ভূমিকা রাখা জরুরি।
বিগত ভূমিকম্পে বেশির ভাগ মানুষ ঘুমের মধ্যে ছিল। এর কারণ দেশে ভোরে ঘুম থেকে ওঠার সংস্কৃতি এখন প্রায় বিলুপ্ত। মানুষ সারাদিন বিচিত্র কাজে ব্যস্ত থাকে। আবার বিজ্ঞান প্রযুক্তি মানুষের হাতে মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ফেইজবুক, টুইটার, গেইম, পর্ণছবি ইত্যাদি ধরিয়ে দিয়েছে। যার ফলে রাতে ঠিক সময়ে না ঘুমিয়ে রাতের অর্ধেকের বেশিসময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তথা মোবাইলের বিভিন্ন কর্মকান্ড কাটিয়ে দিচ্ছে অসংখ্য মানুষ। যার কারণে এদেশে আটটার পূর্বে অধিকাংশ নর-নারীর ভোর হয় না। ফলে সম্প্রতি ভূমিকম্প সম্পর্কে অনেকেই অবগতও নয়। কিন্তু একথা তো সত্য যে, কোনো ভবন ভূমিকম্পে ধসে পড়লে ঘুমের মধ্যে চিরঘুমের কোলে উক্ত ভবনের বাসিন্দাদের নিয়ে যেতে পারতো ভূমিকম্প। আল্লাহ্ করুক এমন পরিস্থিতিও তো মানুষের কর্মকাÐের ফল বটে। এ জন্যে ‘আরলি টু রাইচ, আরলি টু ব্যাড’ নৈতিক ইংরেজি প্রবাদ। আর পবিত্র হাদিস বলে রাতে যতদ্রæত সম্ভব ঘুমানো উত্তম এবং ভোরে ঘুম থেকে ওঠাই উত্তম। দেশের মানুষকে প্রযুক্তি ও প্রগতি নিয়ম হতে সম্পূর্ণ বিচ্যুত করে ফেলেছে। ঘুম শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বস্তু। অথচ এ ঘুমকে প্রযুক্তির কারণে নষ্ট করে অনেকে শরীরকে নানা রোগের দারস্ত করছে। এমন অভ্যাস পরিত্যাগ করার মধ্যে দেশের মানুষের কল্যাণ আছে। অবশেষে বলতে চাই ভূমিকম্পসহ সব ধরনের দুর্যোগ থেকে রক্ষা পেতে সচেতন হওয়া জরুরি। কৃত্রিম পরিবেশের চেয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রতি পৃথিবীর মানুষের আগ্রহ বাড়ানো উচিৎ। প্রকৃতি ধ্বংসের খেলা থেকে মানুষ বিরত হলে পৃথিবীতে ভূমিম্পসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ কমে আসবে এমন ধারণা প্রকৃতি বিজ্ঞানীদের।