শৈশবের ঈদ

2

 

আমাদের শৈশব মানে সত্তুরের দশক। রোজা শেষ। বাড়ির উঠোন থেকে ঈদের চাঁদ দেখার হুলুস্থূল। একফালি চাঁদ যে প্রথম দেখেছে তার নয়ন সার্থক! প্রতিবছর আমাদের পুকুরপাড়ের তালগাছের মাথায় ইদের চাঁদ উঠে। আমগাছের ঢাল গলিয়ে, মাথার সাথে মাথা লাগিয়ে, দুই চোখ ডানেবামে ঘুরিয়েফিরিয়ে, অনেক ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে তবেই ইদের চাঁদ দেখতে হয়। যে-ই দেখা গেলো অমনি এক শিহরণ বয়ে চলে পুরো শরীরে। ইদের দিন মানে সূর্য উঠার আগেই ঘুম থেকে উঠা। আমাদের বাড়ির সামনে সড়ক বিভাগের একটি মাইলফলক ছিল। এই মাইলফলকে কাঁধেকাঁধ মিলিয়ে সারিবদ্ধভাবে প্রাতঃক্রিয়াদি সম্পন্ন করে, পুকুরের প্রাকৃতিক পরিবেশে যদৃচ্ছা পানি ব্যবহার করে সাফসুতরো হয়ে একেবারে হালকা ঝরঝরে হয়ে যাওয়া। আহ! কী সুখ। এই মাইলফলকের একদিকে কালো অক্ষরে লেখা ‘বান্দরবান ১০ মাইল’, আর অন্যদিকে লেখা ‘কেরানীহাট ৪ মাইল’। আমরা তখন প্রাইমারিতে, অক্ষরজ্ঞানের তালিম নিচ্ছি। আর আমাদের মতো ‘বিদ্বানদের’ বিদ্যা ফলানোর আদর্শ জায়গাও এই মাইলফলকই। রোদ উঠলে বাঁশের ফলা দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বান্দরবান রোডের কালো পিচ তুলে ‘১০’ এবং ‘৪’-এর পরে আরও একটি ‘০’ বসিয়ে দিতাম। এতে বান্দরবানের দূরত্ব হয়ে যেতো ১০০ মাইল আর ‘কেরানীহাটের ৪০ মাইল। এভাবে পথচারীদের গোল খাওয়াতে পেরে এক অনাবিল তৃপ্তি অনুভব করতাম। এই ‘তৃপ্তির’-স্বাদ আমরা ক’জন ‘বিদ্বান’ ছাড়া আর কারো পক্ষে আস্বাদন করার কথা নয়। কিন্তু বেলা বাড়ার সাথে সাথে কৃত্রিম অক্ষরগুলোর পিচ ল্যাপটে গিয়ে এক বিশ্রী অবস্থার সৃষ্টি করতো।
বোমাংহাট থেকে কেনা নতুন পোশাক গতরাত পর্যন্ত কেউ দেখতে পায়নি। দেখবে কেন, ইদের পোশাক ইদের দিনেই সুন্দর। আগেরদিন বন্ধুদের দেখিয়ে এর মরতবা নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। দুরন্ত সন্তানকে নতুন পোশাক পরাতে মায়ের ধৈর্যের পরীক্ষা হয়ে যায়। মাথায় নারকেল তেল, মুখে-গলায় পাউডার ছিটিয়ে, কাপড়ে হালকা আতর মাখিয়ে একেবারে সাহেবি বেশ। তারপর হাতে একটি প্লাস্টিকের ঘড়ি, চোখে রঙিন চশমা লাগিয়ে একটা হিরো হিরো ভাব নিয়ে ঈদগাহের পথে পা বাড়ায় বীরদর্পে। পথে পথে মুরুব্বিদের হাজারো উপহাস, টিপ্পনী গায়ে মাখার সময় নেই হিরোদের। প্লাস্টিকের ঘড়ি-চশমা যাদের ভাগ্যে জোটেনা তারা-নারকেল পাতার ঘড়ি-চশমা-ই তাদের ভরসা। এগুলো নিপুণভাবে বানাতেও একজন দক্ষ মুরুব্বি লাগে।
মেয়েদের সাজসজ্জা শেষ হবার নয়। গায়ে রঙিন পোশাক, চুলে লাল-নীল ফিতা, কানে-গলায় ফেরিওয়ালার গহনা, ঠোঁটে টক্টকে লাল লিপ্স্টিক, পায়ে কমদামী উঁচু হীল -আরও কতো কী! সেই যুগে পোশাকের সাথে ম্যাচিং করে সাজসজ্জা ছিল একেবারেই অবান্তর। কিছুদূর হাঁটতেই হীলের ফিতা ছিঁড়ে যাওয়া নতুবা পায়ে ফোস্কা পড়ার বিড়ম্বনা পিছু ছাড়তো না। বাধ্য হয়ে তাই অনেককে হীল হাতে নিয়েই হাঁটতে হতো। নতুন অভিজ্ঞতা বলে কথা। তখন সবাই হতদরিদ্র। দেশ স্বাধীন হয়েছে মাত্র। নতুন কাপড় কিনতে পারেনি অনেকেই। মায়ের আঁচল ধরে শিশুরা কাঁদছে অঝোর ধারায়। তাদের কান্নার শব্দ ঘরের বেড়া ভেদ করে উঠোনে, গাছপালায় ধ্বনিপ্রতিধ্বনিত হতে হতে শুন্যে মিলিয়ে যায়। কাঁদতে কাঁদতে নিস্তেজ হয়ে একসময় গা মাটির সাথে এলিয়ে দেয়। বাংলা সাবান দিয়ে ধুয়ে বালিশের নিচে রাখা পুরোনো কাপড়টিই এখন ভরসা। অনিচ্ছা স্বত্বেও সেই পুরোনো কাপড় পরে, বাবার হাতের আঙুল ধরে, ভাঙ্গা বুকটা টেনে টেনে নিয়ে চলে ঈদগাহের দিকে। চোখের পানিতে তরতাজা দাগ বসে আছে গালের দুপাশে; বন্ধুরা দেখবে বলে আল্তো করে মুছে নেয়। মা-বাবার নতুন কাপড়? আহা! সেই প্রশ্ন আপাতত থাক।
মসজিদের ভেতর, বাহির ও ছাদে থৈ থৈ করছে মানুষ। নতুন কাপড়ের মৌ মৌ গন্ধে ভরে উঠেছে চারদিক। আমরা শিশু, মসজিদে প্রবেশ করি না। পোক্তা মসজিদের দুইদিকে বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে মারবেল খেলায় মেতে উঠি। তবে নতুন কাপরের প্রতি তী² নজরদারি সবার,পাছে ধুলো লেগে ঈদটাই যেন মাটি না হয়ে যায়। একসময় মসজিদের বাইরে চাপা শোরগোল উঠে- ‘মুনাজাত হচ্ছে’, ‘মুনাজাত হচ্ছে’। সঙ্গে সঙ্গে যবনিকাপাত ঘটে মারবেল খেলার। একটা নিস্তব্ধতা নেমে আসে সর্বত্র। মোনাজাতে অংশ নেয় সবাই। মসজিদের ভেতর থেকে মুসল্লিদের হু হু কান্নার শব্দ ভেসে আসে। মুনাজাত শেষ হলে একটা হুল্লোড় পড়ে যায়। একসময় মুরুব্বিরা মসজিদ থেকে বের হন। আমাদের দায়িত্ব লাইন ধরে দাঁড়িয়ে তাঁদের পায়ে ধরে সালাম করা। দায়িত্ব এখানেই শেষ নয়-পথেপ্রান্তরে বয়স্কদের দেখামাত্রই সালাম করা চাই। এটা ঈদের দাবী, এটাই ঈদ; এর ব্যত্যয় যেন না ঘটে।
তবে সেকালে সালাম করে বকশিস নেয়ার রেওয়াজ ছিল কম। সমাজে দু’একজন ব্যক্তি শিশুদের বকশিস দিতে পারতেন। তাঁরা সাহেব শ্রেণির, শহরে থাকেন, আর্থিক অবস্থাও বেশ। এঁদের সবাই চেনে। সংগতকারণেই ইদের দিন ওঁদের বাড়িতে শিশুদের যাওয়া-আসা চোখে পড়ার মতো। বকশিস সর্বোচ্চ এক টাকা। একটি এক টাকার নোট হাতে পেয়ে শিশুরা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পায়। বুক টান টান করে নতুন নোটের ঘ্রাণ নিতে নিতে আকাশের দিকে মুখ করে একটা আত্মতৃপ্তির হাসি দেয় তারা। ঈদের দিন একঘরের মানুষ অন্য ঘরে বেড়াতে যাওয়া সামাজিক দায়িত্বের অংশ ছিল। প্রায় ঘরে রান্না হতো বাংলা সেমাই। চাটাই-পাটি দিয়ে বসতে দেওয়া হতো অভ্যাগতদের। চেয়ার-টেবিলের প্রচলন ছিল না। সোফার প্রশ্ন তো অবান্তরই। শিশুরা ভিতরে গিয়ে মহিলাদের সালাম করে আসতো। অভ্যাগত পুরুষেরা মুরুব্বিশ্রেণির হলে মহিলারা লম্বা ঘোমটা টেনে বারান্দায় গিয়ে তাদের সালাম করে আসতো।
দু’একটি ঘরে অবশ্য রঙ্গিন লাচ্ছি সেমাই-এর আয়োজন থাকতো। তবে তা উঁচু পরিবারে, তাঁরা শহরের বাসিন্দা, ঈদেই বাড়ি আসেন। তাঁদের সন্তানদের ঈদ পোশাকও বেশ দামী। ঈদের দিন তারা দামী পোশাক পরে গম্ভীর লয়ে চলে। অন্যরা অবাকদৃষ্টিতে তাদের পোশাকের সৌন্দর্য দেখে ‘দু’নয়ন সার্থক করার প্রয়াস পাই। সুর্যাস্ত পর্যন্ত ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট সববয়সী মানুষের আনাগোনায় সরগরম থাকে। সন্ধ্যা নামলে একটা বিদায়ের বেদনা সবাইকে গ্রাস করে ফেলে। তখন সত্তুরের দশক। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, গাড়িঘোড়ার অপ্রতুলতায় এখনকার মতো সাঁই সাঁই করে দূরদূরান্তে বেড়াতে যাওয়া দুষ্কর ছিল। গ্রামে বিদ্যুৎ নাই, টিভি নাই, বড়ো জংশনও নাই। তবে হ্যেঁ, এতো না থাকার পরও মানুষের মধ্যে চক্ষুলজ্জা, ন্যায়-অন্যায়ের বিচারশক্তি, পারষ্পরিক শ্রদ্ধা ও মূল্যবোধের মতো বড়ো বড়ো পাহাড় সমান সম্পদ ছিল।
লেখক: প্রাবন্ধিক