সমাজের যাঁতাকলে নারী

5

সিমলা চৌধুরী

সমসাময়িক সামাজিক সমস্যাগুলোর মধ্যে নারী নির্যাতন অন্যতম। বর্তমানে নারী নির্যাতনকে একপ্রকার সামাজিক ব্যাধিও বলা যায়। ব্যক্তিগত ও সমাজ জীবনে নারীরা যখন দৈহিক ও মানসিক ও সামাজিক নির্যাতনের শিকার হয় এবং অন্যের দ্বারা বিভিন্নভাবে বঞ্চনার শিকার হয় তখন তা নারী নির্যাতনের পর্যায়ে পরে। তৃতীয় বিশ্বের মত পশ্চাদপদ সমাজে নারীরা দীর্ঘকাল ধরেই নির্যাতনের শিকার। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীকে পুরুষের সমকক্ষ হিসেবে ভাবতে শেখায় না ,ফলে পরিবার, সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত বৈষম্যের শিকার হচ্ছে নারীরা। নির্যাতনের মূল কারণ হচ্ছে পুরুষের তুলনায় নারীর নিম্ন সামাজিক মর্যাদা। নারী নির্যাতনের ঘটনা ইদানিং এতই বেড়ে চলেছেÑ সমাজে তা মহামারী আকার ধারণ করছে। যানবাহনে এবং সুরক্ষিত বাসা বাড়িতেও ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হচ্ছে নারীরা। কোথাও নিরাপদ থাকতে পারছে না নারী ও কন্যাশিশুরা। প্রতিনিয়তই ওরা হচ্ছে যৌন হয়রানির শিকার। অধিকাংশ সময়ে সামাজিক মর্যাদার কথা ভেবে পারিবারিক ও ব্যক্তিগতভাবে নিগ্রহের কথা গোপন রাখে অনেকেই। নারীরা গণপরিবহন, রাস্তায়, বিপনীবিতানে এবং জনবহুল এলাকায়ও বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।
নারীর আত্মমর্যাদা বাড়াতে নিজেদেরই সতর্ক হতে হবে এবং আওয়াজ তুলতে হবে। নারী তার নিজেকে শিক্ষা-দীক্ষায় পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। নারীর অর্থনৈতিক অবস্থান সবল করতে হবে। দক্ষতা অর্জন করে নারী থেকে নিজেকে মানুষে পরিণত করতে পারলেই নারীর সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। প্রত্যেক বাবা-মাকে তাদের সন্তানদের নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। নারীদের প্রতি সম্মানের শিক্ষা পরিবার থেকেই দিতে হবে। জন্মের পর থেকেই নারী শিশুরা নানাভাবে বৈষম্যের স্বীকার হয়ে থাকে। প্রতিটি পরিবারেই যদি শিশুকাল থেকেই কন্যাদের সম্মান দেয়া হয়Ñ তাহলে সমাজেও নারীরা সম্মান পাবে।
অপার সম্ভাবনার অধিকারী নারীদের বিকাশ সম্ভব হয় নাÑ যথাযথ সুযোগ এবং সঠিক মূল্যায়নের অভাবে। আজকাল নারীর জয়গান গাওয়া হলেও এখনো নারীরা নিজ গৃহে পর্যন্ত নানা অত্যাচার ও নিগ্রহের শিকার হন। এখনো তাদের সহ্য করতে হয় নানা মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাদ্রাসাগুলোতেও অহরহ ঘটছে ধর্ষণ ও বিভিন্ন ধরনের নারী নির্যাতনের ঘটনা। নারী নির্যাতন রোধে বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে হবে। কারণ বাল্যবিবাহের ফলে অনেক নারী নিগ্রহের শিকার হয়ে অকালে ঝরে যায়। নারী শিক্ষার হার আরও বৃদ্ধি করতে হবে। নিজেদের অধিকার সম্পর্কে প্রত্যেক নারীকে সচেতন থাকতে হবে।
আমাদের দেশের নারী নির্যাতনের সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছেÑ নারী নির্যাতনকারী অপরাধীরা জঘন্যতম অন্যায় করেও আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। অপরাধীরা সমাজে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাই অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে নারীদের বিরুদ্ধে শারীরিক সহিংসতার পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে সাইবার বুলিংয়ের মত জঘন্যতম অপরাধ। এ ধরনের অপরাধের সঠিক বিচার ও দমন করার জন্য নেই কার্যকর কোনো প্রশাসনিক তৎপরতা ও যথাযথ উদ্যোগ। জরিপ অনুযায়ী এদেশের প্রায় ৮৭% নারী কোনো না কোনো সময়ে বিভিন্নভাবে নিজের স্বামীর দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে। অনেক সময় শিক্ষিত নারীরাও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে বিভিন্নভাবে।
এ পরিস্থিতিতে নারীদের সবধরনের নির্যাতনের বিরুদ্ধে সচেতন ও প্রতিবাদী হতে হবে। এ অবস্থায় সমাজ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকেও যথাযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে নারীর নিরাপত্তা, বিনামূল্যে সহায়তা দান ও আইনী সহায়তা জোরদার করতে হবে। সমাজের অগ্রগতির জন্য নারীর সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন একান্ত জরুরি। নারীরা এখন সর্বক্ষেত্রে তাদের সাফল্যের ধারা অব্যাহত রাখছে এবং দেশের সুনাম রক্ষা করছে। তাই দেশের সার্বিক উন্নয়নে নারী উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে হবে।
লেখক : শিক্ষক