শোকের মাস দুঃখের মাস আগস্ট

10

এমরান চৌধুরী

শুরু হয়েছে বাঙালি জাতির সবচেয়ে শোকাবহ মাস আগস্ট। এই মাসটি ঘুরেফিরে আসবে বাংলাদেশের মানুষের জীবনে সবচে ভয়ঙ্কর, নিন্দিত, কলংকজনক ও অমানবিক দুটো ঘটনার স্মৃতি নিয়ে। যে ঘটনার কথা এই গাঙ্গেয় বদ্বীপের মানুষেরা কখনো ভুলতে পারবে না। যুগে যুগে আমাদের বয়ে বেড়াতে হবে এই লোমহর্ষক ঘটনার দায়ভার। কারণ এ আগস্ট মাসেই সংঘটিত হয় ইতিহাসের সবচেয়ে নিন্দিত দুটো মানবতা বিরোধী কর্মকান্ড। একটি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, অন্যটি ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। দুটো তারিখের মধ্যে দিনের ব্যবধান মাত্র ৬ দিন। আর বছর হিসেবে ব্যবধান ২৯ বছর। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মানব ইতিহাসের সবচেয়ে জগন্য হত্যাকান্ডটি ঘটিয়েছিল এদেশের কতিপয় বিপথগামী সেনাসদস্য-যাদের নেপথ্যে ছিল তখনকার আওয়ামী পরিবারের বিভিষণ খোন্দকার মোশতাক আহমদসহ অনেকেই। সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার হলো বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে সেদিন যাঁদের জানবাজি রেখে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল তাঁরা কেউ তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেননি। ফলে ঘাতকেরা বিনা প্রতিরোধে স্বাধীনতা প্রাপ্তির মাত্র ৩ বছর ৮ মাসের মাথায় জাতির কর্ণধারকে হত্যা করতে সক্ষম হয়। জাতির পিতাকে বাঁচাতে না পারার মর্মবেদনা সে সময়কার সেনা, নৌ, বিমান ও রক্ষীবাহিনীর প্রধানরা অনুভব করেছিলেন কিনা আমাদের জানা নেই। কিন্তু তাঁরা যে দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছেন, চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন তা সাধারণ মানুষের চোখে পরিষ্কার। রাষ্ট্রীয়ভাবে তারা কোনো বিচারের মুখোমুখি না হলেও বিবেক তাঁদের কখনো ক্ষমা করবে না।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে সংঘটিত নারকীয় পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের ভয়াল বীভৎসতার হৃদয়স্পর্শী বর্ণনা পাওয়া যায় সেনাবাহিনীর তৎকালীন মেজর আলাউদ্দিন আহমেদ পিএসসি’র একটি লেখায়। “ কী বীভিৎসতা! রক্ত, মগজ ও হাড়ের গুঁড়ো ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল প্রতিটি তলার দেয়াল, জানালার কাচ, মেঝে ও ছাদে। রীতিমতো রক্তগঙ্গা বইছে যেন ওই বাড়িতে। গুলির আঘাতে দেয়ালগুলোও ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। চারপাশে রক্তের সাগরের মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল ঘরের জিনিসপত্র। প্রথমতলার সিঁড়ির মাঝখানে নিথর পড়ে আছেন ঘাতকের বুলেটে ঝাঁঝরা হওয়া চেক লুঙ্গি ও সাদা পান্জাবি পরা স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর লাশ। তলপেট ও বুক ছিল বুলেটে ঝাঁঝরা। নিথর দেহের পাশেই পড়েছিল তাঁর ভাঙা চশমা ও তাঁর অতি প্রিয় তামাকের পাইপটি। অভ্যর্থনা কক্ষে শেখ কামাল, টেলিফোন অপারেটর, মূল বেডরুমের সামনে বেগম মুজিব, বেডরুমে সুলতানা কামাল, শেখ জামাল, রোজী জামাল, নিচতলার সিঁড়িসংলগ্ন বাথরুমে শেখ নাসের এবং মূল বেডরুমে দুই ভাবীর ঠিক মাঝখানে বুলেটে ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত অবস্থায় পড়েছিল ছোট্ট শিশু শেখ রাসেলের লাশ।” (বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতার চল্লিশ বছর, আহমেদ ফিরোজ সম্পাদিত, কথাপ্রকাশ ২০১৯, পৃষ্ঠা-৩৯-৪০)। সেদিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহেনা।
সেদিন আরো দুটো বাড়িতে হত্যাকান্ড চালানো হয়েছিল। একটি বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মণির বাড়িতে, অন্যটি বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি তখনকার পানিসম্পদমন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাড়িতে। এ দুটো বাড়িতেও কুলাঙ্গাররা হত্যা করে অন্তঃসত্ত্বা মহিলা ও মাসুম শিশুসহ অনেককে। এদিন তাদের নারকীয় হত্যাযজ্ঞের শিকার হন যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মণি, তাঁর অন্তঃসত্ত¡া স্ত্রী আরজু মণি, আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তাঁর ছেলে আরিফ সেরনিয়াবাত, শিশুপৌত্র সুকান্ত আবদুল্লাহ বাবু, সেরনিয়াবাতের কন্যা বেবী সেরনিয়াবাত, আওয়াগী লীগ নেতা আমির হোসেন আমুর খালাত ভাই আবদুল নঈম খান রিন্টু। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে শহিদ হন বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে ছুটে আসা একমাত্র সেনাসদস্য বঙ্গবন্ধুর প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমদ। হাজার সালাম এই বীর সেনাকর্মকর্তাকে।
একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে ২১ আগস্ট ছিল ১৫ আগস্টের অভিন্ন উদ্দেশ্যে ও লক্ষ্যে পরিচালিত আরেকটি জঘন্য প্রয়াস। শুধু কুশিলব ছিল ভিন্ন। বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকারদের পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে মুছে দেওয়ার চেষ্টা। পঁচাত্তরের পর ২৯ বছর পার হলেও খুনিরা যে বসে নেই তার বড়ো প্রমাণ ২১ আগস্ট। জাতির পিতার কন্যাকে হত্যা করে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন এবং বাংলাদেশকে পাকিস্তানের আদলে জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত করাই ছিল এই পরিকল্পিত হামলার উদ্দেশ্য। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় সে সময়ের বিরোধীদলীয় নেত্রী, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা অল্পের জন্য রক্ষা পেলেও নিহত হন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেত্রী আইভী রহমানসহ ২৪ জন নেতা-কর্মী। আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে বাঁচাতে সেদিন প্রাণ দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীসহ তাঁর একজন নিরাপত্তাকর্মী। আহত হয়েছিলেন কয়েকশ মানুষ। যাঁদের অনেকেই চির জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছেন। তাঁদের কেউ কেউ আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেনি।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট যখন এ ভয়ংকর ঘটনাটি ঘটেছিল তখন ক্ষমতাসীন ছিল জামায়াত-বি.এন.পি’র জোট সরকার। মা-বেটার সরকারের দোর্দন্ডপ্রতাপের মধ্যেও হাওয়া ভবনের হা ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর। এ হাওয়া ভবনের প্রত্যক্ষ মদদে ইসলামী জঙ্গিগোষ্ঠী হরকাতুল জেহাদের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এই দ্বিতীয় ১৫ আগস্ট। হরকাতুল জিহাদের নেতা মুফতি আবদুল হান্নান এবং গ্রেফতারকৃত জঙ্গিদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী এটা এদেশের মানুষের কাছে দিবালোকের মতো পরিষ্কার যে, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মূল লক্ষ্য ছিল শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের হত্যা করা। সেদিন যদি শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের মূল নেতৃত্ব নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত তাহলে দেশে তৈরি হতো এক ভয়ংকর পরিস্থিতির। এ পরিস্থিতির সামাল দিতে ফুৎকারে যে হাওয়া ভবন উড়ে যেত তা ঘটনা সংঘটিত হওয়ার আগে বুঝতে না পারলেও পরে জোট সরকার ঠিকই বুঝতে পেরেছিল বলে মনে হয়। তাই গ্রেনেড হামলার মোড় অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে জোট সরকার জজমিয়া নাটকসহ নিয়েছে নানা ছলচাতুরির আশ্রয়। কিন্তু সত্যকে ধমক দিয়ে থমকে রাখা যায় – কখনো মিথ্যা প্রমাণ করা যায় না। ২১ আগস্ট ঘটনার পর তখনকার জোট সরকার প্রথমে এ পৈশাচিক হত্যাকান্ডকে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল হিসেবে চালিয়ে দিতে সরকার প্রধান থেকে শুরু করে তাদের চামচা বুদ্ধিজীবিরা পর্যন্ত একই কথা বলেছে। তারপর একজন নিরীহ নাগরিককে নিয়ে সাজানো হয়েছে জজমিয়া নাটক। শেষ পর্যন্ত জোট সরকারের জোটের বল আর হাওয়া ভবনের হাওয়া কোনো কাজেই আসল না। থলের বিড়াল বেরিয়ে এলো।
২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর এ নৃশংস হত্যাকান্ডের মামলার রায় প্রকাশিত হয়। রায়ে ১৯ জনের মৃত্যুদন্ড ছাড়াও বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন এবং ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড দেওয়া হয়। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছে জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফজ্জামান বাবর, সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টূ, মেজর জেনারেল (অব) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, বিগেডিয়ার জেনারেল (অব) আবদুর রহিম, মাওলানা তাজউদ্দিন, মাওলানা শেখ আবদুস সালামসহ ১৯জন। যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরী, বিএনপি’র সাবেক সাংসদ মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী কায়কোবাদ প্রমুখ। আসামিদের তালিকা এবং মামলার রায়ে বিভিন্ন মেয়াদে দন্ডপ্রাপ্তদের নাম দেখে কারো বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয় এ ঘটনা কারা ঘটিয়েছিল এবং কি উদ্দেশ্যে ঘটানো হয়েছিল?
এদেশের স্বাধীনতার পেছনে যে মানুষটির ভূমিকা হিমালয়সদৃশ, যে মানুষ ও দলের জন্ম না হলে বাংলাদেশ নামক দেশটি পৃথিবীর মানচিত্রে ঠাঁই পেত না কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস স্বাধীনতার পর এই দল ও দলের নেতাদের ওপর নেমে এসেছে একের পর এক নারকীয় তান্ডব। পঁচাত্তরে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা, ৩ নভেম্বরে জেলের অভ্যন্তরে জাতীয় চার নেতা হত্যা, সর্বশেষ ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা এ সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে যে স্বাধীনতার পরাজিত শত্রুরা বসে নেই। ওরা ঝোপ বুঝে কোপ মারার জন্য ওৎ পেতে আছে। সাপের মতো ওরা ফণা তুলে আছে -সুযোগ পেলেই মারবে ছোবল । একটু কান পাতলেই শোনা যাবে নাগিনীদের বিষাক্ত নিশ্বাসের শব্দ। তাই দেশপ্রেমিক সকল নাগরিককে অশুভ শক্তির যে কোনো তৎপরতায় বিরুদ্ধে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করতে হবে। চোখ কান খোলা রেখে অষ্টপহর সতর্ক থাকতে হবে। একমাত্র দেশপ্রেমিক, সচেতন, সদাজাগ্রত সাধারণ মানুষই পারে দেশ ও স্বাধীনতার বিরুদ্ধে সকল অপপ্রয়াস রুখে দিতে।

লেখক : শিশুসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক