সাজেক : বাংলাদেশের দার্জিলিং-১

10

প্রফেসর ড. নারায়ন বৈদ্য

ছোটবেলায় একটি কবিতা প্রায়ই মনকে নাড়া দিত। কবিতাটি হচ্ছে, “দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে শুধু দুইপা ফেলিয়া, একটি ধানের শীর্ষের উপর, একটি শিশির বিন্দু”। হ্যাঁ! ঘর হতে দুই পা ফেলিয়া কোথাও যাওয়া হয়নি। নিজের প্রয়োজনে অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কলেজগুলোতে বহিঃপরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়েছি। যেহেতু প্রায় ৩৬ বছর বিভিন্ন সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেছি সেহেতু বহিঃ পরীক্ষক হিসেবে যাওয়াটা আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তাই গিয়েছি। আর নিজের প্রয়োজনে বা কলেজের প্রয়োজনে বহুবার ঢাকা গিয়েছি। বাংলাদেশ দেখা আমার এতটুকু। অবশ্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে ঢাকাতে মাসের পর মাস অবস্থান করতে হয়েছে। এসব প্রশিক্ষণের প্রত্যেকটিতে ছিল ট্যুর। ফলে বাংলাদেশে এক এক অঞ্চলে এক এক সময় গিয়েছি। কিন্তু স্ত্রী, পুত্র পরিবার নিয়ে যাওয়াটা তেমন হয়ে উঠেনি। অবশ্য ১৯৯৬ সালে সিটি কলেজে অধ্যাপনা করার সময়কালে অর্থনীতি বিভাগ থেকে প্রায় ৩০ জন ছাত্র নিয়ে আমরা ৬ জন অধ্যাপক ছাত্রদের সাথে স্ত্রী পুত্র পরিবার নিয়ে গিয়েছিলাম। এ সময়ে ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের বেশকিছু জায়গায় ভ্রমণ করেছিলাম। সে সময় আমরা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, আগ্রা, জয়পুর, দিল্লী ইত্যাদি অঞ্চলে প্রায় ২৪ দিনের ট্যুর করেছিলাম। এরপর প্রায় ২০১৮ সাল পর্যন্ত কোথায়ও যাওয়া হয়নি। অবশেষে ২০১৯ সালে অক্টোবর মাসে দার্জিলিং ও নেপাল যাওয়ার জন্য স্থির করি। অনলাইনে খবরাখবর নেয়া শুরু করি। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশের বর্ডার চেংড়াবান্দা হয়ে যদি শিলিগুড়ি যাওয়া যায়, তবে শিলিগুড়ি থেকে ভিসা নিয়ে নেপাল ও ভুটান যাওয়া যায়। আবার শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিংও যাওয়া যায়। তবে ভিসা নেয়ার সময় চেংড়াবান্দা বর্ডারের ভিসা নিতে হবে। যদি ভিসাতে চেংড়াবান্দা বর্ডার উল্লেখ না থাকে তবে সে পথে যাওয়া যাবে না। অতএব একজন অভিজ্ঞ লোকের পরামর্শ নিয়ে যথাসময়ে ভিসা নিলাম। আবার চেংড়াবান্দা বর্ডার হয়ে যাওয়ার জন্য চট্টগ্রাম থেকে কোন বাস পেলাম না। অতএব ঢাকা থেকে শ্যামলী বাসের টিকেট করে কোরবানের আগের দিন রাওয়ানা হলাম। সকালে ট্রেনে ঢাকা গিয়ে রাত ১০.০০ টায় শ্যামলীর এসি বাসে চেংড়াবান্দার দিকে রাওয়ানা হলাম। পরের দিন দুপুর ১.০০ টায় চেংড়াবান্দা পৌঁছলাম। শ্যামলীর পরিপাটি সুন্দর রেস্টহাউসে একটু রিফ্রেশ হয়ে ঘন্টাখানেক বিশ্রাম নিয়ে বিকাল ২.৩০ মিঃ আমরা বর্ডার পার করলাম। বর্ডার পার করে ভাত খেয়ে শ্যামলীর বাসে করে শিলিগুড়ির দিকে রাওয়ানা হলাম। রাত ৮.০০ টায় আমাদেরকে শিলিগুড়ি টাউনে পৌঁছিয়ে দেয়। সেই রাত শিলিগুড়ি একটা হোটেলে কাটিয়ে পরের দিন সকাল ১১.০০ টায় একটি জীপ ভাড়া করে দার্জিলিং এর দিকে রাওয়ানা হলাম। আমি বাংলাদেশ থেকে আমার এক আত্মীয়ের মাধ্যমে দার্জিলিং এর একটি হোটেল বুকড্ করে রেখেছিলাম। হোটেলের নাম বলাতে জীপ ড্রাইভার আমাদেরকে ঐ হোটেলেই পৌঁছিয়ে দেয়। অদ্ভুত আঁকা বাঁকা পথ বেয়ে দার্জিলিং এ পৌঁছা এক দারুন অভিজ্ঞতা। অবশ্য পরবর্তীতে আমাদের আর নেপাল বা ভুটান যাওয়া হয়নি। কারণ ভুটান সরকার সে সময়ে যে কোন কারণে বাংলাদেশীদের প্রবেশে অনুমতি দেয়নি। আর নেপালে যাওয়ার জন্য যদি শিলিগুড়ি থেকে ভিসা গ্রহণ করি তবে ভারত নাকি পরবর্তীতে ভিসা দেবে না। ফলে পাঁচ দিন পর আমরা কলিকাতায় চলে আসি।
শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং যাওয়ার যে অভিজ্ঞতা তা আমাকে মনে করিয়ে দেয় যখন আমি বাংলাদেশের সাজেকে যাচ্ছিলাম। পাহাড়ের আঁকা-বাঁকা পথ মনে হয় একই। সাজেকে যাওয়ার জন্য ২৩ ফেব্রæয়ারী ২০২৩ বৃহস্পতিবার বিকাল ৩.০০ টার বাসে রাওয়ানা হলাম। আমাদের বহরে ছিলাম আমরা ৮ জন। আমার ছোট বোনটি থাকে পানছড়িতে। তাই আমাদের উদ্দেশ্য ছিল ২৩ ফেব্রæয়ারী পানছড়ি গিয়ে ২৩ তারিখ ও ২৪ তারিখ পানছড়িতে কাটাবো। ২৪ ফেব্রুয়ারী বিকালে পানছড়ি থেকে টেক্সি নিয়ে প্রথমে ‘মায়াবিনী পর্যটক লেক’-এ গমন করি। এ পর্যটক লেকটা এত সুন্দর যে, বিশাল লেকের এক অংশ থেকে অন্য অংশে যাওয়ার জন্য বাঁশের সাঁকো দেয়া হয়েছে যা আমাকে আমার ছোটকালের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। এ লেক-এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ছোট ছোট পাহাড় বা টিলা আছে যা লেকের ভেতর দিয়ে যেতে হবে। মায়াবিনী লেকের মধ্যে প্রতিটি ছোট ছোট পাহাড়ে বসার জায়গা, দোলনা এবং ছোট ছোট দোকান রয়েছে। পড়ন্ত বেলায় নিস্তেজ সূর্য্যরে আলোতে বসে চা খেতে বড়ই ভাল লাগে। ছোট ছোট পাহাড় বা টিলার মধ্যে রয়েছে অসংখ্য লতাফুল ও রং বেরং এর কাগজী ফুল, যেখানে দাঁড়িয়ে বা বসে ছবি তুলতে অসম্ভব সুন্দর হয়। তাছাড়া রয়েছে অসংখ্য আম গাছ। এসব ছোট ছোট আম গাছেও আমের বোল এসে বসন্তের আগমনী বার্তা ঘোষণা করছে। আছে ছোট একটি চিড়িয়াখানা। যেখানে রয়েছে বানর ও অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী। অবশ্য এ লেকে ঢোকার সময় জনপ্রতি ৩০/- টাকার টিকেট কাটতে হয়। আমার ছোট বোনের জামাই এর কাছ থেকে জানতে পারলাম, এখানে আরো একটি সুন্দর জায়গা আছে। এ জায়গাটির নাম ‘পানছড়ি শান্তিপুর অরণ্য কুটির’। বেলা ডুবার আগে মায়াবিনী ত্যাগ করে অরণ্য কুটিরের দিকে রাওয়ানা হলাম। টেক্সি ড্রাইভার খুবই স্মার্ট। সে গ্রামের ভেতর পিসঢালা পথ দিয়ে দ্রুতগতিতে টেক্সি চালিয়ে মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে আমাদেরকে অরণ্য কুটির পৌঁছিয়ে দিল। অরণ্য কুটিরে ঢোকার জন্য কোন প্রবেশ ফি লাগে না। কিন্তু বিশাল সমতল জায়গার ওপর অরণ্য কুটির নির্মাণ করা হয়েছে। প্রথমে একটি গাড়ী রাখার ছাউনি। উক্ত ছাউনিতে অন্তত ১৫০ থেকে ২০০টি গাড়ী রাখা যাবে। এতে বুঝা যায়, বৎসরের নির্দিষ্ট কোন সময়ে অরণ্য কুটিরে বিশাল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ আয়োজনে সম্ভবত দেশ ও বিদেশ থেকে বেশকিছু অতিথি আসে। আর একটু সামনের দিকে আগালে দেখা যায়, বিশাল একটি বুদ্ধ মূর্তি। মূর্তিটি অন্তত ৫০ হাত উঁচু। সুন্দর, পরিচ্ছন্ন এ অরণ্য কুটিরের পরিবেশ। আমরা হাঁটতে হাঁটতে দক্ষিণ দিকে আগাতে থাকলাম। দেখলাম একটু উঁচু জায়গায় বিশাল এক আবাসিক বিল্ডিং। উক্ত বিল্ডিং এর সামনে বিশাল উঠান। কোন লোকের দেখা না পাওয়াতে আবাসিক বিল্ডিংটি সম্পর্কে কিছুই জানতে পারলাম না। তবে অনুমান করা যায়, নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠান উপলক্ষে আগত অতিথিরা এখানে অবস্থান করে। তখন বেলা গড়িয়ে পড়ছে, সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। হঠাৎ আমার ছোট বোনের জামাই গোপাল চৌধুরী বলে উঠলো- এখানে নাকি আরো একটি জায়গা আছে। এ জায়গাটির নাম ‘পিঁয়াজু পয়েন্ট’। সাথে সাথে ড্রাইভারকে বললাম- চলো ‘পিঁয়াজু পয়েন্টে’ যাই। রাওয়ানা হলাম পিঁয়াজু পয়েন্টের দিকে। সূর্য্যরে আভা তখনও মিলিয়ে যায়নি। আবার পাহাড়ী আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে দশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে গেলাম পিঁয়াজু পয়েন্টে। জায়গাটির নামের সাথে বাস্তবতার মিল থাকলেও সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে সেখানে পিঁয়াজু ছাড়াও মেলে বিভিন্ন জাতের খাদ্য। যেমনÑ পিঠা, বিভিন্ন আঞ্চলিক খাবার আরো অনেক কিছু। যেহেতু এক মহিলা পিঁয়াজু বানাচ্ছে সেহেতু তাঁর দোকানের সামনে খোলা আকাশের নীচে পুরানো চেয়ার ও মোড়ায় আমরা আটজন বসে গেলাম। ভদ্রমহিলা পাঁচ মিনিট পর গরম গরম পিঁয়াজু এনে টেবিলের মাঝখানে রাখার সাথে সাথে আমরা প্রতিযোগিতামূলকভাবে তা খেয়ে ফেললাম। আরো কিছু চাওয়াতে ভদ্রমহিলা আরো দশ মিনিট সময় লাগবে বলে জানালে আমাদের পক্ষে আর অপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি। ভদ্রমহিলাকে যখন ১০টি পিঁয়াজুর দাম পঞ্চাশ টাকা দিলাম তখন হাসতে হাসতে জিজ্ঞাস করলাম এত বড় পিঁয়াজু একটির দাম মাত্র পাঁচ টাকা? এতে আপনার লাভ হয়? তিনি সহাস্য বদনে উত্তর দিলেন- লাভ তেমন হয় না, তবুও ঘরের কাছে পিঁয়াজু বানিয়ে কিছু আয় করা।
সন্ধ্যা হয়ে গেছে। এখন বাড়ি ফিরতে হবে। ট্রেক্সিতে উঠে বসলাম। আলো-আঁধারী, আঁকা-বাঁকা রাস্তা ধরে আমরা পানছড়ি বাজারের দিকে আগাতে থাকলাম। অবশেষে সন্ধ্যা ৭.৩০ মিনিটে পানছড়ি বাজারে বোনের বাড়িতে পৌঁছলাম। সবাই মিলে সন্ধ্যার নাস্তাটা সেরে ফেললাম। কিন্তু ২৫ ফেব্রুয়ারী অর্থাৎ পরের দিন সাজেক যাওয়ার জন্য আমাদেরকে সকাল ৭.০০ টার মধ্যে খাগড়াছড়িতে পৌঁছতে হবে। তাই ভোর ৫.০০ টায় আমাদেরকে পানছড়ি থেকে রাওনা হওয়া প্রয়োজন। এ জন্য ছোট বোনের জামাইকে সাথে নিয়ে পানছড়ি বাজারের বাসষ্ট্যান্ডে গেলাম। সেখান থেকে টেক্সি রিজার্ভ করা যায়।

লেখক : পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, ইউএসটিসি