সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে আশুরার শিক্ষা ত্যাগের মহিমায় ভাস্কর

7

আজ ১৪৪৪ হিজরির ১০ মুহররম। পবিত্র আশুরা দিবস। ইসলামের ইতিহাসে সৃষ্টির উচ্ছ¡াস আর সত্য প্রতিষ্ঠার মহান ত্যাগের এক অদ্বিতীয় দৃষ্টান্ত এ দিনটি। আরবি ‘আশুরা’ শব্দটি ‘আশরুন’ শব্দের বহুবচন। পৃথিবীর সৃষ্টি থেকে ৬১ হিজরিতে ইরাকের ফোরাত নদীর তীর কারবালার প্রান্তর পর্যন্ত বহু ঘটনা-দুর্ঘটনা এ দিনে সংঘটিত হয়েছে বলে দিনটিকে আশুরা বলা হয়। বিশ্বজগতের সৃষ্টিলগ্ন হতে এ দিবসটি বিশেষ মর্যাদা ও সম্মানে ভূষিত। আরব দেশে জিলক্বদ, জিলহজ, মহররম ও সফর এই চারটি মাস অধিক মর্যাদাপূর্ণ। এই মাসগুলিকে একত্রে বলা হয়, আশহারুল হুরুম বা সম্মানিত মাসসমূহ। পবিত্র কুরআনের সূরা তাওবার ৩৬ নং আয়াতে এই ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ পাওয়া যায়। মর্মার্থ হচ্ছে, মুহাররম পবিত্র মাস, আর এ মাসের আশুরা তথা দশম তারিখ এ মাসটিকে করেছে আরো মহিমান্বিত। কেননা এ পবিত্র দিনে আল্লাহ তা’আলার হুকুমে দুনিয়া সৃষ্টি হয়েছে। আবার কিয়ামতও সংঘটিত হবে এ দিনে। এ দিনে আল্লাহর পক্ষ থেকে পৃথিবীতে আগমন করেন, প্রায় দুই হাজার নবী-রাসুল আলাইহিমুস সুলাম। মানব জাতির পিতা হজরত আদমের (আ) দেহে পাক রুহ প্রদান, মা হাওয়াকে (আ) সৃষ্টি, মহাপ্লাবন শেষে হজরত নূহ নবীর (আ) জুদি পাহাড়ে অবতরণ, নমরুদের অগ্নিকাÐ হতে মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিমের (আ) নাজাত, ৪০ দিন মাছের পেটে থাকার পর হজরত ইউনুসের (আ) নিষ্কৃতি, হজরত আইউবের (আ) ১৮ বছর পর রোগমুক্তি, হজরত মুসার (আ)-এর নীলনদ পাড়িদান ও ফেরাউনের সলিলসমাধি, হজরত ঈসা (আ)-এর ঊর্ধ্বাকাশে গমন প্রভৃতি অসংখ্য আলোড়ন সৃষ্টিকারী ও অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী এই দিবসটি।
এসব কারণে আশুরা বিশ্ববাসীর জন্য কৃতজ্ঞা প্রকাশের দিন। সকল ধর্ম-সম্প্রদায়ের লোকের জন্য এ দিবসে কোন না কোন নিয়ামত আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু ইসলামের ইতিহাসে এ দিনটি মোটেই বাহ্যিক অর্থে মোটেই সুখকর নয়। ৬১ হিজরির ১০ মহররমের এদিনেই ঘটে বিশ্ব মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচাইতে মর্মান্তিক ও বিয়োগান্তক ঘটনা। এদিনে বর্তমান ইরাকের ফোরাত নদীর তীরে কারবালার মরুপ্রান্তরে আখেরী নবী রহমাতুল্লিল আলামিন হজরত মুহাম্মদ (স)-এর প্রিয় দৌহিত্র এবং ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী ও খাতুনে জান্নাত হজরত ফাতেমাতুয যাহরার (রা) আদরের পুত্র ইমাম হুসাইন (রা) শাহাদাত বরণ করেন। সেই হিসেবে আশুরা পৃথিবীর শোকাবহ একটি দিনের চিরন্তন প্রতীকও বটে। ঐদিন ইমাম হুসাইন (রা)সহ ৭২ জন সঙ্গী-সাথী শহীদ হন, যাঁদের অধিকাংশই ছিলেন আহলে বায়াত বা নবী করিম (দ.) এর বংশধর। কারবালার এই মর্মন্তুদ ঘটনা কুটিলতা ও নৃশংসতার দৃষ্টান্ত হিসেবে ইসলামের ইতিহাসে স্মরণীয়। ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, ইহুদী ও খ্রিস্টান সম্প্রদায় এ দিনটি রোজা পালনসহ বিভিন্ন উৎসব আনন্দের আয়োজন করে থাকে। কিন্তু মুসলমানরা এ দিনটিকে শোক আর বেদনার দিন হিসাবে আয়োজন করে থাকে। এ আয়োজনে সুন্নি এবং শিয়াদের মাঝে বিস্তর তফাৎ লক্ষ্যনীয়। শিয়ারা এ দিন তাজিয়া মিছিল বের করে লোহার শিকলসহ নানা উপায়ে নিজেদের শরীরে আঘাত করে অনুসুচনা প্রকাশ করে থাকে। নানা ঢোল-বাজনা ও মাতম গেয়ে অনেকটা উৎসবে পরিণত করতে দেখা যায় তাজিয়া মিছিলকে। সুন্নি মুসলমানদের কাছে এধরনের আয়োজন শরিয়ত সম্মত নয়, বিধায় তারা মসজিদে, খানকায় ও ঘরে বসে ইবাদাত-বন্দেগি, আলোচনা ও মিলাদ মাহফিলসহ ফাতেহাখানী করে মুসলমানদের সৃষ্টির নানা রহস্য ও ইমাম হোসাইন (রা.) এর ত্যাগের মর্ম তুলে ধরেন। মুসলমানদের সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার আহবান জানান। যে যাই করুক এ দিনটির তাৎপর্য ও গাম্ভীর্য ফুটে উঠুক, সত্য-সুন্দরের প্রকাশে ত্যাগ, ধৈর্য ও সহমর্মিতার বিকল্প নেই-এমনটি চেতনা আমাদের মধ্যে জাগ্রত হোক।
এ বছর আশুরা এসেছে করোনার মহামারি ভয়াবহতা মুক্ত পরিবেশে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দক্ষ পরিচালনায় দেশের করোনা পরিস্থিতি অনেকখানি নিয়ন্ত্রিত। করোনা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য আমরা মহান আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করছি। করোনা মহামারীর সংক্রমণ বর্তমানে একটু বাড়ায় গত বছরের মতো তাজিয়া মিছিল বন্ধ থাকাই শ্রেয় বলে মনে করে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা। করোনা মহামারীর সংক্রমণ বর্তমানে অনেকখানি নিয়ন্ত্রণে। তবু গত বছরের মতো তাজিয়া মিছিল বন্ধ থাকাই শ্রেয় বলে মনে করে চিকিৎসকরা।
নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়, আশুরার যে ত্যাগের চেতনা, তাকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারলে পৃথিবী থেকে হিংসা বিদ্বেষের অবসান ঘটবে। আমাদের মনে রাখা চাই, আশুরার মূল চেতনা অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের সংগ্রাম। সেই সংগ্রামে চাই ধৈর্য ও সহমর্মিতা। যা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ রয়েছে, এবং এটাই মহররমের শিক্ষা। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়-

“কত মহরম এল গেল, চলে গেল বহু কাল
ভুলিনি গো আজো সেই শহীদের লহুলাল…
ফিরে এল আজ সেই মহরম মাহিনা
ত্যাগ চাই মর্সিয়া ক্রন্দন চাহিনা”।