সংক্রমণ কমলেই ঝুঁকি কমেনা

12

আসহাব আরমান

চট্টগ্রামসহ সারাদেশে করোনা সংক্রমণ এখন নিম্নমুখি। গত কয়েকদিন যাবত চট্টগ্রামে সংক্রমণের হার নেমে এসেছে ৩ শতাংশের নিচে। সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি থেকে সারাদেশের ন্যায় চট্টগ্রামেও সংক্রমণের হার কমছে। সেপ্টেম্বর মাসের ৩০ তারিখ নাগাদ চট্টগ্রামে সংক্রমণের হার ৫ শতংাশের নিচে নেমে আসে। আর অক্টোবরের শুরুতে সংক্রমণ আরও কমে ৩ শতাংশের নিচে।
সংক্রমণ কমে আসলেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একইসাথে স্বাস্থ্যবিধি না মানলে সংক্রমণের তৃতীয় ঢেউ আসার আশঙ্কাও প্রকাশ করেন তারা।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ৫ দিনে চট্টগ্রামে করোনা আক্রান্ত হয়েছেন ১১০ জন। এ ৫ দিনই চট্টগ্রামে সংক্রমণের হার ছিল ২ শতাংশের নিচে। এ সময় চট্টগ্রামে সংক্রমণের হার ছিল যথাক্রমে ৮ অক্টোবর ১ দশমিক ৪৮ শতাংশ, ৯ অক্টোবর ১ দশমিক ১৬ শতাংশ, ১০ অক্টোবর ১ দশমিক ৯১ শতাংশ, ১১ অক্টোবর শূন্য দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং ১২ অক্টোবর ১ দশমিক ৫৪ শতাংশ। চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন এক লাখ দুই হাজার ৫০ জন। করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন এক হাজার ৩১২ জন। এ পর্যন্ত চট্টগ্রামের করোনা থেকে সুস্থ হয়েছেন ৮৬ হাজার ৬৯৮ জন।
অন্যদিকে চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত টিকার নিবন্ধন করেছেন ৪০ লাখ ৫৯ হাজার ২১৫ জন। এদের মধ্যে টিকার প্রথম ডোজ গ্রহণ করেছেন ১৯ লাখ ৫২ হাজার ২৩৫ জন। দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণ করেছেন ১১ লাখ ৪৮ হাজার ৩১৫ জন। এখনও টিকার প্রথম ডোজের অপেক্ষায় আছে ২১ লাখ ৬ হাজার ৯৮০ জন এবং দ্বিতীয় ডোজের অপেক্ষায় আছে ৮ লাখ ৩ হাজার ৯২০ জন। চট্টগ্রামের মোট জনসংখ্যার অনুপাতে টিকার নিবন্ধনের হার ৪২ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
এদিকে সংক্রমণ কমার সাথে সাথে মানুষের মধ্যে গাছাড়া ভাব চলে এসেছে। মাস্ক ছাড়াই এখন নাগরিকরা সবখানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। গণপরিবহণ, শপিংমলসহ বিভিন্ন স্থানে জনসমাগম বাড়ছে। সরকারের পক্ষে স্বাস্থ্যবিধি মানার নির্দেশনা থাকলেও সব জায়গায় বারবার উপেক্ষিত হচ্ছে। এ অবস্থায় স্বাস্থ্যবিধির মানার ব্যাপারে সতর্ক করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সংক্রমণ কমে যাওয়া স্বস্তিদায়ক অবশ্যই। আমাদের এটা ধরে রাখতে হবে। সংক্রমণ আর বাড়তে দেওয়া যাবে না। সংক্রমণের হার ১ শতাংশে নিয়ে আসতে হবে। ১ শতাংশের নিচে নামলেই বলা যাবে বাংলাদেশ মোটামুটি করোনামুক্ত হয়েছে। অন্যান্য দেশ থেকে করোনা চলে না গেলে আমরা ঝুঁকিমুক্ত আছি বলা যাবে না। যতদিন বিশ্বে করোনা আছে, আমাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।
আমরা যদি সতর্ক থাকি, তাহলে তৃতীয় ঢেউ আসবে না। সর্বাত্মক প্রস্তুতি থাকতে হবে। এক্ষেত্রে দুটো বিষয়ের প্রতি জোর দিতে হবে। সরকারের প্রতিশ্রæতি অনুযায়ী ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকা দেওয়া; যাতে শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বা হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হবে। তবে এটি কিন্তু সব সময় এক অবস্থায় থাকবে না, সময়ের ব্যবধানে প্রতিরোধক্ষমতা কমবে। সেক্ষেত্রে বুস্টার ডোজ দেওয়ারও প্রয়োজন হবে। তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা থেকে যাবে, যদি আমরা স্বাস্থ্যবিধি মানা ও মানানোর ক্ষেত্রে শিথিলতা দেখাই।
বর্তমানে সবাই করোনাভাইরাস নিয়ে ব্যস্ত। তবে আরো অনেক রকম রোগ আসতে পারে। আজ কোভিড-১৯ আছে, কাল অবশ্যই অন্য কিছু আসবে। এজন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এমার্জিং প্যাথোজেন, যেটা নিয়ে আমরা অনেক চিন্তা করি। নিপা, ডেঙ্গু পরিবর্তন সব জায়গায় হচ্ছে। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়েল রেজিস্ট্যান্সও মারাত্মক জিনিস। একটা জীবাণু যদি রেজিস্ট্যান্ট হয়ে যায়, তাহলে কোনো ওষুধই কাজ করবে না। তখন চিহ্নিত রোগও মহামারি আকারে রূপ নেবে। এমার্জিং এবং রি-এমার্জিং ইনফেকশন নিয়ে সচেতন থাকতে হবে।
করোনা মহামারি মোকাবেলায় করতে গিয়ে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে যে কাঠামো তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যতে কাজে আসবে। শুরুতে ৪-৫টা আরটি-পিসিআর ল্যাব ছিল, এখন এক হাজারের কাছাকাছি হয়েছে। আমরা এখন বায়োসেইফটি-২ তে কাজ করছি। বায়োহ্যাজার্ড নিয়ে সচেতনতা এসেছে। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের প্রভাবে বাংলাদেশে এক সময় করোনা ভাইরাসে দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ১৬ হাজার, মৃত্যু আড়াইশ এবং শনাক্তের হার ৩২ শতাংশের উপরে উঠেছিল। মাসখানেক ধরে সংক্রমণ নিম্নমুখি। আমারদের এ অভিজ্ঞতাগুলো আগামীতে মহামারি মোকাবেলায় সহায়ক হবে।
চট্টগ্রামের সাবেক সিভিল সার্জন ও জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি পূর্বদেশকে বলেন, কোভিড-১৯ আসার পর চট্টগ্রামসহ সারাদেশে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে চট্টগ্রামে করোনার নমুনা পরীক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি নগরীরর বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। বর্তমানে নগরীর সরকারি ও বেসরকারি হাসাপাতালগুলোতে ৩ হাজার ৭৩২টি কোভিড শয্যা রয়েছে। সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন রয়েছে ২৬টি হাসপাতালে। হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা রয়েছে ১৭১টি। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে আইসিইউ শয্যা রয়েছে ১৭১টি এবং ভেন্টিলেটর রয়েছে ৪২টি। আমি মনে করি আগামীতে যেকোনো ধরনের মহামারি মোকাবেলায় চট্টগ্রাম সর্বদা প্রস্তুত।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামসহ সারাদেশে সংক্রমণ এখন কমে আসছে। হাসপাতালে অধিকাংশ কোভিড বেড খালি আছে। চট্টগ্রামে প্রায় ২০ লাখ মানুষ টিকার আওতায় এসেছে। তবে এতে আত্মতৃপ্তিতে ভোগা যাবে না। সবাইকে ঠিক আগের মতই গুরুত্বের সাথে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। কোনো অবস্থাতেই স্বাস্থ্যবিধির অবহেলা করা যাবে না। অন্যথায় সংক্রমণ আবারো বাড়তে পারে।