সচেতনতা ও সতর্কতা জরুরি

9

প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত আমাদের এ বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে দেশের মৌসুমি আবহাওয়ায়ও বেশ পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। এখন চৈত্রের তীব্র তাপদহে জ্বলছে দেশ। আর কয়দির পরে গ্রীষ্মের আগমন ঘটবে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এ গ্রীষ্মে আবহাওয়ার বড় পরিবর্তন ঘটবে। তাপমাত্রার পারদ উঠতে পারে ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি পর্যন্ত। সেইসাথে অন্ততপক্ষে দুটি ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন আবহাওয়া অফিস। এ অবস্থায় সতর্কতা ও সচেতনতা দুটোই অবলম্বন করতে হবে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, গতকাল সোমবার দেশে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের অনেক জায়গায় শিলাবৃষ্টিতে অন্তত ৬০টি গ্রাম লন্ডভন্ড হয়ে পড়েছে। গাছপালাসহ অনেক মানুষ আহত হয়েছেন। সামনের বৈশাখে এ জাতীয় শিলাবৃষ্টি ও ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা আরো বাড়বে। এপ্রিল মাস আসলে এমনিতে চট্টগ্রামবাসীর মনে অজানা আশঙ্কার সৃষ্টি হয়, কখন আবার ‘৯১ এর ২৯ এপ্রিল হাতছানি দেয়। যে ভয়াল রাতের স্মৃতি এখনও উকূলবাসীকে কাঁদায়। এ ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে বাংলাদেশ যে আর না পড়ে সেইজন্য সরকারি পর্যায়ে পূর্ণ প্রস্তুতি জরুরি। আমরা জানি, প্রতিবছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে বাংলাদেশ। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি বিপুল। শুধু সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি নয়, অসংখ্য মানুষের প্রাণও কেড়ে নেয় এসব প্রাকৃতিক বিপর্যয়। ৯১ এর চট্টগ্রামের ঘূর্ণিঝড়ের পর দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় সিডর এবং আইলার ক্ষতি এখনও আমরা পুরো কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এবারও ধেয়ে আসছে নতুন ঘূর্ণিঝড় ফণী।
পৃথিবীর সাজানোর রূপ মুহূর্তেই পাল্টে দিতে পারে ঘূর্ণিঝড়। বিজ্ঞানের সুফলে আমরা ঘূর্ণিঝড়ের আগাম পূর্বাভাস পাই। এতে করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সহজ। ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও আগাম সতর্কবার্তার ফলে সতর্কতামূলক ও সচেতনতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব। এতে করে ধ্বংস, প্রাণক্ষয় এবং আর্থিক লোকসান অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এবারও চলতি মাসে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কার কথা বলা হচ্ছে। তীব্র তাপমাত্র বৃদ্ধির কথাও বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও সতর্কতার পাশাপাশি সরকারের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। ইতঃপূর্বে ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, মোরার আঘাতে দেশের উপকূলীয় এলাকায় বহু ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছিল এবং উড়ে গিয়েছিল গাছপালা। বিগত সময়ে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এখনও পরিষ্কার নয়। তবে বর্তমানে সরকারের আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে উপকূলীয় এলাকার লাখ লাখ মানুষকে সরিয়ে নেওয়ায় হতাহতের সংখ্যা অনেক কমেছে। এবারও সরকার শুরু থেকেই আগাম ব্যবস্থা নিবে বলে প্রত্যাশা। ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত থেকে জনসাধারণ এবং সম্পদ বাঁচাতে সরকার ও সংশ্লিষ্টরা পূর্ব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার সুফল আশা করছি আমরা পাব। প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা মোকাবেলার অভিজ্ঞতা উপকূলবাসীর ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে লড়াইয়ের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। আমরা আশা করি, সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায় থেকেও দুর্যোগ মোকাবেলায় সবাই এগিয়ে আসবে। আর যারাই এগিয়ে আসুন, তাদের সবার উচিত হবে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় নিজেদের দায়িত্ব পালন করা। কারণ স্থানীয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া দুর্যোগ মোকাবেলা এবং দুর্যোগপরবর্তী ত্রাণ ও পুনর্বাসন কাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া তীব্র তাপদাহ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পরিবেশ সচেতনতা অন্যতম উপায়। আমাদের চারপাশে যে দূষণ এবং প্রকৃতিকে ধ্বংস করার যে প্রতিযোগিতা তাতে তাপদাহ বাড়বেই। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার এ চট্টগ্রামের অধিকাংশ পাহাড় আজ ভূমিদস্যুদের দখলে। পাহাড়, সবুজ বৃক্ষ কেটে তৈরি করা হচ্ছে বড় বড় অট্টালিকা। এ দখল ও অবকাঠামো নির্মাণে সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়িত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানসমুহও পিছিয়ে নেই। সম্প্রতি টাইগারপাস এলাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র‌্যাম নামাতে টাইগারপাস এলাকার শতবর্ষী অনেক গাছ কেটে ফেলার প্রক্রিয়া চলছে বলে খবরে প্রকাশিত হয়েছে। এ নিয়ে নগরবাসী ও পরিবেশবাদীদের প্রতিবাদমুখর হতে দেখা যাচ্ছে। তবে স্মতর্ব্য, এ ঘটনা আজ হঠাৎ ঘটেনি। এ এলাকায় উড়াল সেতু না করার জন্য সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে আহবান জানানো হয় প্রায় দুই বছর আগে থেকে। নগর পরিকল্পনাবিদদের অনেকেই এর বিরোধিতা করেছিলেন, কিন্তু সিডিএ তাদের মত করে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে চলছে। যা মোটেই কাম্য ছিল না। আমরা মনে করি, র‌্যামের একান্ত প্রয়োজন হলে তা যেন শতবর্ষী বৃক্ষ আর প্রকৃতিকে অক্ষুন্ন রেখেই করা হয়। অন্যথায় এর দায় সংশ্লিষ্টদের নিতে হবে।