সাজেক: বাংলাদেশের দার্জিলিং-২

9

প্রফেসর ড. নারায়ন বৈদ্য

এক ভদ্রলোকের সহায়তা নিয়ে একজন টেক্সি ড্রাইভারের সাথে কথা বললাম। উক্ত ড্রাইভারের মাধ্যমে তিনটি টেক্সি পরের দিন ভোর পাঁচটায় পানছড়ি বাজারের মন্দিরের পাশে থাকবে বলে কথা হয়। অবশ্য আমি অগ্রিম দিলেও সেই অগ্রিম টাকা নিতে চায়নি, বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের কারণে। ড্রাইভার মনে করেছে সেই যদি অগ্রিম টাকা নেয় তবে প্রতীয়মান হবে, সে আমাকে বিশ্বাস করছে না। অপরদিকে আমার অঞ্চলের রীতি অনুসারে যদি ড্রাইভার অগ্রিম টাকা না নেয় তবে পরের দিন ভোর ৫টায় সে অন্য দুইটি টেক্সি নিয়ে নাও আসতে পারে। না, তা সত্য নয়। পরের দিন ভোর ৫টায় তিনটি টেক্সি মন্দিরের গেইটে এসে আমাকে ফোন করে। ভাবলাম এখনো পার্বত্য অঞ্চলে ‘বিশ্বাস’ শব্দটি জীবিত আছে। ভোর ৫.১০ মিঃ আমরা তিনটি টেক্সি করে খাগড়াছড়ি রাওয়ানা হলাম। রাস্তায় তেমন কোন গাড়ী ছিল না। ফলে সকাল ৬.৩০ মিনিটের মধ্যে খাগড়াছড়ি শাপলা চত্বরে পৌঁছে গেলাম। ড্রাইভারের সহায়তা নিয়ে সাজেক যাওয়ার জন্য গাড়ী রিজার্ভ করতে গিয়ে দেখা গেল যে, গাড়ী দুই রকমের আছে। আবার ভাড়াও দুই ধরনের। যদি সুবজ চাঁদের গাড়ী (জীপ) রিজার্ভ করি তবে ভাড়া হবে নয় হাজার, আর যদি সাদা পিকআপ রিজার্ভ করি তবে ভাড়া হবে ১২ হাজার। এটা ফিক্সড। কোন দামাদামি করা যাবে না। গাড়ী মালিক সমিতি দ্বারা তা নির্ধারিত। এরূপ ভাড়া বেশি হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে গাড়ীটি একরাত আমাদের সাথে সাজেকে থেকে যাবে। অবশ্য গাড়ীর ড্রাইভার ও গাড়ী তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় থাকবে। অন্যদিকে তিন চাকার টেক্সি ও টেম্পু করে সাজেকে যাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে টেক্সি ভাড়া ৬ হাজার টাকা এবং টেম্পু ভাড়া সাড়ে সাত থেকে আট হাজার টাকা। অবশ্য টেক্সি বা টেম্পু করে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। তবুও বেশ কিছু টেক্সি, টেম্পু করে অসংখ্য পর্যটক যায়। সকাল ৭টার মধ্যে সাদা পিকআপ ভাড়া করে আমাদের ব্যাগগুলো গাড়ীতে রেখে আমরা সকালের নাস্তা করার জন্য একটি পরিচ্ছন্ন রেস্তোরায় ঢুকলাম। ৭.৩০ মিনিটে নাস্তা শেষ করে গাড়ী নিয়ে রাওয়ানা হলাম সাজেকের উদ্দেশ্যে। পাহাড়ের আঁকা-বাঁকা পথ ধরে গাড়ী চলছে। কোথায়ও উচুঁ আবার কোথায়ও নীচু। প্রায় ১ ঘন্টা ৩০ মিনিট চলার পর অবশেষে গাড়ী এক জায়গায় থামল। ড্রাইভার সংকেত দিল। এখানে আপনারা ওয়াশরুম ব্যবহার করতে পারেন। কিছু মার্কেটিংও করতে পারেন। গাড়ী থেকে নেমে দেখি সম্পূর্ণ এলাকা বিজিবি (বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ) এর নিয়ন্ত্রণে। এত গাড়ী ও পর্যটক। তবুও এলাকাটি পরিচ্ছন্ন। বিজিবি এর নিয়ন্ত্রণে খাবার দোকান যেমন আছে তেমনি বিভিন্ন পণ্যের বিক্রয় কেন্দ্রও আছে। বিশেষ করে মহিলাদের ওয়াশরুমের পাশে বিক্রয় কেন্দ্র হওয়াতে মহিলারা বিভিন্ন পণ্য ক্রয়ের জন্য হুমরি খেয়ে পড়ছে। আমিও পারিবারিক এ প্রবণতার থেকে ব্যতিক্রম হতে পারিনি। ফলে ব্যাগ, জুতা, জামা কতই না কি ক্রয় করেছি ঐ বিক্রয় কেন্দ্র থেকে। বিক্রয় কেন্দ্র থেকে গাড়ীতে ফিরে এসে দেখি আমার ছোট বোনের জামাই, নয় জনের জন্য নয়টি কাপ দধি নিয়ে এসেছে। তখন বেলা প্রায় সাড়ে নয়টা। পাহাড়ের তপ্ত বালির উষ্ণতায় বেলা বাড়ার সাথে সাথে গরমের তীব্রতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও সকালের দিকে বেশ ঠান্ডা অনুভ‚ত হয়েছিল। সবায় ঠান্ডা খেয়ে গাড়ীতে উঠলাম। গাড়ী আবার চলতে আরম্ভ করলো। আরো ৩০ মিনিট পরে পৌঁছে গেলাম বাঘাইছড়ি নামক জায়গায় যেখান থেকে বিজিবি-এর নির্দেশনায় গাড়ী ছাড়া হয়। বিজিবি-এর এক সৈনিক রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। খাগড়াছড়ি থেকে আগত সকল গাড়ীকে রাস্তার দক্ষিণ পাশে মাঠে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিল। আমাদের গাড়ীটি মাঠে দাঁড়ানোর পর বুঝতে পারলাম আমাদেরকে এখানে বেশকিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। আমরা দুইজন গাড়ী থেকে নামলাম। সেখানেও বিজিবি-এর পরিচালনায় বেশকিছু দোকান আছে যেখানে নির্দিষ্ট মূল্যে খাবার থেকে আরম্ভ করে অনেক কিছু পাওয়া যায়। আবার স্থানীয় লোকেরাও রাস্তার পাশে বসে নানা পণ্য বিক্রয় করতেছে। বেলা প্রায় পৌনে ১১টা। ইতির মধ্যে প্রায় ’শখানেক গাড়ী এসে মাঠে দাঁড়িয়েছে।
বিজিবি এর সদস্যরা প্রায় ১১টার দিকে গাড়ীগুলোকে সারিবদ্ধভাবে রাওয়ানা হওয়ার নির্দেশনা দিলেন। একটি টেক্সি তাড়াহুড়া করে আগে যেতে চাইলে বিজিবি-এর সদস্যরা তাকে দাঁড় করিয়ে রাখলেন। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমাদের গাড়ী রাস্তায় উঠে সাজেকের দিকে রাওয়ানা হলো। পাহাড়ের আঁকা-বাঁকা ও উঁচু-নিচু পথ বেয়ে গাড়ী সাজেকে পৌঁছলো বেলা ১টার দিকে। আমি দশদিন পূর্বে অন-লাইনে একটি হোটেলের দুইটি রুম রিজার্ভ করে রেখেছিলাম। হোটেলটির নাম ছিল ‘মেঘমালা’। অবশ্য সাজেকে পৌঁছে হোটেলটি খুঁজে পেতে দেরি হলো না। রাস্তার সাথে লাগানো হোটেল মেঘমালা। হোটেলের ম্যানেজারকে বলার সাথে সাথে সেই দোতলায় দুইটি রুমে আমাদেরকে নিয়ে গেল। কিন্তু প্রথম রুমটির বাথরুমের ছিটকানী না থাকার কারণে মনটি বেশ খারাপ হয়ে গেল। রুমের অবস্থাও তত ভাল নয়। অথচ অন-লাইনে ভাড়া করার সময় যে ভদ্র মহিলার সাথে কথা বলেছি তিনি আমাকে এমন সুন্দর করে রুমের বর্ণনা দিয়েছিলেন যে, তার সাথে বাস্তবতার কোন মিল পাওয়া গেল না। তিনি বলেছিলেন, আমাদের সাথে বয়স্ক মানুষ আছে কিনা? আমি ‘হ্যাঁ’ বলাতে তিনি নিজ থেকে বললেন ‘তবে তো আপনাদের হাই কমেড দরকার’। এতে আমি ধরে নিয়েছিলাম- তিনি অত্যন্ত ভদ্র ও মানবিক একজন মহিলা। তাই সেইদিন দুইটি রুম একদিনের জন্য আট হাজার টাকায় ভাড়া ঠিক করে তৎমধ্যে দুই হাজার টাকা বিকাশে উনাকে এডভান্স করেছিলাম। রুম পছন্দ না হওয়াতে হোটেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকটিকে জিজ্ঞাস করলাম- ‘আমি যে ভদ্র মহিলার সাথে কথা বলে টাকা দিয়েছিলাম উনি কোথায়?’ উত্তরে লোকটি বললো- ‘তিনি তো ঢাকায় থাকেন’। আমি সাথে সাথে উক্ত ভদ্র মহিলাকে ফোন করলাম। দেখি কেউ ফোন ধরে না। আমি দ্বিতীয়বার ফোন করলাম। এক ভদ্রলোক ফোন ধরলো। উনাকে ভদ্র মহিলার কথা জিজ্ঞাস করাতে তিনি উত্তর দিলেন- ‘ভদ্র মহিলা বাহিরে গেছেন। তিনি আসতে দেরি হবে।’ বুঝলাম- আমি এক অভদ্র মহিলার খপ্পরে পড়েছি। ঢাকায় বসে অন লাইনে পর্যটক জোগার করে তিনি কমিশন ব্যবসা করতেছেন যা অনেক পর্যটকের জানা নেই। আমার দুই বোনের জামাই বললো- আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই, কোন রকমে এক রাত কাটিয়ে চলে যাবো। তাই ঘটনা আর বেশি দূর বাড়াইনি।
ইতির মধ্যে বেলা ২টা বেজে গেল। সাজেকে আগে থেকে ভাত খাওয়ার জন্য হোটেলে বলে দিতে হয়। এটা আমার আগে জানা ছিল। তাই তাদেরকে রেখে আমি পাশের একটি হোটেলে গিয়ে কথা বললাম। প্রতিটি হোটেলে কাগজে ছাপানো ম্যানু আছে এবং প্রতিটি ম্যানুর দামও উল্লেখ আছে। ভাত, মুরগী, সবজি, ডাল, আলু ভর্তা- এ ছয়টি খাবারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০০ টাকা। বললাম- পৃথক পৃথক দাম কত? ম্যানেজার চাচা বললো- আসলে ২৫০/- টাকা প্রতিজন দাম পড়বে। এ হোটেলে ভাতের অর্ডার দিয়ে ‘মেঘমালায়’ ফিরে আসলাম। সবাই স্নান সেরে অবশেষে পৌনে তিনটার দিকে হোটেলে গিয়ে ভাত খেয়ে নিলাম। দুপুরের খাওয়ার পর্ব সেরে আবাসিক হোটেলে মেঘমালায় এসে সবাই একটু বিশ্রাম নিয়ে বিকাল সাড়ে চারটার দিকে বের হয়ে গেলাম। সাজেকের একটি মাত্র রাস্তা। যাওয়ার তেমন কোন জায়গা নেই। তাই হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার শেষ প্রান্তের দিকে যেতে শুরু করলাম। প্রথমে দেখলাম একটি ‘লুসাই গ্রাম’। সেখানে প্রবেশের গেইটে লিখা আছে টিকেট নেয়ার জন্য। প্রতিটি টিকেট ৩০/- টাকা করে নয় জনের জন্য ২৭০/- টাকা দিয়ে টিকেট নিলাম। লুসাই গ্রামে ঢুকার জন্য নীচু পাহাড়ের গা বেয়ে নিচের দিকে নামতে শুরু করলাম সবাই। লুসাইদের ছোট ছোট ঘর বানিয়ে রাখা হয়েছে। মাচার ওপর একটি ঘরে দুই খাঁচা রাখা হয়েছে। এ খাঁচাগুলোর দুই পাশের বাঁধানো দড়ি নিজ কপালে রেখে পিঠে খাঁচা নিয়ে লুসাই পুরুষ ও মহিলারা পাহাড়ে বিভিন্ন পণ্য সংগ্রহ করে। খাঁচা একটি পিঠে নিয়ে কপালে দড়ি রেখে আমরা সবাই ছবি তুললাম। তখন বেলা পাঁচটা। লুসাই গ্রাম থেকে বের হয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। রাস্তার ডান পাশে আরো একটি গ্রাম দেখতে পেলাম। গ্রামটিতে অসংখ্য ফুল ফুটে আছে। সবাই ছবি তোলার জন্য সেখানে নেমে পড়লাম।
লেখক : পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, ইউএসটিসি