সাংবাদিককে ঘুষি মেরে দৌড়ে পালালেন এমপি মোস্তাফিজ

49

নিজস্ব প্রতিবেদক

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলবল নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে এসেছিলেন ১৬- (বাঁশখালী) আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থী এমপি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী। মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে প্রশ্ন করায় সাংবাদিকদের মারধর করেছেন এমপি ও তাঁর সহযোগীরা। এ ঘটনায় ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট রাকিব উদ্দিনসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এ ঘটনা ঘটে। এ সময় এমপি মোস্তাফিজ সাংবাদিকদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজও করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মী নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে আসায় নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন হয়েছে কি-না এমন প্রশ্নে তিনি ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের সাংবাদিক রাকিব উদ্দিনকে ঘুষি মারেন। এসময় তার কাছ থেকে মাইক্রোফোন কেড়ে নিয়ে মারধর শুরু করেন তার সঙ্গে আসা নেতা-কর্মীরাও। তারা আছড়ে ভেঙে ফেলেন মাছরাঙা টেলিভিশনের মাইক্রোফোন ও ট্রাইপড। এতে আরও দুই সাংবাদিক আহত হন।
মারধরের শিকার সাংবাদিক রাকিব উদ্দিন বলেন, নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী ৫ জনের বেশি নেতা-কর্মী নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ নেই। তিনি অনেক নেতা-কর্মী নিয়ে আসেন রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে। এ নিয়ে প্রশ্ন করায় আমার ওপর হামলা করেন এবং মাইক্রোফোন কেড়ে নিয়ে ফেলে দেন। তিনি আমাকে দেখে নেওয়ারও হুমকি দিয়েছেন। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকেরাও তাদের হাতে লাঞ্ছিত হন। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের দোতলা থেকে গণমাধ্যমকর্মীদের টেনে-হিঁচড়ে নিচতলা পর্যন্ত নিয়ে যান মোস্তাফিজুর রহমান ও তার সহযোগীরা। তারা ব্যক্তিগত গাড়িতে করে জেলা প্রশাসন কার্যালয় ত্যাগ করার আগে আবারও সাংবাদিকদের লাঞ্ছিত করেন।
এ ঘটনায় রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামানের কাছে সাংবাদিকরা মৌখিক অভিযোগ দিলে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন তিনি। এছাড়া ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের লিখিত অভিযোগ দিতে বলেন।
এদিকে এ ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ক্ষমা চাইলেন চট্টগ্রাম-৯ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা যদি সত্য হয়ে থাকে, আমি ব্যক্তিগতভাবে ও আমার দলের পক্ষ থেকে ক্ষমাপ্রার্থী। আমাদের গণমাধ্যমকর্মীরা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছেন। আচরণবিধি লঙ্ঘন হচ্ছে কি-না সেটা জনগণের কাছে তুলে ধরছেন সাংবাদিকরা। এর প্রেক্ষিতে কেউ যদি রূঢ় ব্যবহার করেন, গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর আক্রমণ করেন- এটি একটি গর্হিত কাজ হয়েছে। আমি সংসদ সদস্য হিসেবে নয়, আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে গণমাধ্যমের ভাইদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।
এ ঘটনায় এমপি মোস্তাফিজুর রহামানকে আদালতে তলব করা হয়েছে। ‘নির্বাচন-পূর্ব-অনিয়ম’ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণকল্পে গঠিত নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটির চেয়ারম্যান যুগ্ম জেলা জজ আবু সালেম মোহাম্মদ নোমান ঘটনার ব্যাখ্যা চেয়ে তাকে তলব করেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে ‘নির্বাচন-পূর্ব-অনিয়ম’ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণকল্পে গঠিত নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটির চেয়ারম্যান তলব করেছেন।
এর আগে নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটির চেয়ারম্যান তিন সাংবাদিকের কাছ থেকে জবানবন্দি নিয়েছেন। পরে আজ চট্টগ্রাম-১৬ আসনের এমপি মোস্তাফিজুর রহমানকে তার যথাযথ বক্তব্য দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। যুগ্ম জেলা জজ দ্বিতীয় আদালতের পেশকার মো. শাহাব উদ্দিন জানান, ‘নির্বাচন-পূর্ব-অনিয়ম’ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণকল্পে গঠিত নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটির চেয়ারম্যানের কাছে তিন সাংবাদিক জবানবন্দি দিয়েছেন। এরপর কমিটির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীকে আগামীকাল (আজ শুক্রবার) বিকেল তিনটার মধ্যে এ বিষয়ে আদালতে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য নোটিশ পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এ ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিইউজে) ও টিভি জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন। যৌথ বিবৃতিতে সিইউজে’র সভাপতি তপন চক্রবর্তী ও সাধারণ সম্পাদক ম. শামসুল ইসলাম বলেন, আজ (বৃহস্পতিবার) সকালে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সংবাদ সংগ্রহ করার জন্য সাংবাদিকরা চট্টগ্রাম আদালত ভবন এলাকায় যান। সেখানে রিটার্নিং অফিসার কার্যালয় থেকে মনোনয়নপত্র জমাদান শেষে চলে যাবার সময় বাঁশখালীর সাংসদ মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীকে আচরণ বিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির রিপোর্টার রাকিব উদ্দিনের গায়ে হাত তুলেন। এসময় এমপির সহযোগীদের হাতে আরটিভির ক্যামেরাপার্সন এমরাউল কায়েস মিঠু, ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির ক্যামেরাপার্সন তারাচরণ দাশ গুপ্ত ও ডিবিসির ক্যামেরাপার্সন আবদুল আজিজ মুন্নাসহ বেশ কয়েকজন সাংবাদিক আক্রান্ত হন। তারা এসময় টিভি চ্যানেলের ক্যামেরার সরঞ্জামাদি ও ট্রাইপড ভাংচুর করেন।
একজন এমপির এ ধরনের আচরণের নিন্দা জানিয়ে সিইউজে নেতৃবৃন্দ বলেন, ইতিপূর্বেও ওই এমপি একাধিকবার সাংবাদিকদের সঙ্গে গর্হিত আচরণ করেছেন। যা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ও অনাকাক্সিক্ষত। নেতৃবৃন্দ এ ঘটনায় জন্য এমপি মোস্তাফিজুর রহমানকে দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা প্রার্থনা করার দাবি জানান।