শুষ্ক মৌসুমে বাড়ছে পরিবেশ ও বায়ুদূষণ প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ জরুরি

16

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী চট্টগ্রাম। তারপর এটি সমুদ্র বন্দরনগরী। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প কারখানা, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও জনসংখ্যা বিবেচনায় রাজধানী ঢাকার পরেই চট্টগ্রামের অবস্থান। বন্দরনগরী হেতু শিল্পবিপ্লবের পর দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রথম এ চট্টগ্রামেই শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে। এর ধারাবাহিকতায় শিল্প ও বাণিজ্যিক বিকাশ অব্যাহত রয়েছে। বর্তমান সরকারের ধারাবাহিক উন্নয়নের বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে বৃহত্তর চট্টগ্রাম। নগরীর আশেপাশে শিল্প কারখানাগুলো বাদ দিলেও সীতাকুন্ড, মিরসরাই, আনোয়ারা, বাঁশখালীতে শিল্পজোন নির্মাণ হচ্ছে। মিরসরাই বঙ্গবন্ধু শিল্পজোনে শুধু ৩০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুখবর দিয়েছে সরকার। এসব সুখবরের সাথে দুঃসংবাদ হলো, শিল্প কারখানা বৃদ্ধির সাথে বাড়ছে পরিবেশ দূষণ, বায়ু দূষণ। নাসিরাবাদ শিল্পাঞ্চল, সীতাকুন্ড শিল্পাঞ্চল, বায়জিদ তথা কালুরঘাট শিল্পাঞ্চল, পতেঙ্গা সিইপিজেড, সিমেন্ট ক্লিংকার, ইস্টার্ণ রিফাইনারী, কর্ণফুলী ইপিজেড, আনোয়ারা সিউফল, কুরিয়ান ইপিজেড ইত্যাদি শিল্প-কারখানা থেকে প্রচুর কালো ধোঁয়া বের হয়ে চট্টগ্রামের আকাশে মিশে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি সড়ক ও আবাসন অবকাঠামো নির্মাণ. গ্যাস, ওয়াসা এবং সড়ক বিভাগের খোঁড়াখুঁড়িও ও সংস্কারের ফলে বালি ও ইট-সিমেন্টের গুঁড়ো বাতাসে উড়া, পাল্লা দিয়ে মিশছে আকাশে-বাতাসে যানবাহনের ধোঁয়াও । সবচেয়ে মারাত্মক রাস্তার ধূলিকণা উড়ে বায়ুমন্ডলে দূষণের সৃষ্টি করার বিষয়টি। ধূলিকণা ও বিষাক্ত কালো ধোঁয়ার কারণে বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো অবস্থা নেই। ফিটনেসবিহীন অসংখ্য গাড়ির কালো ধোঁয়া চট্টগ্রাম নগরীর বাতাসকে প্রতিনিয়ত অসুস্থ করে তুলছে। এসব বিষয় নিয়ে দৈনিক পূর্বদেশসহ স্থানীয় সহযোগী ও জাতীয় গণমাধ্যমগুলো প্রতিবেদন ও সম্পাদকীয় প্রকাশ করে আসছে। প্রতিবেদন প্রকাশের পর পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রশাসন কয়েকদিন নড়েচড়ে বসলেও পরক্ষণে যে লাউ সেই কদুই- থেকে যায়। নাসিরাবাদ শিল্পাঞ্চলের দিকে সন্ধ্যা আকাশে খালি চোখে থাকালে বুঝা যাবে, আমাদের পরিবেশ ও বায়ূ দূষণের প্রকৃত অবস্থা। তদুপরি পিসি রোড, অলংকার, পাহাড়তলী, বিমানবন্দর সড়ক অথবা ফিরিঙ্গীবাজার হয়ে শাহ আমানত সেতু রিংরোড দিয়ে চলাচলের সময় বুঝা যাবে ধুলিকণায় আপনার শ্বাসপ্রশ্বাস কিভাবে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। নাসিরাবাদ শিল্পাঞ্চলের চারদিকে রয়েছে বেশ কয়েকটি অভিজাত আবাসিক এলাকা। শেষভাগে রয়েছে চট্টগ্রাম সেনানিবাস। অথচ এখানে কল-কারখানার কালো ধোঁয়ায় সকাল-সন্ধ্যার আকাশ ধোঁয়াচ্ছন্ন থাকতে দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে এসব আবাসিক এলাকাসহ মহানগরীর জনস্বাস্থ্য ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, শিল্প-কারখানা থেকে শুরু করে তাবৎ অর্থনৈতিক কর্মকাÐ জনগণের কল্যাণের উদ্দেশ্যে তৈরি। মানুষের কর্মসংস্থান, মাথাপিছু আয় এবং দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির লক্ষেই সরকার ও উদ্যোক্তারা সবধরনের কর্মকান্ড পরিচালনা করছে। তবে এসব কর্মকান্ড জনবান্ধব ও পরিবেশবান্ধব করার জন্য রাষ্ট্র আইন ও বিধিবিধানও প্রণয়ন করেছে। এরজন্য পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ অধিদপ্তরও সক্রিয় রয়েছে। কিন্তু এরপরও ইচ্ছেমত পরিবেশ দূষণের প্রতিযোগিতা কেন থামছেনা-তা বুঝে উঠা দায়। যানবাহন, কলকারখানার মালিকরা পরিবেশ আইন প্রতিনিয়ত লঙ্ঘন করে তাদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ও ব্যবসা চালিয়ে যাবে আর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্লিপ্তভাবে দেখে থাকবে তা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। অর্থনৈতিক, সমৃদ্ধি, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, মানুষের আয়বৃদ্ধি, দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি সাধনের গুরুত্ব যেমন রয়েছে তেমনি জনস্বাস্থ্য ঠিক রাখার গুরুত্ব তার চেয়ে কোন অংশে কম নয়। সুস্থ জাতিই অর্থনৈতিক মুক্তি ত্বরান্বিত করতে পারে। তাই চট্টগ্রামসহ দেশের মানুষের স্বাস্থ্যরক্ষার স্বার্থে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের আইন যথাযথ মেনে চলার উপর গুরুত্ব আরোপ করা জরুরি। আর যারা সচেতনভাবে পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে দেশের বাতাসকে দূষণযুক্ত করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। আমরা মনে করি, বর্তমান করোনার মত মহামারি মোকাবেলায় আমাদের পরিবেশ সুরক্ষা একান্ত জরুরি। বায়ু ও পরিবেশ দূষণ মানুষের ফুসফুসে ক্ষত সৃষ্টি করে, কাশি, সর্দি ও শ্বাসকষ্টের মত জঘন্য রোগব্যাধির জন্ম দেয়। যা করোনা ভাইরাসের প্রধান লক্ষণ। সুতরাং মানুষকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ ও বায়ূদূষণকারীদের বিরুদ্ধেও আইনী ব্যবস্থা জোরদার করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ-এমন প্রত্যাশা আমাদের।