সমুদ্র সৈকত খুঁড়ে পাউবোর প্রকল্প!

41

রাহুল দাশ নয়ন
বাঁশখালীর সমুদ্র সৈকত খুঁড়ে উপকূলে চলমান পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)’র আপদকালীন প্রতিরক্ষা কাজে বালু ও মাটি সরবরাহ করা হচ্ছে। নির্মিতব্য বাঁধের ২০ মিটারের মধ্যে সৈকতের প্রায় শত মিটার এলাকা এবড়োথেবড়োভাবে খুঁড়ে ফেলায় সেখানকার পরিবেশ মারাত্মকভাবে নষ্ট হয়েছে। সৈকতের এমন পরিবেশ দেখে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন বেড়াতে যাওয়া পর্যটকরা।
চন্দনাইশ থেকে গত শুক্রবার বেড়াতে যাওয়া পর্যটক ইমতিয়াজ সুলতান পূর্বদেশকে বলেন, ‘সম্ভাবনাময় পর্যটন স্পটটি নষ্ট করা হচ্ছে। সৈকতটি আধুনিকায়ন করা হলে এটি হবে চট্টগ্রামের সবচেয়ে সুন্দর পর্যটন স্পট। কিন্তু এভাবে মাটি কেটে নেয়ায় পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আরেকটি স্বপ্নের অপমৃত্যু কাম্য নয়। ঠিকাদার চাইলে বাঁধ নির্মাণের মাটি ও বালু বাইরের অংশ থেকে নিতে পারতো।’
প্রসঙ্গত, পশ্চিম বাঁশখালীর সমুদ্র সৈকতকে পর্যটন স্পট ঘোষণার দাবিতে সোচ্চার উপকূলবাসী। বেড়িবাঁধের নির্মাণ কাজ চলমান থাকায় এ দাবি আরো দৃঢ় হয়। সাম্প্রতিক চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব চত্বরে পশ্চিম বাঁশখালী সমুদ্র সৈকতকে পর্যটন কেন্দ্র ঘোষণার দাবিতে মানববন্ধনও করেছে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শিবেন্দু খাস্তগীর পূর্বদেশকে বলেন, ‘বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ চলছে সেখানে। সৈকত থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়টি আমাদের আয়ত্বে নেই। তা তদারকি করবেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার। কারণ বালু উত্তোলনের জন্য সরকার অনুমোদিত নির্দিষ্ট বালুমহাল আছে। নির্দিষ্ট বালুমহালের বাইরে কেউ বালু উত্তোলন করলে সেটি অনৈতিক।’
বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোমেনা আক্তার পূর্বদেশকে বলেন, ‘সমুদ্র সৈকত কেটে বালু উত্তোলনের বিষয়টি আমি শুনেছি। সেখানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।’
পাউবো সূত্র জানায়, বাঁশখালীর উপকূলীয় পোল্ডার নং-৬৪/১ এর খানখানাবাদ ইউনিয়নের খানখানাবাদ বাজার এলাকার বাঁধের ১০১.৯০০ কিলোমিটার হতে সী ডাইকের ১০২.১৭৫ কিলোমিটার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অংশের জরুরি বাঁধ মেরামত ও উঁচু করণ এবং ঈশ^রবাবুর হাট সংলগ্ন এলাকার ১১১.২২০ কিলোমিটার হতে ১১১.৩৪২ কিলোমিটার পর্যন্ত জিও ব্যাগ দ্বারা আপদকালীন প্রতিরক্ষা কাজের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। কয়েকটি গ্রæপে বিভক্ত এ প্রকল্পে বরাদ্দ ধরা হয় ৮৩ লক্ষ ৬১ হাজার টাকা।
সরেজমিনে দেখা যায়, খানখানাবাদ বাজার এলাকার উত্তর অংশে আপদকালীন বাঁধের কাজ করতে গিয়ে খনন যন্ত্রে মাটি খুঁড়ে পুরো সৈকত ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে। সৈকতে সৃষ্টি হয়েছে বিশালাকার গর্ত। যেখানে জমে রয়েছে পানি। গর্তের কারণে সৈকতে পায়ে হেঁটে চলাচলে পর্যটকদের বেগ পেতে হচ্ছে। এই অবস্থায় পুরো সৈকতের সৌন্দর্য্য বিলীন হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী আবু তাহের পূর্বদেশকে বলেন, ‘বস্তাতে ভরে মাটি ও বালু দিলে কোন সমস্যা নেই। তবে সৈকত থেকে বালু তুলছে কিনা সেটি দেখি নাই। সৈকত থেকে বালু কিংবা মাটি দিলে আমরা বিল প্রদান করবো না। ১৫৮ মিটার কাজে ২৯লক্ষ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। চৌধুরী এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এ কাজ করছে। কাজটি করছে স্থানীয় চেয়ারম্যান বদরুল। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক উনি কিনা আমি নিশ্চিত না।’
খানখানাবাদ বাজার এলাকার আবু তাহের নামে এক ব্যক্তি বলেন, ‘ বাঁশখালী সমুদ্র সৈকতটি পর্যটন এলাকা ঘোষনা করার কথা বলা হচ্ছে। এরমধ্যে সমুদ্র সৈকতটি খুঁড়ে নষ্ট করা হচ্ছে। বাঁধ তৈরি করতেই সৈকত থেকে বালু ও মাটি নেয়া হচ্ছে। কিন্তু সমুদ্র সৈকতের ক্ষতি করে এবং বাঁধের নিচ থেকে এভাবে মাটি তুললে নির্মিত বেড়িবাঁধ বেশিদিন টেকসই হবে না। সৈকতটি এভাবে কাটার কারণে পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নিবে।’
এদিকে খানখানাবাদ এলাকায় বেড়িবাঁধের ইমার্জেন্সি কাজটি স্থানীয় চেয়ারম্যান বদরুদ্দিন চৌধুরীর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান করছে বলে জানা যায়। যদিও স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন ২০০৯-এর ২৬ (ছ) ধারায় চেয়ারম্যান অযোগ্যতার কারণ হিসেবে উল্লেখ আছে, তিনি বা তাঁহার পরিবারের উপর নির্ভরশীল কোন সদস্য সংশ্লিষ্ট পরিষদের কোন কাজ সম্পাদনের বা মালামাল সরবরাহের জন্য ঠিকাদার হন বা ইজার জন্য নিযুক্ত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের অংশীদার হন বা সংশ্লিষ্ট পরিষদের কোন বিষয়ে তাঁহার কোন প্রকার আর্থিক স্বার্থ থাকে বা তিনি সরকার কর্তৃক নিযুক্ত অত্যাবশ্যক কোন দ্রব্যের ডিলার হন তাহলে তিনি অযোগ্য হবেন।
গতকাল সন্ধ্যা ৬টার দিকে খানখানাবাদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বদরুদ্দিন চৌধুরীর মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার কল দেয়া হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে স্থানীয় সরকার আইনে চেয়ারম্যান ঠিকাদারি করতে পারবে কিনা বিষয়টি মনে নেই বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোমেনা আক্তার।