সাধারণ মানুষের মাছ ধরার ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে পরিবেশ সংরক্ষণে সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি

12

‘মাছে ভাতে বাঙালি’। এ প্রবাদ কমবেশি সকলেরই জানা। নদীমাতৃক এদেশে ছড়া, খাল, বিল, নদী, সমূদ্র, দিঘি, পুকুর, ডোবা সবখানে এক সময় মাছ পাওয়া যেত। গোলাভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ বাঙালির ঐতিহ্য। বাঙালিরা ঝাঁকি জাল, লুইজাল, চাই, ডুক, পলই ইত্যাদি দেশিয় মাছ ধরার উপকরণ ব্যবহার করতো। অধিকাংশ লোক বাজার থেকে মাছ না কিনে খাল-বিল, দিঘি, পুকুর ডোবা ইত্যাদিতে ঝাঁকিজাল ব্যবহার করে মাছ ধরে টাটকা মাছ খেতে পারতো। ধীবর সমাজের লোকেরা টাউঙ্গা জাল, বিন্তিজাল, ঝাঁকিজাল, লুইজাল ইত্যাদি ব্যবহার করতো মাছ ধরার কাজে। ধীবররা মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতো। সমুদ্রের মাছ এবং নদীর মাছের উপর অনেকখানি জেলেদের ভরসা করতে হতো। মাঝে মধ্যে এক শ্রেণির জেলে পুকুরে জাল টেনে মাছ ধরতে দেখা যেত। টানা জালের উপর নির্ভরশীল ছিল অনেক জেলে পরিবার। বর্তমানে প্রাকৃতিক পরিবেশের নানারকম বিবর্তনের ফলে মাছ ধরার পরিবেশ সীমিত হয়ে এসেছে। আমরা জমিতে অধিক ফলনের আশায় রাসায়নিক সার ও বিষ অধিক পরিমানে ব্যবহার করতে গিয়ে জমি, ছড়া, বিল ইত্যাদিতে মাছের প্রজণন ধ্বংস করেছি। বর্তমানে ধানের ভালো ফলন হলেও বর্ষা মৌসুমে ধানক্ষেতে ধান কাটার সময় মাছ পাওয়া যায় না। পুকুর সমূহে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মাছ চাষের ফলে ব্যক্তিগত স্বাধীন পুকুরের সংখ্যা খুবই কমে গেছে। তাছাড়া নগরায়ন, বাড়িঘর, দোকানপাট সৃষ্টির আধিক্যের কারণে দেশের বহু পুকুর, দিঘি, ডোবা, ঝিল, হাওর ইত্যাদি ভরাট হয়ে গেছে। যে কারণে ঝাঁকিজালে মাছ ধরার সুযোগ কমে এসেছে জন সাধারণের মধ্যে। দেশে পুকুর, ডোবা ভরাটের কারণে মাছ ধরার কাজে ব্যাপক হারে জালের ব্যবহার কমে গেছে। বড়শি দিয়ে মাছ ধরার প্রবণতা ও বর্তমানে অনেক খানি কমে গেছে। যে সকল পুকুর এখনো তার অস্তিত্ব নিয়ে বেঁচে আছে, তাদের মধ্যে বড়শি দিয়ে মাছ ধরার আনন্দ পাওয়ার মতো বড় আকারের মাছ থাকতে দেখা যায় না। প্রতিবছর এবং বছরে বেশ কয়বার টানা জালে মাছ ধরে খাওয়া বা বিক্রির ফলে পুকুরে বড় সাইজের মাছ নেই বললেই চলে। বর্ষাকালে কিছুটা বাঁকি জালে মাছ ধরার প্রবণতা কারো কারো থাকলেও অনেক খানি সীমিত হয়ে আছে। তাছাড়া চাই, ডুক, পলই ইত্যাদি মাছ ধরার উপকরণ এখন স্বাধীনভাবে যেখানে সেখানে বসিয়ে মাছ ধরার পরিবেশ খুবই সীমিত। জমির আইলে, ছড়ায়, জলাশায়ে জাল ছাড়াও যেসব মাছ ধরার উপকরণ ব্যবহার করা হতো সেই পরিবেশ মানুষ সীমিত করে তোলায় এখন জালসহ মাছ ধরার ঐতিহ্যগত উপকরণ ব্যবহার খুব একটা হচ্ছে না।
দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার প্রতিবেদনে জালসহ মাছ ধরার এ বিষয়টি বিস্তারিত ভাবে উঠে এসেছে। তার পরও আমরা বলতে চাই আমাদের মাছে ভাতে বাঙালির ঐতিহ্যকে আগামী প্রজন্মের জন্য ধরে রাখার স্বার্থে দেশের জলাশায়, পুকুর, দীঘি, খাল ইত্যাদি ভরাট বন্ধ করা জরুরি। সাধারণ মানুষের মাছ ধরার ঐতিহ্যগত রীতি দেশে অব্যাহত রাখতে নগরায়ন ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে মাছের বসবাসের পরিবেশের প্রতি যত্নশীল হওয়া সরকারসহ সকল নাগরিকের কর্তব্য।