সংক্রমণ কমাতে কঠোর লকডাউন যথাযথ বাস্তবায়নের বিকল্প নেই সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে

5

কোভিড সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের ‘কঠোর লকডাউন’ ব্যবস্থার চতুর্থ দিন আজ। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে নগরবাসী ঘরে থাকতে নারাজ। ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ প্রশাসন অভিযান চালিয়ে ধরে-বেঁধে সাধারণ মানুষকে ঘরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। দুর্ভাগ্য যে, অনেক উচ্চ ও মধ্যবিত্ত সচেতন মানুষ নানা অজুহাতে তাদের নিজস্ব পরিবহন নিয়ে নগরে বা নগরের বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। দেশের দুঃসময়ে মানুষের এমন আচরণ সত্যিই দুঃখজনক। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে দেখা যাচ্ছে, গতবছর অধিকতর কম সংক্রমণ ও মৃত্যুর সময় সাধারণ মানুষ লকডাউনকে যথাযথ আমলে নিয়েছিলেন। কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ও বিভ্রান্ত তথ্যের কারণে পোশাক শিল্পের কর্মীরা যতায়াত করলেও সাধারণ মানুষ ঘর থেকে বের হয়নি। কিন্তু এবার ঢাকা ও চট্টগ্রামে লকডাউনের নিষেধাজ্ঞা ভেঙেই গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি মানুষকে রাস্তায় যাতায়াত করতে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে, রাজপথে লোকজনের আনাগোনা কম দেখা গেলেও অলিগলিতে মানুষের জটলা, এমনকি স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করেই মাস্ক ছাড়াই ঘোরাফেরা করছে বলে গণমাধ্যমে খবর আসছে। লকডাউন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে না পারলে সামনে হয়তো মৃত্যুর হার আরো বেশি দেখতে হবে। লকডাউন বাস্তবায়নে প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে এখনই সচেতন হতে হবে। মহামারি রূপ নেয়া করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে গত ১৪ থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত ৮ দিনের জন্য নতুন করে বিধিনিষেধ (লকডাউন) ঘোষণা করেছে সরকার। এ সময় নিত্যপণ্য, ওষুধ, খাবার দোকান, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কাঁচাবাজার ছাড়া সব ধরনের দোকানপাট ও শপিং মল বন্ধ থাকবে, এমনকি গণপরিবহন, ট্রেন ও আভ্যন্তরীন রোডের ফ্লাইটও বন্ধ রয়েছে।
অবশ্য কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কলকারখানা (বিশেষ গার্মেন্ট) খোলা রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ১২ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে লকডাউন ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। লকডাউনের মধ্যে পালনের জন্য ১৩টি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। আমরা বুঝতে পারছি, করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা সত্তে¡ও পোশাক কারখানা, খাবারের দোকান বা কাঁচাবাজার খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত জনদুর্ভোগ লাঘব ও অর্থনীতির ক্ষতি এড়ানোর উদ্দেশ্যে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে গত তিনদিনে মৃত্যুও হার যেভাবে নব্বই এর ঘরে অবস্থান করছে তাতে পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানসহ দোকানপাট যা খোলা রয়েছে তাও লকডাউনের আওতায় আনা জরুরি। দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অনেকেই কার্ফিওর মত আরো কঠোর অবস্থানে যাওয়ার জন্য সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন বলে আমরা জানতে পারে। কারণ আমাদের দেশের আক্রান্তের দিকে তাকালে তা স্পষ্ট হয়ে উঠে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহের দিকে যাচ্ছে। শ্রমিকদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে রপ্তানি খাতের কারখানাগুলো খোলার কথা বলা হলেও এখন শিল্প অঞ্চলের প্রায় সব কারখানাই খোলা। আংশিকভাবে কিছু কিছু বড় কারখানা স্বাস্থ্যবিধি মানলেও অধিকাংশ কারখানাই কোনো নিয়ম-নীতি মানছে না। এতে করে কারখানাগুলোতে দিন দিন বাড়ছে করোনা ভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা। শ্রমিকরা অভিযোগ করছেন, লোক দেখানোর নামে কারখানা গেটে স্বাস্থ্যবিধি লিখে রাখলেও কারখানার ভেতর শ্রমিকদের বসার ক্ষেত্রে নিরাপদ দূরত্ব রাখছে না। অনেক ছোট ছোট কারখানায় মাস্ক বা দূরত্বেও বালাই নেই। এমন অবস্থা যদি হয় কারখানাগুলোর চিত্রÑ তাতে শঙ্কা বেড়ে যাবে স্বাভাবিক। বাংলাদেশে করোনা মহামারি ইউরোপ-আমেরিকার মতো ব্যাপক সংক্রমণ ও প্রাণঘাতী রূপ নিলে দেশের সামাজিক বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা ভেবে আতঙ্কিত না হয়ে পারা যায় না। আমরা বলব এক্ষেত্রে চীনের অভিজ্ঞতা ও পদক্ষেপ থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশকে আরো সতর্ক ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রতিদিন আমরা মৃত্যুর খবর পাচ্ছি।
এ মৃত্যুর মিছিল কোথায় গিয়ে শেষ হবে, তা আমরা এ মুহূর্তে বলতে পারব না। জীবন রক্ষা ও অর্থনীতির ক্ষতি ন্যূনতম মাত্রায় রাখা- এই উভয় কূল রক্ষার চ্যালেঞ্জে সবাইকে বিচক্ষণতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে ভেন্টিলেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, নিয়মিত মেঝে পরিষ্কার করা, পুরো কর্মস্থল পরিষ্কার ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা, হাত ধোয়া এবং স্যানিটাইজেশনের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ সরবরাহ করা এবং যেখানে প্রয়োজন সেখানে বিনামূল্যে কর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম (পিপিই) সরবরাহ করতে হবে। আমরা আশা করি, সরকার আর কিছুদিন অনমনীয় থেকে কঠোর রকডাউন কঠোরভাবে পালনে বাধ্য করলে মৃত্যু ও সংক্রমণ দুটিই কমে আসবে।