সবুজের সমারোহে বিষাদের ছায়া

56

 

একদা বিটিভিতে প্রচারিত হতো চোখে চশমা পড়া গুণী অভিনেতা আবুল খায়েরের একটা জনপ্রিয় বিজ্ঞাপন। তিনি কবিরাজ; একটি গাছ খুঁজছেন, অর্জুন গাছ, ঔষধ বানানোর জন্য। গাছ পাওয়া গেল না। বাবা যে গাছ লাগিয়েছিল, সন্তান সেই গাছ বিক্রি করে দিয়েছে। হতাশ কন্ঠে কবিরাজ বলেন, ‘আমি আর আপনেগো কবিরাজ না। আপনেরা চাইলেও আমি আর ঔষধ দিতে পারুম না’। এরপর তিনি হাটের মধ্যে গাছের চারা বিলি করেন আর বলেন, ‘আর আমাগো সন্তানেরা, তোমাদের জন্য ট্যাকার গাছ লাগাইলাম, অক্সিজেনের ফ্যাক্টরি বানাইলাম’- জী হ্যাঁ, প্রাকৃতিক অক্সিজেনের ফ্যাক্টরি হচ্ছে এই গাছ। ছোট্ট কিন্তু অতি শক্তিশালী মেসেজসহ এই বিজ্ঞাপন এখন আর প্রচারিত না হওয়াতে আমাদের স্মৃতি থেকে মুছে যাচ্ছে। ফলে নানান ধরনের অসুস্থতা ও বিকৃতি আমাদের গ্রাস করেছে।
চট্টগ্রাম শহরের ঠিক হৃদপিÐের মতন একটা জায়গা। একা বাকা সর্পিল পথ, ছবির মতো পাহাড়ি পরিবেশ আর শতবর্ষী বৃক্ষরাজি দেখতে দেখতে মন হারিয়ে যায় অজানায়। যে গাছগুলো শত বছরের স্মৃতি আঁকড়ে সময়কে ধরে রেখেছে। নগরীর এম এ আজিজ স্টেডিয়ামের পশ্চিম পাশের সড়ক ধরে কদমতলীর দিকে এগিয়ে গেলে পাহাড়ে ঘেরা সবুজ শান্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ আপনাকে নিয়ে যাবে অন্য এক জগতে। পাহাড়ের ভেতর শহর অথবা শহরের ভেতরে পাহাড় যেভাবেই বলা হোক; চট্টগ্রাম শহরের গৌরবময় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতীক, স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন অপূর্ব শোভামন্ডিত বন্দর নগরীর প্রাচীন ভবন ও বাংলাদেশ রেলওয়ের (পূর্বাঞ্চলীয়) মহাব্যবস্থাপকের নিয়ন্ত্রণ কার্যালয় সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং সংক্ষেপে সিআরবি ভবন দাঁড়িয়ে আছে এখানে।
গোটা এলাকার ঠিক কেন্দ্রে রয়েছে শিরীষতলা নামে একটি প্রশস্ত মাঠ, যেখানে প্রতিবছর বসে নানান সাংস্কৃতিক কর্মকাÐ। পহেলা বৈশাখ, পহেলা ফাল্গুন সহ নানান জাতীয় ও স্থানীয় ঐতিহ্যগত উৎসব আয়োজন হয় এখানে। সিআরবির পূর্বদিকে রেলওয়ে হাসপাতাল। সবুজ মাঠ, পাহাড়ে রয়েছে নান্দনিক হাতির বাংলো। রয়েছে বাংলাদেশের প্রথম বাষ্পীয় রেল লোকোমোটিভ। বলা হয়, একটা সময় ছিল যখন এখানের পাহাড়ের চ‚ড়ায় দাঁড়ালে দেখা যেত সমুদ্র। শহরে উঁচু উঁচু ভবন নির্মাণের ফলে সেই দৃশ্য আর দেখা যায়না। এখানে রয়েছে বাংলাদেশের একমাত্র বিস্ময়কর সাত রাস্তার মোড়। অসংখ্য রেইনট্রি, শতবর্ষী গাছ, সারি সারি পাহাড়, টিলা ও সমতলের সমন্বয়ে এই সিআরবি শিরীষতলা নগরের অন্যতম প্রধান সংস্কৃতি ও বিনোদনের চারণভূমি। বছরের প্রতিটা দিনেই এখানে মানুষ আসে খোলা হাওায় সবুজের আহবানে। সকাল থেকে রাতঅবধি মাঠে ছুটাছুটি করে শিশু-কিশোর, বয়স্করাও। দেশ-বিদেশের অতিথিরা চট্টগ্রামে এলেই আসেন সিআরবি-তে। নাগরিক জীবনে এঅঞ্চলের মানুষ একটু হাফিয়ে উঠলেই এখানে ছুটে আসেন একটু শান্তির নিশ্বাস নিতে। জনারণ্যে পাখির অভয়ারণ্য সকাল-সন্ধ্যা-রাত কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত থাকে।

planting tree in garden. concept save world green earth

খুব স্বল্প করে লেখাটা পড়তে পড়তে সবুজের সমারোহে আপনি যখনই হারিয়ে যাচ্ছেন ঠিক তখনি মন খারাপের সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদটা সব ভাবনা গুলোকে এলোমেলো করে দিবে। পাহাড় সবুজে ঘেরা প্রকৃতির বদন্যতাকে ধ্বংস করে হাসপাতাল নির্মাণের এক হঠকারী ও শিশুসুলভ সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। বিচিত্র এক শর্তানুসারে প্রস্তাবনা এসেছে সরকারি-বেসরকারি অংশিদারিত্ব চুক্তির আওতায় সেখানে একটি ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট বিশেষায়িত হাসপাতাল ও ১০০ আসন বিশিষ্ট মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার। এ ঘটনায় নুন্যতম সচেতন মহলে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও কর্তৃপক্ষ বলছে, বর্তমানে রেলওয়ের যে হাসপাতালটি আছে তার পার্শেই গোয়ালপাড়া সহ প্রায় ৬ একর জায়গায় নতুন এই প্রকল্পটি গড়ে উঠবে, এতে শতবর্ষী গাছ কাটা হবে না এবং সিআরবি এলাকায় মুল অবয়ব অক্ষুন্ন থাকবে। কিন্তু সরেজমিনে দেখা যায়, যে স্থানটিকে গোয়ালপাড়া বলা হচ্ছে সেটা আসলে বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আবদুর রবের সমাধিস্থল, যিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের প্রথম নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবের সূচনা ও মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে রেলওয়ের যেসকল শ্রমিক-কর্মচারী শহিদ হয়েছেন তাদের স্মৃতির সঠিক সংরক্ষণ না করে উল্টো শহীদের কবর ও তাঁর নামের কলোনির জায়গাটাকে তারা বেসরকারি খাতে বরাদ্দ দিয়েছে। চট্টলার নানা স্তরের ব্যক্তিবর্গ ইতিমধ্যে এর বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন এবং এই স্থাপনার বিপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করছেন। হাসপাতাল নির্মাণ অবশ্যই সকলের জন্যে আনন্দের সংবাদ। বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষের প্রচুর উন্নতমানের হাসপাতাল প্রয়োজন। কিন্তু যে আপত্তিটা এসেছে সেটা হল, হাসপাতাল নির্মাণের স্থান প্রসঙ্গে।
চট্টগ্রাম অন্যতম দ্রæত বর্ধমান একটি নগর, যেখানে বিবিধ উন্নয়ন ও পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি দেশের প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাজনৈতিক কর্মকাÐ ও সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে চট্টগ্রাম। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিবিধ প্রয়োজনে মানুষ ছুটছে বন্দর নগরীতে। যানজট সহ নানা কৃত্রিম সমস্যার সৃষ্টি করছে। স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনাবিদগন দীর্ঘদিন ধরে বলছেন, শহরের উপর চাপ কমাতে ও বহু নাগরিক সমস্যা সমাধানে নগর বিকেন্দ্রীকরণ করার কথা। চট্টগ্রাম শহরের সাথে লাগোয়া উপজেলা গুলোতে প্রচুর পরিত্যাক্ত জায়গা খালি আছে। সেখানে উন্নতমানের ও বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ করা যায়। তাহলে সেই হাসপাতালকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে নতুন কর্মসংস্থান, উন্নত রাস্তাঘাট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। এমন একটি হাসপাতাল বদলে দিতে পারে গোটা একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে। আমাদের পার্শবর্তী দেশেও অনুন্নত কিছু স্থানে এমন অনেক আধুনিক হাসপাতাল গড়ে উঠেছে, যার ফলে সেই অনুন্নত জায়গায়টা পরিণত হয়েছে উন্নত ও আধুনিক নগরে। হাসপাতাল নগরের ঠিক মধ্যখানে হতে হবে এমন তো কোন বাধ্যবাধকতা নেই। আশঙ্কা করা হচ্ছে এর নির্মানযজ্ঞ শুরু হলে, পরিবেশের ক্ষতি তো হবেই সাথে সাথে বাড়বে যানজট, হাসপাতাল বর্জ্যে দূষণ, ফুটপাত দখল ও জনগণের জন্য উন্মুক্ত জায়গার সঙ্কট। হাসপাতালকে ঘিরে গড়ে উঠবে ছোট বড় স্থাপনা, দোকান-পাট, হকার সহ বাড়বে নানান জটিলতা। সঙ্গত কারনে গোটা এলাকাটি তার বিশেষত্ব হারাবে। অনিষ্টের পরিমান পরিমাপ করা তেমন কোন জটিল বিষয় বা রকেট সায়েন্স নয়। প্রস্তাবিত এই বিশেষায়িত হাসপাতালটিতে নিম্ন ও সাধারন শ্রেণীর মানুষের সেবা নেয়ার সামর্থ খুব একটা হবেনা বললেই চলে। তাছাড়া কোন সভ্য রাষ্ট্রে শিশুদের খেলার পরিবেশ বিনষ্ট করে এমন কিছু করা একেবারেই উচিত নয়।
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন অভিঘাত মোকাবিলা, জীব-বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও দারিদ্র বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আর্থ-সামাজিক উন্নয়নসহ পরিবেশ উন্নয়নে দেশের সর্বত্র ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ করা হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রতিকূলতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ এখন রোল মডেল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্ব নেতাদের মধ্যে অন্যতম যিনি জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যাটি নিয়ে সামনে থেকেই নেতৃত্ব দিচ্ছেন। একারণেই সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোতে পরিবেশের ওপর সব ধরনের প্রভাব নিয়ে একনেক-এ বিস্তারিত আলোচনা হয়। সার্বিক উন্নয়ন প্রকল্প সমুহ প্রকৃতি, জলবায়ু পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর লক্ষ্য রেখে নেওয়া হয়। তাহলে আমরা আশা করব এখানে এর কোন ব্যত্যয় ঘটবেনা।
আমাজন বন যদি পৃথিবীর ফুসফুস হয়ে তাহলে, এই সিআরবি এলাকাটাকে বলতে হয় চট্টলার ফুসফুস। শহরের প্রাণকেন্দ্রে দৃষ্টিনন্দন সবুজ জায়গা, যেখানে মানুষ বুক ভরে নিশ্বাস নিতে পারে, হাঁটতে পারে। এমন একটি জায়গায় হাসপাতালের স্থান নির্ধারনে যথেষ্ট সচেতন হওয়া দরকার ছিল। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, চট্টগ্রাম শহরের একটা মাস্টারপ্ল্যান আছে যেখানে সিআরবি’র মতো হেরিটেজকে রক্ষা করার কথা বলা হয়েছে। তাই সিআরবিতে যে কোনো ধরনের বাণিজ্যিক স্থাপনা সিডিএ’র মাস্টারপ্ল্যানের লঙ্ঘন। এই সিআরবি এলাকাটিকে রক্ষা করার জন্যে প্রকৃতিপ্রেমী, সংস্কৃতিকর্মী, সুশীলসমাজ, রাজনীতিবিদ সহ সর্বস্তরের মানুষ আজ একাট্টা হয়েছে। সেটা কেবল প্রকৃতি ও মানুষের স্বার্থ রক্ষা করার জন্যে। এই হাসপাতাল তো মানুষের জন্যে! এখন মানুষ যদি এখানে হাসপাতাল না চায়, তাহলে কর্তৃপক্ষের এমন গোয়ার্তুমি কেন? কাদের স্বার্থ রক্ষা করতে চায় তারা? চট্টগ্রামে আধুনিক হাসপাতালের প্রয়োজন আছে, তবে তা উপযুক্ত স্থানেই নির্মান হওয়া উচিত। ব্যাপারটা এমন নয় যে, এই জায়গাতেই হাসপাতালটা করতে হবে। রেলওয়ের অনেক পরিত্যক্ত জায়গা আছে, সুবিধাজনক অন্য যেকোন জায়গাতেই সেটি করা সম্ভব। প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক বলয় হুমকির মুখে ফেলে কোন ধরনের বাণিজ্যিক স্থাপনা সিআরবি এলাকায় গড়ে উঠলে সেটা হবে আত্মঘাতী। আশা করি গণমানুষের এই আর্তনাদ যথাযথ কর্তৃপক্ষের বোধোদয় ঘটাবে এবং তারা নিশ্চয় এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবেন। অক্সিজেনের ফ্যাক্টরি ধ্বংস করে, সবুজ উজাড় করে, মানুষের বুক ভরা নিশ্বাস নেয়ার জায়গাটা নষ্ট করে, পরিবেশ ও ঐতিহ্যের ক্ষতি করে কোন ধরনের স্থাপনা নির্মাণ কাম্য নয়।
লেখক: কলামিস্ট ও সাবেক ছাত্রনেতাা