সব নির্যাতিতা হয়ে উঠুক নুসরাত জাহান রাফি

81

এই বিশ্বে যা কিছু সৃষ্টি চির কল্যাণকর / অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর। দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই কবিতাংশটি আমরা বক্তৃতা, বিবৃতি, সভা সমাবেশ, ওয়াজ মাহফিলে গলার ভলিউম বাড়িয়ে নারীর প্রতি, মাতৃজাতির প্রতি সম্মান ও ভক্তিতে গদগদ হয়ে যতটা উচ্চারণ করি তার সিকি ভাগও যদি অন্তরে পোষণ করতাম তাহলে সমাজ থেকে আর কিছু না হোক নারীর প্রতি সহিংসতার মাত্রা অনেকটাই কমে যেত। কার্যত আমাদের মুখের সঙ্গে অন্তরের, কথার সঙ্গে বাস্তবের আচরণের কোনো মিল নেই। তাই তো সমাজে, পরিবারে, রাষ্ট্রে অবিরাম ঘটে চলেছে নারীর প্রতি সহিংসতা, নির্যাতনের ঘটনা। আজকাল পত্রিকার পাতা উল্টালেই চোখে পড়ে ইভটিজিং, শিশু ও নারী ধর্ষণের মতো অমানবিক ঘটনা। পাঁচ বছরের শিশু থেকে বয়স্ক মহিলারাও বর্বর পুরুষের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। এমন কি পিতার হাতে শিশু নির্যাতনের জগন্য কর্মকাÐও ঘটছে। আমরা কী আইয়ামে জাহেলিয়াত এর যুগে ফিরে যাচ্ছি! ঘরে-বাইরে কোথাও নিরাপদ নয় আমাদের শিশুরা, আমাদের মা-বোনেরা। গ্রাম বাংলায় স্কুল-কলেজে যাওয়া আসার পথে গাছের আড়ালে-আবডালে থেকে বখাটে ছেলেরা মেয়েদের লক্ষ্য করে শিস দেয়। কখনো পথ আটকিয়ে অশোভন কথাবার্তা বলে। আমাদের মেয়েরা তথাকথিত অবলা বিশেষণ শিরোধার্য করে বিনা প্রতিবাদে বিনা বাক্যব্যয়ে সব দিনের পর দিন হজম করে। কখনো টু শব্দটি করে না। এই না করার পেছনে পুরুষশাসিত সমাজের এক চোখা নীতিই সর্বাংশে দায়ি। আমাদের সমাজ ব্যবষ্হা ‘জোর যার মুল্লুক তার’ এর পক্ষে। ইভটিজার, ধর্ষক কিংবা নির্যাতনকারীর যদি টাকা-লাঠির জোর থাকে তাহলে প্রশাসনের ভূমিকা হয় জালিমের পক্ষে। অনেক সময় ক্ষমতাবান ধর্ষককে, নির্যাতনকারীকে বাঁচাতে রাজনৈতিকদলের প্রভাবশালী নেতারা সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। এরচেয়ে দুঃখজনক আর কিছুই থাকে না। রক্ষক যদি ভক্ষক হয় নিরীহ মানুষের যাওয়ার কোনো জায়গা থাকে না। যারা এ সব মানবতাবিরোধী কর্মকাÐে অপরাধীকে বাঁচাতে নির্লজ্জের মতো মাঠে নামেন তারা যদি একটুখানি ভেবে দেখেন কাল তো আপনার মেয়ে কিংবা বোন কিংবা স্ত্রী কিংবা কোনো নিকটাত্মীয় সহিংসতার শিকার হন তাহলে আপনার মনের অবস্হাটা কেমন হবে? আপনার মাথায় কী আকাশ ভেঙে পড়বে না ? আপনি কী লজ্জায় মুখ ঢাকবেন না? পরের মেয়ে ধর্ষিতা হওয়ার পর বলে বেড়াবেন মেয়েটার চরিত্র আগে থেকে খারাপ ছিল। এই ঘটনা যদি আপনজনের বেলায় ঘটে তাহলে কি বলবেন? তখন তো নিশ্চয় তা বলবেন না। আর তাই সামান্য লোভের মোহে কোনো নিরীহ নির্যাতিতার বিপক্ষে অবস্হান না নিয়ে সত্যের পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে, ধর্মের পক্ষে, মানবতার পক্ষে, মানুষের পক্ষে অবস্হান নিন। দেখবেন আপনার দেখাদেখি এক এক করে সবাই রুখে দিচ্ছে অন্যায়কে, অধর্মকে।
স¤প্রতি নুসরাত জাহান রাফি নিজের জীবনের বিনিময়ে মাতৃজাতির সম্মান রক্ষায় রেখে গেছেন অনন্য ভূমিকা। মেয়েটি আগুনে ঝলসানো শরীরে মৃত্যুর পূর্বক্ষণেও তাঁর ওপর অমানিকতার বিচার চেয়ে গেছেন তেজোদীপ্ত কণ্ঠে। মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফীকে পুড়িয়ে নৃশংসভাবে হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে গত বৃহস্পতিবার (২৪/১০/২০১৯) তারিখে। এই রায় শুধু বাংলাদেশের মানুষকে নয়, নাড়া দিয়েছে সারা বিশ্বের বিবেকবান মানুষকে। ২৫/১০/২০১৯ তারিখে একটি জাতীয় দৈনিকে নারীর মর্যাদা রক্ষার রায়” শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেনীর সোনাগাজির উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি ব্যক্তিত্বে, মননে ও দৃঢ়তায় অন্যদের তুলনায় এগিয়ে ছিলেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের লড়াকু মানসিকতা ছিল তাঁর রক্তে। নারীত্বের সম্মান রক্ষায় প্রতিবাদের তেজোদীপ্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়াবেন নুসরাত—এটা ছিল দুশ্চরিত্র আর লম্পট অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার কল্পনারও বাইরে ছিল। আগুনে ঝলসানো শরীর নিয়ে নুসরাত যখন সীমাহীন যন্ত্রণায় কাতর, তখনও তিনি দৃপ্তকণ্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন, তাঁর পরিণতি যাই হোক না কেন, দায়ী অধ্যক্ষ ও তার অনুসারীরা যেন কোনোভাবেই ছাড় না পায়। জীবন সায়াহ্নে দেওয়া এই বক্তব্যকে আইনি ভাষায় বলা হয় ডাইং ডিক্লারেশন নুসরাতের সেই প্রত্যাশারই প্রতিফলন ঘটল অবশেষে। দেশ-বিদেশে চাঞ্চল্য তৈরি করা এই মামলার রায়ে সোনাগাজি ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলাসহ ১৬ আসামীর সবাইকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদÐের আদেশ দিয়েছেন আদালত। (দৈনিক সমকাল, তাং ২৫/১০/১৯)
এই রায় দেশে-বিদেশে সমানভাবে মানবতাবাদী মানুষকে নাড়া দিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করা হয়েছে এই সংবাদ। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি, রয়টার্স, এপি, এএফপি, আলজাজিরা, সিএনএন, নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্টসহ অসংখ্য গণমাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে রায়ের খবর প্রকাশ করা হয়েছে। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, নুসরাত হত্যাকাÐ গোটা দেশকে শোকাহত করে তোলে এবং ন্যায় বিচারের দাবিতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশে এ ধরনের মামলার বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কয়েক বছর লেগে যায়। তবে নুসরাতের মামলা দ্রæততম সময়ে নিষ্পত্তি হওয়া মামলা গুলোর অন্যতম। আলজাজিরা চিকিৎসাধীন নুসরাতের শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত লড়াই করে যাব দেওয়া বক্তব্যের উল্লেখ করেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নুসরাত হত্যার পর জোরালো বিক্ষোভের মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্রæততম সময়ের মধ্যে হত্যাকাÐের বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রæতি দিয়েছিলেন। (দৈনিক সমকাল, ২৫/১০/২০১৯)মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনা এ মামলার রায়ে অত্যন্ত খুশি হয়েছেন। তিনি সত্য উদঘাটনের মধ্য দিয়ে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত হওয়ায় নুসরাত হত্যা মামলার তদন্ত সংস্হা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআিই) সাধুবাদ জানিয়েছেন।
নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকাÐ মামলার রায় এদেশের হাজার হাজার নির্যাতিতার মনে সাহস যোগাবে, অনুপ্রেরণার যোগাবে মৃত্যুঅবধি হার না মানার। রাফি প্রাণ দিয়ে জানান দিয়ে গেল নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেকেই সোচ্চার হতে হবে। নির্যাতন আর সহিংসতার শিকার হয়ে নিজের এবং পরিবারের মান বাঁচাতে নির্যাতনের ঘটনা চেপে গিয়ে তুষের আগুনে পোড়ার চেয়ে প্রতিবাদ করে, চিৎকার করে, ন্যায় বিচারের জন্যে লড়াই করে মৃত্যুর অমিয় সুধা প্রাণ করাই উত্তম। আমাদের মা-বোনদের ভুলে গেলে চলবে না মানুষের একটাই জীবন। এই সুন্দর পৃথিবী থেকে গলায় কলসি বেঁধে বা সিলিং ফ্যানে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে বিদায় নেওয়া কোনো সমস্যার সমাধান নয়। এভাবে পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়া মানে ধর্ষক নামের জানোয়ারকে আরো প্রশ্রয় দেওয়া। একজন নিপীড়ক একবার নিপীড়ন করে পার পেয়ে গেলে সে বিপুল উৎসাহে আবার ঘটাবে একই ঘটনা। সে সঙ্গে তার দেখাদেখি সমাজে জন্ম নেবে নতুন নিপীড়ক-অমানুষ। সুতরাং এ অমানুষদের রুখতে নিজেকে এবং মাতৃজাতির মান সম্মান সমুন্নত রাখতে নুসরাতের মতো প্রত্যেকে নারীকে শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত লড়াই করে যাব এরকম কঠিন সংকল্পবদ্ধ হতে হবে। মনে রাখতে হবে ফেনীর সিরাজ উদ-দৌলাই শেষ লম্পট নয়, আটষট্টি হাজার গ্রামে আছে হাজার হাজার লম্পট। তাদের মূল উৎপাটনে আমাদের সবার উচিত নুসরাত জাহান রাফির আত্মত্যাগ থেকে শিক্ষা নেওয়া।

লেখক : শিশুসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক