শূন্যকুম্ভ

12

মোহাম্মদ হোসেন

ছোট ফ্ল্যাটের ছোট্ট ড্রইংরুম। আগাপাশতলা কালোরঙ্গা একটা স্টীলের তৈরী চেয়ারে চুপচাপ বসে আছি আমি একা, নিঃসঙ্গ। একমাত্র জানালার সাথে একদম লাগোয়া। এই শহরে বাবু আছে বাবুই নেই। তাই বাতায়ন পাশে মোর গুবাক তরুর সারিও নেই। ফলে ঝিরিঝিরি দখিনা হাওয়া ধাওয়া করতে পারছে আমাকে দূর পাহাড়ের দেশ থেকে ভেসে ভেসে উড়ে এসে। আর কিছুদিন পর এই প্রীতিকর কাজটার দুঃখজনক অপমৃত্যু ঘটবে। ঠিক পাশেই তরতর করে বড় হয়ে উঠছে সদ্য গজিয়ে উঠা আরেকটা বিল্ডিং। লোডশেডিং হলে ভ্যাপসা গরমে তখন হাঁসফাঁস করতে হবে, প্রাণ ওষ্ঠাগত হবে। চেয়ারে আরাম করে হেলান দিয়ে কমপিউটার টেবিলের উপর বাম হাত বিছিয়ে দিয়েছি আর ভেবে মরছি, বিদ্যুৎ উন্নয়ন (!) বোর্ডের কাজটা কী। খুবই বিরক্ত বোধ করছি আমি। রাত সাড়ে বারোটায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়া এই গরমে, কোন সভ্য দেশে ভাবাই যায় না। এটা যে শুধুমাত্র আজকের অঘটন তা কিন্তু নয়। প্রায় রোজকার ঘটনা। গরমের চরম শুরু হওয়ার পর থেকেই এই পরম অনাকাংখিত অবস্থা। এই অরাজক পরিস্থিতি চলতে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা গভীর সাগরে বেওয়ারিশ সাম্পানের মত। মনে হয় যেন কেউ দেখার নেই, দেখার কিছু নেই। এটাই স্বাভাবিক। মানতে না পারাটাই বেশম বেয়াদবি। কমপিউটার অন করে বসেছি পাঁচ মিনিটও হয়নি, পরাণপাখি ফুরুৎ। তখন হঠাৎ অনুভব করি তীব্র বেগে পানি ছাড়ার বেগ। সুইচ অফ করে ডানে দাঁড়িয়ে থাকা ওয়াশরুমে নিজেকে কোনরকমে গলিয়ে আরামের কর্মযজ্ঞ সেরে আসি। কর্ম সম্পাদন একটু দ্রæতই করতে হল, কারণ নিষ্ঠার সাথে কাজ শুরু করেছি মাত্র ইথারে কম্পন তোলে সেলফোনের রিংটোন। হাতে নিয়ে দেখি, আজব একটা নম্বর ভাসছে স্ক্রীণে, এইট জিরো এইট জিরো এইট জিরো। কেটে দিয়ে মোবাইল স্বস্থানে রাখতে গিয়ে মনে পড়ল দরজার হুক লাগানো হয়নি। ওয়াশরুমের পাশেই তো। দুই কদম এগিয়ে কাজটা সেরে এসে বসেছি চেয়ারে। ঘুম পেয়েছে খুব। তাই আলো জ¦ালাতে ইচ্ছে করছে না। তবে নিস্প্রভ জোসনা জানালার ফাঁক গলে এসে আমার কাঁধ ডিঙ্গিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে মেঝেতে। তাতে করে ঘরের ভিতরের আঁধারের গাঢ়তা একটু কমে এসেছে বৈকি। সদর দরজার পাশে আমার অসামান্য কীর্তির সাক্ষ্য বহন করে চলেছে একটা জুতোর বাক্স, কাঠের তৈরী। চোখ চলে যায় ওটার উপর থরে থরে সাজানো গাঁটের পয়সা গুচ্ছের টাকা খরচ করে প্রকাশিত আমার প্রথম বইয়ের শ’দুইয়েক কপির দিকে। বুকখানা গর্বে উথলে উঠে আপন কীর্তির কথা ভাবলে। সিক্ত হয়ে উঠে চোখের কোণ শিশিরভেজা ঘাসের মত। বাজারে কাটতি মোটেই আশানুরুপ নয়, কিন্তু এখানে বেশ ভাল বৈকি। তাছাড়া বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, পরিচিতজন ও বোদ্ধামহলকে মুফতে দিয়ে দিয়ে বেচারা বাক্সটার বোঝা অনেক হালকা করতে পেরেছি। নিজেও হালকা হয়েছি। ছিল পাঁচশ কপি, এখন দুশ। এ কথা ভেবে আমোদে ভরে উঠে মন। আপন কারিশমাতে আপনিই মুগ্ধ আমি। তবে যা ভেবেছিলাম তা হয়নি। মনে বড় আশা ছিল এবং স্থির বিশ^াস ছিল, প্রথম বই দিয়েই মাত করব আমি জোরেশোরে। একটা সমীহ জাগানিয়া স্থায়ী আসন গড়ে নেব বাংলা সাহিত্যে। বোদ্ধারা নড়েচড়ে বসবেন, গল্পরসিকগণ ভিন্ন রসের আস্বাদন পেয়ে প্রীত হবেন। অজান্তেই বের হবে তাঁদের মুখ দিয়ে, বাংলা গল্পাকাশে ধুমকেতু নয়, আবির্ভাব ঘটেছে এক নতুন ধ্রুবতারার। ব্যাপকহারে চলতে থাকবে আমার কীর্তির কীর্তন ও সংগীতময় বর্ণন। নাম, খ্যাতি ও যশ ছড়িয়ে পড়বে আকাশে বাতাসে চারদিকে। উপচে পড়বে আমার মেইল বক্স, এসএমএস বক্স। হাঁপিয়ে উঠব, কানে জ¦ালা ধরবে তারিফপূর্ণ কল রিসিভ করতে করতে। অনেক যদি মাছ পায়, বিড়ালে কাঁটা বেছে খায়। আমিও তখন তাই করব। এসব দেখে দেখে অন্যরা মাতম করবে ঈর্ষায়, হিংসায় কারো বুক চিরে বা বের হবে উত্তপ্ত লাভা। হায়, আমার ভাবনার গোলা পূর্ণ হল অপূর্ণতায়। কোনই পাঠ প্রতিক্রিয়া নেই এরকম কিংবা ওরকম, মন্দ কিংবা ভাল। বোদ্ধামহল কর্তৃক আমার কীর্তি ও প্রতিভার কোন মূল্যায়নই হয়নি, হচ্ছে না। ওরা বুঝতে পারে না যে, হাড্ডি কখনও গোস্ত নয়, কুট্টি কখনও দোস্ত নয়। যাদের ওরা গল্প বলে বলে সময় নষ্ট করে, কলমের কালি খরচ করে, পাঠকের সময় নাশ করে ওগুলো, সত্যি বলতে কী, কোন গল্পই না। গল্পের আড়ালে বড়জোর অল্প স্বল্প কাহিনী। সাহিত্যের গল্প নয়। সাপের হাঁচি বেদেয় চেনে, চেনারই কথা। তারপরও যদি বেদে না চেনার ভাণ করে সাপ সাপই থাকবে, অন্য কিছু হয়ে যাবে না। সর্পের দর্প খর্ব হবে না। তবে সান্ত¡না পাই এই ভেবে যে, কিছু কিছু বড় লেখকও তাঁদের জীবিতকালে সুবিচার পাননি। আমার বেলায়ও হয়ত তাই হবে। মরণের পর সবাই স্মরণ করবে আমাকে। তুমুল আলোচনা সমালোচনা সূক্ষালোচনা হবে আমার কৃতি নিয়ে। চাই কী মরণোত্তর কোন রাষ্ট্রীয় পদকও পেয়ে যেতে পারি বরাতের করাত যদি না আমার উপর খড়গহস্ত হয়। যদি তাই হয়, আমার ছেলে মেয়েকে বলে যাব, তা যেন ক্যুরিয়ারে প্রাপকের ঠিকানায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। বাসায় যদি রেখে দেয় তা পড়ে থাকবে নিস্প্রভ। শোভা বাড়াবে না, প্রভাও ছড়াবে না। এখন আপাতত আমি ভেসে চলেছি বেহুলা লখিন্দরের ভেলায় হতাশার নি¤œচাপে ঘন্টায় একশো পঁচিশ মাইল বেগে তাড়িত হয়ে। বেহুলা লখিন্দরের কাহিনী সম্বলিত বইটা আছে আমার ¯িøম এন্ড স্মার্ট বুকসেল্ফে। সেল্ফ স্মার্ট হলে কী হবে, কালেকশান বড় আনস্মার্ট। হাতেগোণা অল্প কিছু বইয়ের সমাহার। একটা তাক পেপার পত্রিকা দিয়ে ঠাসা। অন্য তাকে রাখা আছে হরেক রকমের বিনোদন ম্যাগাজিন যেগুলো আমার স্ত্রীর মনের খোরাক যোগাতে পালন করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বই বেশি কেনা হয় না, কারণ পড়া হয় না। বই পড়ে সময় নষ্ট না করে আমি বরং গল্পের প্লট খুঁজি, গল্প নিয়ে ভাবি, কলাকুশলীদের কার্যকারণ নির্ধারণ করি, কাহিনীর গতি-প্রকৃতি নিয়ে রীতিমত অধ্যয়ন করি। অনেকটুকু সময় বিনিয়োগ করি একটা গল্পের পেছনে। ভাল গল্প প্রসব করতে হলে তাই তো করতে হবে, তাই না?
‘তুমি বই বেশি পড়ো না। কিন্তু ‘‘বেহুলা লখিন্দর’’ পড়েছ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে, তাই না?’
‘হ্যাঁ।’
‘কারণ তুমি লখিন্দর আমি বেহুলা।’
‘এই অসময়ে তুমি কোত্থেকে বেহুলা?’
‘কেন, তোমার মনের গভীর তলদেশ থেকে যেখানে শুধুই শূন্যতা! ওখানেই তো আমার বাস, গড়েছি নিবাস। আমাকে দিয়েই যে তোমার পূর্ণতা।’
‘না না , তা কেমন করে হয়! আমার জীবনে তুমি তো কখনও ছিলেই না!’
‘এমন করে বলছ কেন বল তো! তুমি যে আমাকেই চাও বেশি বেশি অহর্নিশি। তোমার অন্তরজুড়ে ছিলাম এবং আছি। তোমার মন ও মননের যে রসায়ন তাতে প্রভাব আমারই অধিক, অস্বীকার করতে পারবে তুমি?’
‘মিথ্যে কথা, আমি সবচেয়ে বেশি ভালবাসি আমার স্ত্রীকে।’
‘কেন, নগদ নারায়ণ অত্যধিক পেয়েছ বলে?’
‘বেহুলা তুমি যাও। আমাকে একটু একা থাকতে দাও।’
‘কোথায় যাব বল। তব বক্ষপিঞ্জরেই যে আমি কয়েদ। আমি বন্দী কারাগারে।’
‘আমার চোখের সামনে থেকে সশরীরে বিদেয় হও।’
‘কী সমস্যা, আমার তো কোন শরীরই নেই!’
‘তবে এই যে দেখতে পাচ্ছি তোমাকে!’
‘আমি যে পরম কাংখিত তোমার। তাই আমার একটা অবয়ব নিজের মত করে গড়ে নিয়েছ তোমার কল্পলোকে। সেটাই দেখতে পাচ্ছ তুমি। চোখ খোল, দেখবে আমি নেই। যেমন নেই তোমার লেখার মান, মিছে স্ত্রীর প্রতি ভালবাসা, মায়ার মায়া চঞ্চলার কায়া।’