শিক্ষা পুনর্মিলনী : জ্ঞানে প্রাণিত হয় শিক্ষার্থী

10

পুনর্মিলনী মানে পুরোনো সম্পর্ক নতুন করে সাজিয়ে নেয়া, আনন্দের ষোল আনা দেয়া-নেয়া। রবি ঠাকুরের ভাষায় – আনন্দকে ভাগ করলে দু’টো জিনিস পাওয়া যায়- একটি হচ্ছে জ্ঞান, অপরটি হচ্ছে প্রেম। এ প্রেম ও জ্ঞান আস্বাদনের জন্যই এ বছরের জানুয়ারিতে ফরিদ ভাই (ফরিদ সিকদার) প্রস্তাব করেনÑ ছোট্ট পরিসরে শেরে বাংলা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন কয়েকজন মিলে চট্টগ্রামে আনন্দযাত্রা করি। ৮৮ ব্যাচের লে. কর্ণেল ইয়াসীনের ফিরতি প্রস্তাবÑ এটিকে কয়েকজনের পরিবর্তে কয়েক’শতে করা যায় কি! একেএকে সায় দিলেন ৮২ ব্যাচের প্রফেসর রনজিত, ৮৩ ব্যাচের জাফর সিকদার, ৮৬ ব্যাচের ব্রি, জে, মং, তসলিম চৌধুরী কাজল, এ, কে, আজাদ ও ৮৭ ব্যাচের ডিসিটি শামসুল আলম। এবং শেষে তাই হল। চলতে থাকে ফোন আর ওয়াটসএপে সিরিজ অফ মিটিং। গঠিত হল ‘টীম মিট দ্যা ফ্রেন্ডস’। ফেইসবুকে গ্রæপ করা হল। গ্রæপে নিয়মিতভাবে আসতে থাকল মজার সব স্মৃতিকথা ও অনুষ্ঠান সম্পর্কিত নানা ইভেন্ট ও চমক!
নির্ধারণ হল ৩ এপ্রিল চিটাগং ক্লাবে আমাদের প্রিয় বিদ্যাপীঠ সাতকানিয়ার শেরে বাংলা উচ্চ বিদ্যালয় এর প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান হবে। স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীরা দেশ-বিদেশে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করেন। তাই রেজিস্ট্রেশন এর সুবিধার্থে গুগল ফর্ম তৈরী করা হল। অনলাইন রেজিস্ট্রেশন এ ব্যাপক সাড়া পড়ে গেল। চিটাগং ক্লাবের মিলনায়তন, নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি বিবেচনায় ২৫০ জন এলামনাই এর রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হওয়ার পর অনলাইন রেজিস্ট্রেশন বন্ধ করা হল। হঠাৎ করে বন্ধ হওয়ায় অনেক আগ্রহী এলামনাই রুষ্টও হলেন।
জোর প্রস্তুতি শুরু হলো আয়োজনের। সময় ব্যবস্থাপনা ও অনুষ্ঠানে ভিন্নতা আনতে সব স্মৃতিচারণ ভিডিও ধারণ শুরু হয়। শেরে বাংলা উচ্চ বিদ্যালয় ও এর পরিবেশ-প্রতিবেশের উপর আবু জাফর সিকদার লিখেন অসাধারণ এক স্মৃতি আলেখ্য- দেখা হবে প্রাণের টানে, যাতে কণ্ঠ প্রয়োগ করেন বাচিক শিল্পী ফারুক তাহের ও শামীমা ইয়াছমিন।
হঠাৎ অমানিশার অন্ধকার। দেশজুড়ে শুরু হল করোনা লকডাউন। এফবি গ্রæপে ঘোষণার মাধ্যমে সাময়ীক স্থগিত করা হল পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান। সংশ্লিষ্টরা প্রায় প্রত্যেকে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানালেন গ্রæপে। আমরা হতাশ হইনি। পুনরায় নির্ধারণ হল অনুষ্ঠানের তারিখ, ২৬ জুন ২০২১। নাহ্! এবারও হলো না। কোভিড ১৯ এর দাপট তখনও তুঙ্গে। দু দু’বার পেছানোর পর, উৎকন্ঠা কাজ করছিল আমাদের। অনুষ্ঠান হবে তো! সাহস সঞ্চয় করে অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য তৃতীয়বারের মতো চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে থাকি।
এদিকে প্রাক্তন শিক্ষার্থী তথা পুনর্মিলনী আয়োজনের অন্যতম উদ্যোক্তা ব্রি. জেনারেল মং কেনিয়ায় চলে গেলেন, আর লে. ক. ইয়াসিন গেলেন সুন্দরবনে সীমান্ত পাহাড়ায়। তাদেরকে ছাড়াই অনুষ্ঠানের নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হল ১৬ অক্টোবর, স্থান নির্ধারণ অপরিবর্তিত অর্থাৎ চিটাগং ক্লাবেই। সমস্ত উৎকণ্ঠা ও দুশ্চিন্তার অবসান হল। ১৫ অক্টোবর, বরেণ্য সংগীতশিল্পী নকিব খান, ফরিদ সিকদার, প্রফেসর রনজিত, তসলিম চৌধুরী কাজল, আবু জাফর সিকদার, আজাদ কালাম ও এ. কে.এম. শামসুল আলম রেডিসন বøু (চট্টগ্রাম) পৌঁছে যান।
১৬ অক্টোবর সকাল ৯.৩০ টায় চট্টগ্রাম হাজির হলেন ‘টিম মিট দ্যা ফ্রেন্ডস’ এর সদস্যরা। সকাল ৯ টা থেকে দূরদূরান্ত থেকে রেজিস্ট্রারড এলামনাইরা চিটাগং ক্লাবে আসতে থাকেন। চিটাগং ক্লাবের অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণ সুদৃশ্য বেলুন গেইট, রকমারী ফেস্টুন ও ব্যানারে সুসজ্জিত। প্রাক্তন শিক্ষার্থী সিরাজ, জুয়েল, সানি, আজিজ, কাশেম, সাকিব, তাহিয়া, তারিন, রাকিবরা অভ্যর্থনা ডেস্কএ আগতদের ব্যাজ পরিয়ে রেজিস্ট্রেশন কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ব্যবস্থা করা হয় সকালের স্ন্যাকস কেক, সমুসা ও চা। ১৯৭২ সাল থেকে শুরু করে ২০২০ সালের প্রাক্তনীদের পাদচারণায় মুখরিত হয় চিটাগং ক্লাবের প্রাঙ্গণ।
ঘড়িতে বেলা ১১.০৫। ৫ মিনিট দেরিতে অনুষ্ঠান শুরুর ঘোষণা আসে টিমের সদস্য তসলিম চৌধুরী কাজল এর কণ্ঠ থেকে। তিনি গুরত্বের সাথে উল্লেখ করেন- ঐতিহ্যবাহী চিটাগং ক্লাবের নিরাপত্তা প্রটোকল, কোভিড ১৯ সংক্রান্ত স্বাস্থ্যবিধি ও সময় ব্যবস্থাপনার বিষয়টি। মঞ্চে বিশাল এলইডি ডিসপ্লেতে প্রদর্শিত হল জাতীয় পতাকা। এরপরপরই সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত হল জাতীয় সংগীত। ঠিক যেন মনে হল চিটাগং ক্লাবের মিলনায়তনে চলছে স্কুলের সেই এ্যাসেম্বলি।
ফরিদ সিকদার এলেন অনুষ্ঠানের ইতিবৃত্ত নিয়ে। সাথে রাখলেন- অনুষ্ঠান সম্পর্কিত চমৎকার প্রেজেন্টেশন। প্রাণভরে তা উপভোগ করলেন উপস্থিত এলামনাই ও দেশ-বিদেশের প্রিয় এলামনাইরা, যাঁরা ফেইজবুক লাইভে উপভোগ করছিলেন পুরো অনুষ্ঠান। শুরু হল অনুষ্ঠানের নিউক্লিয়াস আবু জাফর সিকদার রচিত স্মৃতি আলেখ্য ‘দেখা হবে প্রাণের টানে’। বাচিকশিল্পী ফারুক তাহের ও শামীমা ইয়াছমিন এর সম্মোহনী কণ্ঠ এবং প্রাসঙ্গিক ভিডিও চিত্র- সব মিলিয়ে একটি মায়াময় পরিবেশ সৃষ্টি হলো চিটাগং ক্লাবের পুরো মিলনায়তন জুড়ে। শেরে বাংলা হাই স্কুল ও এর প্রতিবেশ যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে চিটাগং ক্লাবের মিলনায়তনে।
আলেখ্যটি নির্মাণ সহযোগিতার জন্য ফরিদ সিকদার, তসলিম চৌধুরী কাজল, সাংবাদিক আলিউর রহমান ও আলাউদ্দিন সিকদার হিরোকে এ পর্যায়ে ধন্যবাদ দেয়া যেতে পারে। সঞ্চালক তসলিম চৌধুরী কাজল হঠাৎ করে বলে ওঠেন- আজ যাঁদের জন্মদিন, তাঁদেরকে শুভ জন্মদিন। আর যাদের আজ বিবাহবার্ষিকী, তাঁদেরকে ‘ঠবৎু যধঢ়ঢ়ু ধহহরাবৎংধৎু ’। ৮৬ ব্যাচের শামিম সবাইকে অবাক করে বিশাল আকৃতির এক কেক নিয়ে হাজির! পূর্ব প্রস্তুতিও ছিল বৈকি! জম্পেস আয়োজনে চিটাগং ক্লাবের বিশাল মিলনায়তনে উদযাপন করা হল শামিমা’র বিবাহ বার্ষিকী ও ৮৮ ব্যাচের রওশনের শুভ জন্মদিন।
এদিকে শুরু হল- স্কুল গভর্নিং বডি’র প্রথম সভাপতি সদ্যপ্রয়াত মনির আহমেদ চৌধুরী মহোদয় (গত মার্চে ধারণকৃত ভিডিও) ও স্কুল এলামনাইদের ভিডিও ধারণকৃত স্মৃতি জাগানিয়া কথামালা। তাঁদের অনবদ্য কথামালায় পুরো পরিবেশ একদিকে যেমন ভারী হয়ে আসছিল আবার মজার খোরাকও ছিল বেশ- যেন হাসিতে লুটোপুটি! স্মৃতিকথায় অংশ নেন- ৭২ ব্যাচের তাজমহল বেগম ও শওকত আলী সিকদার, ৭৫ ব্যাচের নাসির উদ্দিন চৌধুরী, ৭৭ ব্যাচের নুর মোহাম্মদ হাওলাদার ও শিরিন আকতার, ৭৮ ব্যাচের পীযুষ সাহা, ৮০ ব্যাচের ফাহমিদা নিলি ও আখতার হোসেন, ৮২ ব্যাচের প্রফেসর রনজিত কুমার দত্ত, ৮৩ ব্যাচের আবু জাফর সিকদার, ৮৬ ব্যাচের ব্রি. জে. মং, শওকত আলী ও এ. কে. আজাদ, ৮৭ ব্যাচের এ. কে. এম. শামসুল আলম, ডিসিটি, ৮৮ ব্যাচের লে. কর্ণেল ইয়াসীন চৌধুরী বকুল, ২০০১ ব্যাচের জনি এবং ২০০৭ ব্যাচের নাজনীন ফাহমিদা। ৭২ ব্যাচের নবাব মিয়া সিকদার ছিলেন অনুষ্ঠান আয়োজনের আদ্যোপান্ত। তাঁর স্মৃতিচারণসহ আরো স্মৃতিকথা যুক্ত হতে পারত- সময়ের সীমাবদ্ধতায় তা পারা গেলনা।
পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে নজর কেড়েছে ৯৪ ব্যাচ। তারা সবাই এসেছিলেন খয়েরি রঙের গেঞ্জি (পোলো শার্ট) পড়ে। পুরো অনুষ্ঠান জুড়ে দেখা গেল তাদের আনন্দ আয়োজন। ৮৬ ব্যাচও কম যায়নি। অনুষ্ঠানে সর্বোচ্চ সংখ্যক উপস্থিতি ছিল ৮৬ ও ৯৪ ব্যাচের। আগত প্রত্যেকের জন্য সুদৃশ্য গিফট স্পন্সর করেছে গø্যাক্সো স্মিথক্লাইন বাংলাদেশ লি.। প্রথম পর্বের সর্বশেষ আয়োজন ছিল আকর্ষণীয় র‌্যাফেল ড্র। পরিচালনা করেন ৮৬ ব্যাচের এ. কে. আজাদ লিটন। সাথে ছিলেন শেরে বাংলা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সজল কান্তি দাশ, ৭২ ব্যাচের নবাব সিকদার, আবু তাহের, ৮১ ব্যাচের রফিকুল ইসলাম, ৮৩ ব্যাচের আখতার কামাল, ৯৬ ব্যাচের ডা. মোরশেদ আলী। প্রতিটি ড্র ‘০’ দিয়ে শুরু হলেই প্রফেসর রনজিত উঠে দাঁড়ান তাঁর ০০৭ কুপন নিয়ে। হতাশ! শেষ পর্যন্ত তাঁর পুরস্কার পাওয়া হল না। প্রমাণ হল- কুপন নম্বর লাকি সেভেন হলেই ভাগ্য ধরা দেয় না! প্রথম পুরস্কার জিতে নেন শেরে বাংলা উচ্চ বিদ্যালয় হতে ৭৭ সালে স্ট্যান্ড করা কৃতিজন নুর মোহাম্মদ হাওলাদার।
এদিকে টীম মিট দ্যা ফ্রেন্ডস এর শামসুল আলম ও আবু জাফর সিকদার ব্যস্ত মধ্যাহ্ন ভোজ ব্যবস্থাপনায়। তাঁরাই দেখভাল করেছেন আতিথেয়তা ও আপ্যায়নের বিষয়টি। ঠিক ২ টায় শুরু হয় মনোজ্ঞ সংগীত পর্ব। এলামনাইদের পক্ষ থেকে সঙ্গীত পরিবেশন করেন ৮৬ ব্যাচের রঞ্জন দাশগুপ্ত ও তসলিম চৌধুরী কাজল। অতিথি শিল্পী সুকন্ঠী রাজশ্রী আসেন তাঁর গানের ডালি নিয়ে। একে একে ছয়টি গান পরিবেশন করেন তিনি। তাঁর শেষ পরিবেশনা-দমা দম মাস্তকেলেন্দার.. যেন পুরো হলজুড়ে নাচের টর্নেডো বইয়ে দিল! ‘বাইক্কা টেঁয়া’ চাইতে মঞ্চে আসেন কিংবদন্তি সংগীত শিল্পী শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণব তনয় প্রেম সুন্দর বৈষ্ণব। সহশিল্পী ছিলেন নীলিমা বিশ্বাস। স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে জনপ্রিয় সব চট্টগ্রামের গান পরিবেশন করে দর্শকদের আনন্দ দেন তারা। অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ দেশের কিংবদন্তী সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব নকীব খান আসেন মঞ্চে। চট্টগ্রামের গর্ব নকীব খানকে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা দাঁড়িয়ে সম্মান জানান। অনেকের জন্যই এটি ছিল জীবনের প্রথম লাইভ নকিব খান শো। তাঁর চমৎকার সব জনপ্রিয় গান পরিবেশন করে দর্শকদের মনের ক্ষুধা মিটিয়েছেন। পুরো অনুষ্ঠান ফেইসবুক লাইভে প্রচার করে ২০০৭ ব্যাচের আহসান উল্লাহ সানি অনুষ্ঠানের ব্যাপ্তি বাড়িয়েছেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত এলামনাইবৃন্দ নিজ নিজ ব্যাচের সতীর্থদের পেয়ে যারপরনাই উচ্ছ¡সিত ছিলেন। কারো দেখা হয় দীর্ঘ ৫০ বছর পর, কারো আবার ৩০-৪০ বছর পর!! ভাবা যায়- আত্মার এ মেলবন্ধন কতটা আকাক্সিক্ষত ছিল!

তসলিম চৌধুরী কাজল

লেখক : ব্যাংকার ও সংগঠক