সম্পর্কের ধারাবাহিকতা রক্ষাই বড় চ্যালেঞ্জ

9

পূর্বদেশ ডেস্ক

প্রকাশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করার নীতি থেকে সরে এসেছে সরকার। বিভিন্ন সময়ে বিশেষ করে র‌্যাবের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন প্রকাশ্যে দেশটির প্রতি উষ্মা প্রকাশ করলেও স¤প্রতি তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বন্ধু’ এবং তাদের ভালো সুপারিশ বিবেচনা করার কথা বলছেন। মন্ত্রীর সা¤প্রতিক বক্তব্য পর্যালোচনা করলে বিষয়টি পরিষ্কার বোঝা যায়। খবর বাংলানিউজের
সরকারের এই ইতিবাচক আচরণকে সমীচীন বলে মনে করেন সাবেক কূটনীতিকরা। তাদের মতে, কূটনীতিতে ন্যারেটিভ এবং তার আর্টিকুলেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে জনসাধারণের মনোভাব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে। তবে লক্ষণীয় যে ন্যারেটিভ যেন ধারাবাহিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। তাদের মতে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বিভিন্ন ইস্যুতে মতদ্বৈধতা হবে, এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু সম্পর্কোন্নয়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রকাশ্যে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
এ বিষয়ে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কে ওঠানামা থাকবে। এর কারণ হচ্ছে, একেক দেশের জাতীয় স্বার্থ একেক ধরনের। দুই পক্ষের স্বার্থ যদি এক জায়গায় মিলে যায়, তবে সেটি ভালো। কিন্তু যদি না মেলে, তবে পরিপক্বভাবে দ্বৈতমত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার আবশ্যকতা আছে।’
তিনি বলেন, ‘ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্ব আছে। মতে মিলের কারণে ইতিবাচক মনোভাব প্রদর্শন, কিন্তু মতের অমিল বা জাতীয় স্বার্থে দ্ব›েদ্বর সময়ে প্রকাশ্যে উদ্দেশ্যমূলক সমালোচনা করা হলে ভুল বার্তা দেওয়া হয়। এর ফলে অন্য দেশ বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নাও নিতে পারে। মনে রাখতে হবে, কোনও দেশের সঙ্গে আমাদের বৈরি সম্পর্ক নেই।’
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানান, ২০১৬ সালে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিন পিংয়ের ঢাকা সফরকে অনেক রাষ্ট্র ভিন্ন চোখে দেখেছে। ওই সময়ে তাদের আমরা দুটি বার্তা দিয়েছিলাম। প্রথমত, ওই সফর বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন এবং দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ এমন কোনও পদক্ষেপ নেবে না, যেটি তাদের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সবাই বিষয়টি খুশি মনে মেনে নিয়েছিল, এমন নয়। তবে কেউ প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেনি।
শহীদুল হক জানান, আবার ২০১৪ সালে দক্ষিণ চীন সমুদ্র নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান খুশি মনে মেনে নেয়নি চীন। কিন্তু তাদের আমরা বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলাম, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের কারণে এর বাড়তি কিছু করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে অন্য দেশের যে অমিল সেটি নিয়ে যে বিতন্ডা, তা সবসময় পর্দার অন্তরালে এবং চার দেয়ালের মধ্যে রাখাই বাঞ্ছনীয়। দ্বন্দ্ব ফনিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করা হলে সেটির হিতে-বিপরীত ফল হতে পারে। এ কারণে প্রকাশ্যে ধারাবাহিকভাবে একই সুরে যথাযথ কথা বলা প্রয়োজন।’
একই মনোভাব পোষণ করে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘লাগামহীন বা অহেতুক কথাবার্তা কোনও দেশের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক ধরে রাখার ক্ষেত্রে ভালো ফল বয়ে আনে না।’
বিভিন্ন সময়ে মার্কিনবিরোধী প্রকাশ্য সমালোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা, এটি দেশের বিভিন্ন পক্ষগুলোকে সন্তুষ্ট করার জন্য বলা হয়েছে। আমি নিশ্চিত পর্দার অন্তরালে আলোচনা চলমান ছিল।’
যেকোনও সরকার চাইবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখতে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন মূল্যবোধ যেমন- গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নির্বাচন নিয়ে মার্কিন অবস্থানের কোনও পরিবর্তন হয়নি। র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে মার্কিনিরা প্রশংসা করলেও আরও উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়েও বলেছে।’
সা¤প্রতিক সময়ে দেশের নীতিনির্ধারকরা যে সুরে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলছেন, সেটি অত্যন্ত ইতিবাচক। এখন বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র যখন তাদের বার্ষিক মানবাধিকার রিপোর্ট বা মানবপাচার রিপোর্ট প্রকাশ করবে, তখন বাংলাদেশ কী ধরনের প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে।
মার্কিন রিপোর্ট প্রণয়নের বিষয়ে ওয়াকিবহাল এমন একজন সাবেক কূটনীতিক বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে দেশভিত্তিক রিপোর্ট প্রণয়ন করে থাকে। আমরা আগের রিপোর্টগুলো যদি বিবেচনা করি, তাহলে দেখবো, তারা বাংলাদেশের মানবাধিকার বা মানবপাচার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, এ বছরের রিপোর্টে যদি নেতিবাচক কথা থাকে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা না করাটা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
সম্পর্কোন্নয়নের জন্য দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু একইসঙ্গে শিষ্টাচার মেনে চলা এবং দেশের মর্যাদা সমুন্নত রাখাটাও জরুরি বলে মনে করেন সাবেক কূটনীতিকরা। এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবেক কূটনীতিক বলেন, অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ডোনাল্ড লু বাংলাদেশের হিসাবে একজন অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা। কিন্তু আনুষ্ঠানিক প্রেস ব্রিফিংয়ে ডোনাল্ড লু’র পাশে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, যা একদম শোভনীয় নয়। তিনি বলেন, যদি ধরে নেওয়া হয় যে মার্কিন কর্মকর্তাকে তুষ্ট করার জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওই ব্রিফিংয়ে ছিলেন, তারপরও এটির মাধ্যমে দেশের মর্যাদা বাড়ে না।
শব্দ চয়নের ক্ষেত্রেও সাবধানতার প্রয়োজন আছে জানিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন সাবেক কূটনীতিক বলেন, মার্কিন যেকোনও কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। প্রকাশ্যে যদি মার্কিন কোনও কর্মকর্তাকে ‘ভারতীয় বংশোদ্ভূত‘ বা ‘চীনের বংশোদ্ভূত’ হিসেবে অভিহিত করা হয়, তবে সেটি অসম্ভব দৃষ্টিকটু। কারণ, শব্দগুলো বর্ণবৈষম্যমূলক।’