সমাজ যখন সুযোগ তৈরিতে বৈষম্য সৃষ্টি করে তখন মানুষের মন অস্থির হয়

7

কাজি রশিদ উদ্দিন

সমাজে অস্থিরতা মনে হয় দিন দিন বেড়েই চলছে। মানব মনের অস্থিরতাও বেড়ে যাচ্ছে। বৈষম্য, অসম প্রতিযোগিতা, বস্তুবাদী মনোভাব, নীতিহীনতা ইত্যাদি দিন দিন উসকে দিচ্ছে অস্থিরতার কারণ। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারছে না। ধৈর্য ও সহ্যশক্তি কমে যাচ্ছে। সমাজে নানান অপশক্তির বিষবৃক্ষ জন্ম হচ্ছে এবং অনিষ্ট জেকে বসছে। বিপদে কিছুটা অস্থির হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু অস্থিরতা যখন নিয়ম আকারে প্রকাশিত হয় তখন এ রোগ সমাজকে ক্রমশ ধ্বংস করে ফেলে। সমাজ যখন সুযোগ তৈরিতে বৈষম্য সৃষ্টি করে। মানুষের মন অস্থির হয়। বেড়ে ওঠার জন্য একদল নিষ্পেষিত হয়। অপরপক্ষে কেউ প্রশাসন বা শক্তিধর কারোর আনুক‚ল্যে তরতর করে উপরওয়ালা বনে যায়। সমাজে মামার জোর বলে একটা কথা আছে। খুঁটির জোরে অযোগ্যরা যখন এগিয়ে যায় এবং বড় হওয়ার স্বাভাবিক গতি রুদ্ধ হয়। তখন সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। সমাজে যখন অসম প্রতিযোগিতা বিরাজ করে এবং দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে একশ্রেণির মানুষ আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়। অপরপক্ষে নিয়মনীতির মধ্যে থেকে প্রাণান্তকর চেষ্টা করেও যখন অন্যরা সমাজে টিকে থাকতে পারে না। তখন সমাজে নানামুখী অস্থিরতার সৃষ্টি হয়।
বাজারে সরবরাহকৃত পণ্যের অতিমাত্রায় অসামঞ্জতা এবং বিভাজন সমাজে অস্থিরতা বাড়ায়। যখন একটি শার্ট ৩০০ টাকায় পাওয়া যায় আবার কোনো শার্টের দাম ২০ হাজার টাকা অথবা কোনো গাড়ির দাম ৩৫ লাখ টাকা। অপরপক্ষে আরেকটির দাম এক কোটি টাকা ইত্যাদি। দ্রব্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে মূল্যের এমন আকাশচুম্বী অবস্থা আকাক্সক্ষার ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করে। ফলে ৩০০ টাকার শার্টওয়ালা লাখ টাকার শার্ট কেনার অসম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। একইভাবে একই পণ্যের বহু প্রকারভেদ যেমন- ১০০ প্রকার জুতার ডিজাইন, হাজার রকম শাড়ি, ব্লাউজ। এমনকি ৫০ টিভি চ্যানেল ইত্যাদি পণ্য ও ভোগের বহু রকমভেদ আমাদের মানসিক অস্বস্থিতে ফেলে দেয়। পাশের বাসার ভাবী-আপার ভালো দামি শাড়ি। স্বর্ণালংকার, তৈজসপত্র ইত্যাদি অনেক পরিবারকে ধ্বংস করে। অনেক স্বামী বা পরিবার কর্তাকে করে দুর্নীতিগ্রস্ত।
এককভাবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতা ও শক্তির ধারক হয়। তবে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। সে তখন আর অন্যদের পাত্তা দেয় না, ধরাকে সরাজ্ঞান করে। ফলে অপরপক্ষ নিজেকে নিতান্ত হেয় ও অসহায় ভেবে দুর্বল ও প্রতিরোধহীন হয়ে পরে। সে না পারে সইতে, না পারে হজম করতে। এভাবে তার মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। কোনো পক্ষকে যখন সমাজ উপায়হীনতায় নিমজ্জিত করে। তখন সমাজ খাদের কিনারায় পৌঁছে যায়। নিরাশায় অন্ধকারে জীবনের উদ্যম নিভে গিয়ে মানুষ অস্থির হয়ে ওঠে। অতি দারিদ্র যেমন অনেককে অস্থির করে। তেমনি অধিক মাত্রায় প্রাচুর্যও অনেক ক্ষেত্রে অস্থিরতা বাড়ায়। দারিদ্র অনিশ্চয়তাজনিত অস্থিরতা সৃষ্টি করে। আর অধিক প্রাচুর্য আরো প্রাপ্তির নেশা বৃষ্টি করে অস্থিরতা বাড়ায়। কিন্তু এ দু’অবস্থাই সামাজিক বিপত্তির জন্যও অনেক সমস্য সমাজকে ধ্বংস করার জন্য সমান নেতিবাচক ভ‚মিকা রাখে।
সমাজের বিভিন্ন পরিবেশ ও পরিস্থিতিও অস্থিরতার জন্য দায়ী। অতিরিক্ত জনঘনত্ব জনজীবনকে অনেক সময় অস্থির করে। সামান্য বিষয় নিয়ে যাত্রীর সাথে চালকের সহকারী অথবা এক যাত্রীর সাথে অন্য যাত্রীর কথা কাটাকাটি। রাস্তায় রিকশা ও সিএনজি চালকের সাথে আরোহী দোকানির সাথে ক্রেতার সামান্য কারণে ঝগড়া প্রায়ই দেখা যায়। এগুলো একধরনের অস্থিরতা। মানুষ কেন জানি অনর্থক হয়ে উঠে খিটখিটে, অসহিষ্ণু ও অস্থির।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সামাজিক অনাস্থা ও অসন্তোষ থেকে জনমনে বিশৃঙ্খলা ও বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অসন্তোষকে উসকে দেয়। অনেকসময় নজিরবিহীন বৈষম্য জনমনে প্রশাসন ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ফলে সমাজব্যবস্থা খাদের কিনারা থেকে ধ্বংসের দিকে পতিত হয়। এহেন অবস্থায় ধৈর্যশক্তি কমতে থাকে এবং ছাত্র ও তরুণরা নিরাপদ সড়কে জন্য বই ফেলে রাস্তায় নামে। দুর্নীতিবাজ ভিসির বিরুদ্ধে অবরোধ গড়ে তোলে এবং কোটা প্রথা সংশোধনের জন্য সংঘবদ্ধ হয়। সাধারণ জনগোষ্ঠীর অধিকার না পাওয়ার দীর্ঘ দিনের ক্ষোভ প্রশমন করতে না পারলে বিক্ষোভ, অস্থিরতা থামানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।
সমাজের দায়িত্বশীল ও কর্তাব্যক্তিদের অতিকথন, অপকর্থন ও অস্থিরতার জন্য কম দায়ী নয়। রানা প্লাজা ধসে পড়লে তৎকালীন একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি একটি ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা বিল্ডিংয়ের পিলার ঝাকুনি দেয়ায় ওই প্লাজা ধসে পড়েছে বলে প্রচার করলেন। ফলে বিল্ডিং ধসে পড়ার পাশাপাশি মানব মনের অস্থিরতা বেড়ে গেল। দায়িত্বহীন বক্তব্য অসহিষ্ণুতা ও বিভক্তি সৃষ্টি করে। ফলে সমাজের এক অংশ অপর অংশের বিপক্ষে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানি ভলতেয়ারের মত হলে- ‘It is dangerous to be right when the fowerful is wrong..’ ক্ষমতাবানরা ভুল করতেই পারে- কারণ কেহই ভুলের উর্ধ্বে নয়। বিরোধী দলের কাজ হলো সেই ভুল ধরিয়ে দেয়া।
বিশ্বাসহীনতা, অনৈতিকতা ও বস্তুবাদী মনোভাব অস্থিরতার জন্য দায়ী। বিশ্বাস মানুষের মধ্যে উদারতা ও আশার জন্ম দেয়। নৈতিক মানুষ শুধু লোভের তাড়নায় চলে না। বস্তু স্বার্থের ক্ষুদ্র গন্ডির মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেনা। বরং তার মধ্যে ত্যাগের মনোভাব ও নিঃস্বার্থবাদিতার জন্ম হয়। ফলে সে শুধু বস্তুগত প্রাপ্তির দিকে নজর না দিয়ে মানুষ ও সমাজের কিসে উপকার হয়। দেশের কী কল্যাণ করতে পারল এমন মহান নিয়মগুলোকেই জীবনের লক্ষ্য বানায়। ফলে সে অতৃপ্তির কাতরে পরার্থপরতার আনন্দে গতিশীল হয়। এভাবে বিশ্বাসহীনতা ধ্বংস করে, আর বিশ্বাসবোধ নতুন জীবনের সঞ্চার করে। হতাশা ও অস্থিরতামুক্ত সমাজ সৃষ্টি উল্লেখ করেছেন। (আসলে) মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে অতিশয় অস্থির চিত্তরূপে। যখন তার ওপর কোনো বিপদ-মুসিবত আসে, তখন সে হালুতাশ করে। আর যখন তার কল্যাণ (সচ্ছলতা) ফিরে আসে। তখন সে কার্পন্য করতে আরম্ভ করে। (আল মায়ারিজ ১৯-২১)
অস্থিরতার এত সব উপলক্ষ, অনুষঙ্গ কারোর একার পক্ষে দূর করা সম্ভব নয়। সবার উচিত দায়িত্বশীল ভ‚মিকা রাখা, দৃষ্টিভঙ্গি বদলালে জীবন বদলে যাবে। তাই নিজেকে বদলাতে হবে। মনের শক্তি অনেক বড় শক্তি। নৈতিক শক্তি তার চেয়েও শক্তিশালী। এক সময় এই পৃথিবী ছেড়ে চির বিদায় নিতে হবে এই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আত্মশুদ্ধির পাশাপাশি জনশুদ্ধির চেষ্টা করলে দেশে স্থিরতা ফিরে আসবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট