সন্দ্বীপে অনাবাদি পড়ে থাকে শত শত হেক্টর জমি

6

সাইফ রাব্বী, সন্দ্বীপ

চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্ন উপজেলা সন্দ্বীপের কৃষি বিভাগে কর্মরত উপ-সহকারী কর্মকর্তাদের চিনেন না কৃষকরা। ব্লক সুপারভাইজার হিসেবে পরিচিত এসব কর্মকর্তারা মাঠে গিয়ে কৃষকদের উৎসাহ, পরামর্শ ও পরিকল্পনা প্রণয়ন করে কৃষি উন্নয়নের দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন। সন্দ্বীপের ১৫টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় ২০ জন উপ-সহকারী কর্মকর্তাকে এ দায়িত্ব পালনে পদায়িত করা হয়েছে। কৃষকরা যাতে জরুরি প্রয়োজনে ব্লক সুপারভাইজারের সাথে কৃষি বিষয়ে পরামর্শসহ বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সেবা দিতে পারেন এজন্য প্রায় ইউপি ভবনে তাদের জন্য রয়েছে পৃথক অফিস। কিন্তু পৌরসভা ও ১৫টি ইউনিয়নের দায়িত্বে নিয়োজিত ওই ২০ জন কর্মকর্তার (ব্লক সুপারভাইজার) বেশিরভাগই অফিসে বসেন না। তাদের চিনেন না সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানও।
দ্বীপের প্রায় সব ইউপি চেয়ারম্যানের অভিযোগ, বেশিরভাগ সময় ব্লক সুপারভাইজারদের পাওয়া যায় না। অথচ সপ্তাহে একদিন ছাড়া কার্যদিবসের প্রতিদিন দায়িত্বরত ইউপি ভবনে তাদের উপস্থিত থাকার কথা। গত বুধবার সরেজমিনে বিভিন্ন ইউপি ভবনে গিয়ে তাদের কাউকেই পাওয়া যায়নি। মোবাইলেও অনেকের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি, যাদের সাথে ফোনে আলাপ হয়েছে তাদের কেউ ওই এলাকার মাঠে বা এলাকায় উপস্থিতির কথা স্বীকার করেননি। কেউ ট্রেনিংয়ে, কেউ ছুটিতে, কারো বাচ্চার অসুখ, কিংবা আত্মীয়ের অসুখ আবার কারো নিজের অসুস্থতার কারণে অনুপস্থিতির কথা মোবাইলে জানিয়েছেন।
সরেজমিনে প্র্রায় ১ মাস ধরে ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে দেখা গেছে, কেউ অফিসে নেই। এ প্রসঙ্গে কালাপানিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আলিমুর রাজী টিটু বলেন, ব্লক সুপারভাইজাররা কেউ আসেন না। কালাপানিয়া-২ ব্লকে দায়িত্বপ্রাপ্ত রূপম দাশ আকাশ জানান, ‘আমি ছুটিতে ফরিদপুর আছি। আত্মীয়ের বাচ্চা হয়েছে, দেখতে এসেছি। নতুন দায়িত্ব পেয়েছি তবে এখনও বুঝে পাইনি, আগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্লকে যেতাম সপ্তাহ ২/৩ দিন। সন্দ্বীপে যাতায়াত সমস্যার কারণে যেতে পারি না।’
আজিমপুর ইউপি চেয়ারম্যান শামসুদ্দিন রকি, দীর্ঘাপাড় ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কাসেমসহ কয়েকজন চেয়ারম্যান অভিযোগ করে বলেন, ব্লক সুপারভাইজারদের কাছ থেকে সাধারণ কৃষক কাঙ্কিত সেবা পাচ্ছেন না। তবে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের তদারকিতে কয়েকটি প্রদর্শনী ক্ষেত ও বাগানের দেখা মিলেছে। এ বিষয়ে সন্তোষপুর ইউনিয়নের কৃষি উদ্যোক্তা আবছার বলেন, ‘আমি ড্রাগন চাষ করতে একটি প্রদর্শনী ক্ষেতের অনুমোদনের জন্য উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছে গিয়েছিলাম দু’মাস আগে। তিনি ব্লক সুপারভাইজার পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও আজো তাদের দেখা মিলেনি।’ সন্দ্বীপ পৌরসভার মেয়র মোক্তাদের মাওলা সেলিম বলেন, ‘তাদের সাথে আমার কখনও দেখা হয়নি।’ পৌরসভায় পদায়িত উপ-সহকারী কর্মকর্তা ইমাম হোসেন বলেন, ‘আমাকে নতুন ব্লকের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। আমি সন্দ্বীপ আছি, বৃষ্টির কারণে বের হতে পারছি না।’ সন্দ্বীপের শস্যভান্ডার হিসেবে খ্যাত উরিরচর ইউনিয়নের দায়িত্বে নিয়োজিত উপ-সহকারী কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেনের সাথে কথা হলে তিনি রাগতস্বরে বলেন, ‘আপনি কি আমার বস, আপনাকে বলতে হবে কর্মস্থলে আছি কিনা। ঢাকায় আমার অফিসে আমার বস বরাবর অভিযোগ করেন।’
২০ জন উপ-সহকারী কর্মকর্তার মধ্যে ক’জন ট্রেনিংয়ে বা ছুটিতে আছেন তা জানতে উপজেলা কৃষি অফিসে গেলে কর্মরত অফিস সহকারীরা জানান, এটা তাদের জানা নেই, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলতে পারবেন। কৃষি কর্মকর্তা মো. মারুফ হোসেনকে কর্মস্থলে না পেয়ে মোবাইলে বার বার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।
একসময় সন্দ্বীপের বিভিন্ন এলাকা ধান, রবিশস্য, শাকসবজি, নারিকেল উৎপাদনে ছিল প্রসিদ্ধ। দ্বীপের চাহিদা পূরণ করে এগুলো যেত পার্শ্ববর্তী জেলা নোয়াখালী ও চট্টগ্রামে। বর্তমানে উদ্বুদ্ধকরণের অভাবে এবং চাষাবাদে নতুন কৌশল প্রয়োগে ব্যর্থ হওয়ার কারণে এখানকার কৃষকরা আবাদে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন বিপুল সংখ্যক কৃষক, অনাবাদি হচ্ছে শত শত হেক্টর জমি।