সমকালীন সময়ের এফিটাফ

12

নূরনাহার নিপা

অনু ইসলাম এর কাব্যগ্রন্থ – ‘বিকল্প শয্যায় ফুটে আছি’ কবিতাকে পঠন -পাঠনের মধ্য দিয়ে আহরিত যে বোধ ধ্যান- জ্ঞান জীবন অভিজ্ঞতা এবং কবিতার সৌন্দর্যরূপ ধারাবাহিক পঠন -মধ্যে নির্মিত হয়েছে কবি অনু ইসলামের সময়কাল এবং জীবনবোধ,পরিবর্ত উন্মোচিত করাকে প্রয়াশ খুঁজেছে কবির কাব্যগ্রন্থ -বিকল্প শয্যায় ফুটে আছি।
সা¤প্রতিক সময়ের অন্যতম তরুণ কবি ও প্রাবন্ধিক অনু ইসলাম। ২৫ এপ্রিল মুন্সীগঞ্জ জেলার সদর থানার নয়াগাঁও গ্রামে এক সাহিত্য-সংস্কৃতিবান্ধব পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। কবিতা ও প্রবন্ধের পাশাপাশি তিনি ছোটগল্পও লিখছেন। অনু ইসলাম একজন দক্ষ সাহিত্য সংগঠক হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছের। এ পর্যন্ত অনু ইসলামের চারটি মৌলিক কবিতাগ্রন্থ, একটি ঃপ্রবন্ধ ও একটি সম্পাদনাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তার সর্বশেষ কবিতাগ্রন্থ ‘বিকল্প শয্যায় ফুটেটে আছি’ প্রকাশিত হয় ২০২১ সালে। তার অন্যান্য কবিতাগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে জল কেটে যায় হাত স্পর্শে, রজতমুদ্রা ও ধানরঙের ঘ্রাণ। প্রবন্ধগ্রন্থ রয়েছে কবিতায় রাষ্ট্রচিন্তা ও অন্যান্য প্রবন্ধ। সম্পাদনা গ্রন্থ রয়েছে সম্মিলন। অনু ইসলাম সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতিবিষয়ক পত্রিকা ‘পটভূমি’র সহযোগী সম্পাদক এবং কবি পরিষদ, মুন্সীগঞ্জ এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। উল্লেখ্য পুরস্কার ও সম্মাননার মধ্যে রয়েছে চাঁদপুর কর্তৃক ৭ম ইলিশ উৎসব পুরস্কার ২০১৫, অগ্নিবীণা সাহিত্য সম্মাননা ২০১৬, বিক্রমপুর কালচারাল মিডিয়া সম্মাননা ২০১৭, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা স্বর্ণপদক ২০১৯ এবং চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমি দোনাগাজী পদক ২০১৯। অনু ইসলাম দুই-বাংলার জাতীয় দৈনিক পত্রিকা, অন লাইন পোর্টাল ও বিভিন্ন লিটলম্যাগ গুলোতে নিয়মিত লিখে চলেছেন। লেখালেখির জগতে কবির প্রথম দেখা সৃজনশীল লেখক সুমন ইসলাম কবির মেজ ভাই কবির প্রেরণা।তাঁদের ব্যক্তিগত লাইব্রেরি ছিলো,লাইব্রেরিতে ছিলো অসংখ্য কবিতা, গল্প ও উপন্যাস গৃহীত বই।এভাবেই কবিতার প্রতি ভালোলাগা একটা টান অনুভব ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। কবিতাপাঠে মগ্ন হতেন কবি। অদৃশ্য এক পৃথিবী নির্মাণ করেন।কবিতা হয়ে যায় জীবনের একটি অংশ। সে কবিতা পৃথিবীর দৃশ্যকল্প-চিএকল্প-উপমা, প্রতীক, সর্বপোরি জীবনাবোধ ভালোবাসার সবুজ সতেজ আধুনিকতার ছোঁয়া নান্দনিক প্রকাশ কবির কলমের ডগায় সৃষ্টি হয় প্রতিনিয়ত বাস্তববাদী কবিতা।কবির কবিতাগুলো পাঠকের হৃদয়ে বার বার নাড়া দেয় প্রবাহমান নদীর মতো। নদী,মাঠ,বৃক্ষ, ভালোবাসার কবি অনু ইসলামের প্রিয় শব্দবলি, কিছু কিছু চিত্রকল্প কিংবা শ্রেফ শব্দবন্ধ প্রকাশ কৌশলে দক্ষ সমপন্নতার পরিচয় মেলে।
যেমন- বিকল্প শয্যায় ফুটেটে আছি কাব্যগ্রন্থ মোট ৫৩ টি কবিতা রচিত।আমাদের চারপাশের জগৎ এবং নিসর্গমাধুরী তাঁর অনুভবে যে আলো আর স্নিগ্ধাতা ছড়িয়ে কবি বিষয় -ভাব-কল্পনা- তাঁর শব্দচয়নে,ছন্দোনৈপুণ্য উপমা আর চিকল্পে সেই অনুভব থেকেই অপরুপ কুশলতায় রূপান্তরিত প্রশংসিত।
কাব্যগুলো যেমন-সময়ের দিনলিপি হেঁটে যায়, বিকল্প শয্যায় ফুটেটে আছি,লকডাউন,অসহায় হয়ে ফুটেটে আছি, মধ্যবিত্ত, বিমূর্ত পৃথিবী, অলিখিত গল্প, সময়ের এপিটাপ, ইশ্বর নিশ্চিন্তে থাকেন,পুনর্জন্ম, শিরোনামহীন, পুতুলচোখ,গহিনের ডাক ফুটেসলে উঠছে আগুনরঙ,আষাঢ়ের ভাতঘুম, নদী ও নারী, বিসর্জন, টুকরো কবিতা,বোধ,
বিকল্প শয্যায় ফুটেটে আছি-পৃথিবীর অহমিকাগুলো মাটিমুখে নতজানু /তাই সন্ধ্যাকে বলছি, আমরা ও মাটিমুখি হব স্বভাবে/প্রত্যাশিত নতুন সময়ে ফলাবো নতুন স্বপ্নের ফসিল /
কবির এই কবিতায় বলেন, পৃথিবী নিসর্গের কাছাকাছি সময়ের বেদীমূলে দাঁড়িয়ে অদৃশ্য পৃথিবী,অদৃশ্য অনুভব, কল্পনা জগত গ্রাস করে পুরো পৃথিবী।কবি স্বপ্ন দেখে নতুন আলোর প্রতিক্ষা।
সময়ের দিনলিপি ডিঙিয়ে- আমাদের ভাঙা সংসার, একটা পুতুল খেলা মাত্র/অভিমান নিয়ে ও জোড়া লাগাতে হয়,/বহুবিধ ব্যস্ততায় তোমরা হয়তো সেখানে আড়চোখে ভালোবাসা খোঁজো!
কবির অভিমান -হতাশা সময়ের কথোপকথন। মানবতাবোধ এবং সমকালীন বাস্তবতা আচ্ছন্ন করে বেড়ে ওঠে তাঁর এই কবিতাটিতে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন কবি।
অসহায় হয়ে ফুটেটে আছি-প্রত্যহ এাণ চুরির ঘটনা /
কিংবা ঔদ্বত্যদের পা-কাটা হাতে নিয়ে মিছিলমুখর ব্যঞ্জনা /রচনা করে দিচ্ছে নতুন কালো-অধ্যায়ের বাংলাদেশ /
কবি, করোনার ভাব বিস্তারকে তুলে ধরেছেন লকডাউনের চিএ ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে অসহায় মানুষদের এাণ চুরির ঘটনা কবির হৃদয় মর্মবেদনায় হাহাকার করে ওঠে। বাস্তবতা চিএগুলো ফুটেটে তুলতে সক্ষম হয়েছেন মূলত কবিতায়।
নদী ও নারী-নদী ও নারীতে সবুজস্রোত বইতে দাও, নয়তো /তেরোশত নদীর চিৎকার তোমার বুকে বেজে উঠবে।
নদী ও নারীর জন্মস্তরের নিতল।কবি কবিতাটিতে বার বার নদী নারীর সৌন্দর্য বর্ণনা করতে ফিরে গিয়েছেন হতাশার আতœচিৎকার দ্ব›েদ্ব নয়, পৃথিবীর সৌন্দর্য তাদের বাঁচতে দাও,ভালোবাসা দাও, দেখবে এই বন্ধনে আমরা সবাই পবিত্র। কবির ভাবনায় দারুণ চিত্রকল্প তৈরি করেছেন।
পুতুলচোখ-পুতুল চোখ আর কত এসব দৃশ্য দেখবো/চোখগুলো যদি সত্যিকার অর্থে /মানুষ-রুপের হয়ে ওঠে তখন/
কবিতাটিতে কবি- নারী ধর্ষিত সুবর্ণাচরের প্রকৃতিতে মধ্যরাতে আত্মচীৎকার বাতাস ভারী হয়। মানুষরূপী গিটগিটিরা রঙ বদলায় প্রতিবাদের ভাষা নেই। অথচ আমাদের পুতুল চোখ দেখছেনা কিছুই। পাপগুলো চোখের সম্মুখে।
প্রতিটি কাব্য -অনু ইসলামের উপজীব্য মানব-চেতনা-মানবতাবোধ-বিরহ-মান অভিমান-নদী ও দেশ প্রেম- দ্রোহ বিদ্রাহ- এবং সমকালীন বাস্তবতা আচ্ছন্ন করে বেড়ে ওঠে তাঁর কবিতা।কবির কিছুটা অভিমান -হতাশা সময়ের কথোপকথন। জোড়াতালির শহরে ব্যস্ততায় নিজেকে ভাঙছে ডুবছে আর ভাসছে।কবিতা তো অধরা।অতœ উপলব্দির কবিতাকে মনে হয় সেতো এক একটি রহস্যের ধারণকৃত প্রতিচ্ছবি। যা পরিবার থেকে সমাজ রাষ্ট,বহি.প্রকাশ । প্রেম-প্রকৃতি-এবং সমাকালীন ভাবনা ও ব্যক্তিগত নৈঃশব্দ প্রতিটি আলাদাভাবে কবিতা পৃথিবীর ক্যানভাসে দৃশ্যমান যাপিত জীবনের বাস্তবতা- জঠিল শব্দগুলোকে সহজভাবে প্রতিকূলতার বিপক্ষে আশ্রয়কে জাগিয়ে তোলে। অসাধারণ স্বাভাবিক আর অস্বাভাবিককে অসাধারণ করে গড়ে তুলতে কবির প্রচেষ্টা। প্রাপ্তি ও প্রেরণা সামগ্রিক নৈরাজ্য দূর করে,কবিতা শেখায় কুৎসিতকে সৌন্দর্যময় করে, চৌপাশের চেনা ভুবনকে খুব নিবিঢ়ভাবে আঁকতে চেষ্টা করেছেন।কবি প্রতিদিন অল্প সময় হলে ও কবিতার মধ্যে ডুবে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।কবিতা কবির কাছে কর্মব্যস্ত শেষে যেন অক্সিজেন।
গ্রন্থের কবিতাগুলো পত্তি উপমাগুলো পাঠকের মনে দোলা দেবে আমার বিশ্বাস। আমি নিজে ও পাঠে তৃপ্ত মুগ্ধ। কবি অনু ইসলাম সাহিত্য শুদ্ধচর্চায় নিয়মিত অনুশীলন করে হয়ে উঠুক সাহিত্যবৃক্ষে অনন্য ব্যক্তিত্ব।