সফল হোক গণটিকাদান কার্যক্রম নাগরিক সচেতনতা বাড়াতে হবে

16

বৈশ্বিক করোনা মহামারি চীনের হিসাব অনুযায়ী এক বছর তিনমাস অতিক্রম হয়েছে। আর বাংলাদেশে এ সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে প্রায় একবছর হতে চলছে। এ সময়ে মহামারিতে বিশ্বে এ পর্যন্ত প্রাণ গেছে ২৩ লাখের বেশি মানুষের। আক্রান্ত হয়েছে ১০ কোটি ৫৫ লাখের বেশি মানুষ। প্রতিদিন পাঁচ লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। করোনা ভাইরাসে আক্রমণে যখন সারা বিশ্ব নাজুক পরিস্থিতে তখন কিছুটা আশা জাগিয়েছে করোনার ভ্যাকসিন বা টিকা আবিষ্কার এবং এর প্রয়োগ। গত ডিসেম্বরে যুক্তরাজ্যসহ ক্রমান্বয়ে ইউরোপ ও আমেরিকায় টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়। বাংলাদেশ সরকার আগেভাগে ভারত থেকে টিকা কিনে নেয়। এর কিছু ডোজ গত মাসের ২৫ তারিখ নাগাদ বাংলাদেশে আসে। এর আগে ভারত সরকার বাংলাদেশকে ২০ লাখ টিকা উপহার হিসাবে প্রদান করেছে। দেশে প্রথম চালানে আসা টিকা কার্যক্রম ঢাকাই ফ্রন্ট লাইনারদের মধ্যে গত ২৭ জানুয়ারি শুরু করলেও দেশব্যাপী গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে গতকাল রবিবার থেকে। একইসাথে চট্টগ্রামেও এ টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল হাসপাতাল কলেজে শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান নওফেল নিজে টিকা গ্রহণের মাধ্যমে এ কার্যক্রমের শুভ সূচনা করা হয়। এরপর মহানগরে আরো কয়েকটি কেন্দ্রসহ চট্টগ্রাম বিভাগের সবকটি জেলা-উপজেলায় এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে সূত্র জানায়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ সূত্রে জানায়, এর মধ্যে তিন লাখেরও বেশি মানুষ টিকা নেওয়ার জন্য নিজেদের নাম নিবন্ধিত করেছেন। যারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা পাওয়ার কথা তাদের কেউ অনলাইনে নিবন্ধন করতে না পারলেও স্পটে নিবন্ধনের ব্যবস্থা রয়েছে বলে স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান। প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, সাধারণ মানুষকে টিকা নিতে উৎসাহিত করার জন্য কর্মসূচির রাজধানী ঢাকা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে শুরুতেই টিকা গ্রহণ করেছেন মন্ত্রী, সচিব, স্বাস্থ্যকর্মী ও জনপ্রতিনিধিরা। প্রথম মাসে ৩০ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, উন্নত বিশ্বের কয়েকটি দেশে গত বছর ডিসেম্বরে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হলেও অনেক দেশ এখনো টিকার সরবরাহ পায়নি। সেদিক থেকে আমাদের বাংলাদেশ ভাগ্যবানই বলা যায়। কারণ ইতোমধ্যে ৭০ লাখ ডোজের বেশি টিকা বাংলাদেশে চলে এসেছে। ঘোষণা অনুযায়ী, এ মাসে আসবে আরো ৫০ লাখ ডোজ। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট মোট তিন কোটি ডোজ টিকা দেবে। কোভ্যাক্সের মাধ্যমে পাওয়া যাবে আরো প্রায় দুই কোটি ডোজ টিকা। অন্যান্য উৎস থেকেও টিকা সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া বেসরকারি পর্যায়েও টিকা আমদানির প্রক্রিয়া চলছে। ১৮ বছরের কম বয়সী ও গর্ভবতীদের বাদ দিলে দেশে টিকার আওতায় আসবে প্রায় ১০ কোটি মানুষ। আশা করা যাচ্ছে, এই পরিমাণ টিকা সংগ্রহে আমাদের খুব একটা সমস্যা হবে না; কিন্তু সমস্যা হবে টিকা দেওয়া নিয়ে। ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে দেখা গেছে, নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে টিকা নেওয়ার আগ্রহ কম। তাদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য পর্যাপ্ত প্রচার কার্যক্রমও নেই। অন্যদিকে টিকা নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে নানা ধরনের অপপ্রচারও রয়েছে। বিরোধী কিছু রাজনৈতিক দলের মধ্য থেকেও একধরনের নেতিবাচক প্রচারণা রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে না বুঝেও বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। অথচ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচি সফল করার জন্য কমপক্ষে ৮০ শতাংশ মানুষকে এই কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, টিকা কার্যক্রম শুরু হলেও করোনা প্রতিরোধে যেসব নিয়ম-কানুনের কথা বলা হচ্ছিল সেগুলো মেনে চলতেই হবে। বিশেষ করে মাস্ক পরা, বারবার হাত ধোয়া এবং সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা এখন আরো বেশি প্রয়োজন। তার কারণ মানুষ এখন অনেক বেশি ঘরের বাইরে যাচ্ছে, চলাফেরা ও মেলামেশা করছে। তাই সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ছে। অথচ দেখা যাচ্ছে, মানুষ মাস্ক পরা প্রায় ছেড়েই দিয়েছে। ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’ সরকারের এমন আইনি ঘোষণার পর অফিস-আদালতে মাস্কের চর্চা কিছুটা থাকলেও রাস্তাঘাট, হাট-বাজার, গণপরিবহন, পাবলিক স্পেইজ বা সামাজিক মেলামেশার স্থানগুলোতে তা প্রায় নেই বললেই চলে। এ অবস্থায় টিকাদান কর্মসূচি কতটুকু সফল হবে তা বিবেচনার বিষয়।
আমরা মনে করি, সামাজিক সচেতনতার ওপর সরকার ও স্বাস্থ্য বিভাগকে আরো বেশি জোর দিতে হবে। পাশাপাশি টিকা কার্যক্রম বিষয়ে সাধারণ মানুষের কাছে ইতিবাচক প্রচারণা বাড়াতে হবে, মানুষকে টিকাগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।