শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য অলোক আচার্য্য

206

শিক্ষা মানব মনের ইতিবাচক স্থায়ী পরিবর্তনের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। শিক্ষাই সেই শক্তি যা সমাজ থেকে কুসংস্কার, অজ্ঞতা, অপশক্তি ও বিশৃঙ্খলতা দূর করতে সাহায্য করে। সে কারণে প্রতিটি দেশের উন্নয়নের মূল শর্ত শিক্ষিত মানুষের হার বৃদ্ধি করা। তবে খেয়াল রাখতে হবে যে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য যেন বাস্তবায়িত হয় এবং শিক্ষার প্রায়োগিক উদ্দেশ্য নিয়ে সমালোচনা না হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর মহান শিক্ষা দিবস। শিক্ষা অবশ্যই মহান কিন্তু এর বর্তমান প্রয়োগ কতজন মহান মানুষ তৈরি করতে পারছে তা নিয়েই রয়েছে সংশয়। শিক্ষা যদি পণ্য হয় তাহলে তার প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। যা আজকের সমাজে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষাকে ব্যবসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
নামিদামি সব দালানকোঠা, দামিদামি স্কুল ড্রেস, বড় বড় ল্যাব ইত্যাদি আরো বহুবিধ সুযোগ-সুবিধা নিয়ে গড়ে ওঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন হরহামেশাই চোখে পড়ে। তো সেসব প্রতিষ্ঠানে কোন বছরে কত ভালো ফল হয়েছে তার একটা ফর্দও তুলে ধরা হয়। কিন্তু কোথাও দেখা যায় না সেসব প্রতিষ্ঠান থেকে কতজন সত্যিকারের মানুষ হয়ে বের হয়েছে তার কোনো হিসাব দিয়েছে। আসলে মানুষ হওয়ার জন্য কোনো বিজ্ঞাপন দরকার হয় না। ওই মানুষ করাটাই শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য অন্যগুলো কেবল বাহ্যিক আড়ম্বর। ভালো ফলাফলের নিশ্চয়তা অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই দেয় কিন্তু মানুষ করার নিশ্চয়তা আজকাল কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই দেয় না। তাই শিক্ষা এখন অনেক ক্ষেত্রেই পণ্য। বাজারদরে লাভ-ক্ষতি হিসাব করা হয়। কোন বিভাগে পড়ালেখা করলে কত দামি চাকরি পাওয়া যায় আর সেখানে কি পরিমাণ বেতন সেসব দিয়েই সন্তানের ভবিষ্যৎ মূল্যায়ন করা হয়। বিবেক বিসর্জন দিয়ে হাত পেতে ঘুষ নিয়ে মনুষ্যত্ব বিক্রি করে জীবন পার করেও কোনো অনুশোচনা হয় না। সেটাই সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ! শিক্ষার উদ্দেশ্য তো এটা কোনোকালেই ছিল না। হাত পেতে ঘুষ নিতে যে বিবেক বাধা দেয় না সে বিবেকের দায় শিক্ষার নয়। শিক্ষা নামে আধুনিক রমরমা বাণিজ্যের। শিক্ষা এখন এটাই। কতজন মানুষ হলো এসব দেখে আর কি হবে!
শিক্ষা যতটা মহান একজন শিক্ষার্থীকে ততটাই মহান করার উদ্দেশ্যেই তা ধাবিত হওয়া উচিত। কোনোভাবেই কেবল পাস করা বা শুধু সার্টিফিকেট অর্জন করা বা চাকরি করার উদ্দেশ্যে শিক্ষা পরিচালিত হওয়া উচিত নয়। কারণ মহান শিক্ষার উদ্দেশ্য যদি সামান্যতম ভিন্ন খাতেও প্রবাহিত হয় তাহলে সে দেশের জন্য মোটেই মঙ্গলজনক হবে না। আমাদের আজকের সমাজের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে তো? আমরা শিক্ষিত জাতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছি না তো? দিন যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আজকালকার ছেলেমেয়েদের মধ্য থেকে বই পড়ার প্রবণতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। সারাদিন মুখ বুঁজে মোবাইলের স্ক্রিনে ফেসবুক ঘাঁটতে যে আনন্দ পায়, জ্ঞান লাভে আর ততটা আনন্দ পায় না।
তাইতো নতুন বই পেলে যে এক ধরনের মুগ্ধতা তৈরি হয় তা ঠিক আছে কিন্তু কয়েক মাস যেতেই সে মুগ্ধতা আর থাকছে না। মূল বই থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। ঝুঁকছে গাইড বই, লেকচার শিট, প্রাইভেট এ সবের প্রতি। এ সব কিছুই অবশ্য পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার জন্য। পাস করা, ভালো ফলাফল করা এ সবই যেন মুখ্য উদ্দেশ্য! অবশ্য আজকালকার সচেতন অভিভাবকমাত্রই সন্তানের ভালো ফলাফল আশা করে। আমিও করি। কিন্তু ভালো ফলাফল করতে গিয়ে যদি পাঠ্য বইয়ের বদলে গাইড, প্রাইভেট বা লেকচার শিটের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায় তবে সেটা একদম ভালো কথা নয়। তারপর আবার এসবের বাইরে গিয়ে পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, কবিতার ভেতরে যে জ্ঞানের এক অফুরন্ত ভাÐার আছে তার খোঁজ এরা করছে না। তার কারণও কি শুধুই পরীক্ষায় ভালো ফলাফল? ফলে জ্ঞান হয়ে পড়ছে সীমাবদ্ধ। সীমাবদ্ধ জ্ঞান দিয়ে মুক্ত আকাশের সন্ধান মেলে কি? শুধুমাত্র পাস করা বা ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে (প্রাইভেট বা কোচিংয়ে বেশি সময়) ভালো ফলাফল করা যায় বৈকি তবে প্রকৃত মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায় কি? মানুষ হওয়ার ক্ষেত্রে মুক্ত জ্ঞানের চর্চা থাকা আবশ্যক।
যখন দেখি বইয়ের বদলে ক্লাসের বাইরে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই ভারতীয় টিভি সিরিয়াল দেখে, মোবাইল বা ট্যাবে গেমস খেলে বা অপ্রয়োজনীয় কিছু ওয়েবসাইটে ঢুকে সময় কাটাচ্ছে তাতে আমি মর্মাহত হই। কারণ এতে তাৎক্ষণিক মনের আনন্দ মিটছে বৈকি, কিন্তু মাথার ভেতর থেকে বই পড়ার ধৈর্যটা কমে যায়। বিষয়টা এমন যে একজন ছাত্র যখন তার মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে যে তীব্র আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকে সেই আগ্রহ যদি বইয়ের পৃষ্ঠার প্রতি থাকতো তাহলে কত ভালোই না লাগতো। তবে বিষয়টা শুধু আমার ভালো লাগা বা মন্দ লাগার নয়, বিষয়টা জাতির ভবিষ্যতের। আমাদের মোবাইলের দরকার আছে কিন্তু মাধ্যমিক শ্রেণিতে পড়–য়া একজনের দিনের কয়েক ঘণ্টা মোবাইলের সঙ্গে কাটানো কতটা প্রয়োজন আছে তা বোধগম্য নয়। এর অর্থ আমি প্রযুক্তির বিপক্ষে নই। বিজ্ঞানের আশীর্বাদে মানব সভ্যতা সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আমার তো চিন্তা একে সঠিকভাবে ব্যবহারের ওপর।
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের গÐি পেরিয়ে সবাই এখন বড় হওয়ার জন্যই ছুটছে। কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইত্যাদি কত শত লক্ষ্য নিয়ে ছুটছে। তাদের সঙ্গে আছে বড় বড় সার্টিফিকেট। অনেকেই তাদের স্বপ্নের পেশায় নিয়োজিতও হবে। কিন্তু এদের চাকরির বাজারে, টাকা অর্জনের বাজারে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ হওয়ার গুণাবলিও অর্জন করা একান্ত জরুরি। পাসের ফলাফল দিয়ে শিক্ষার্থীর মেধা যাচাই করা যায় বটে কিন্তু সে মানুষ হওয়ার পথে কতটুকু এগুলো তা যাচাই করতে হলে তার সার্বিক গুণাবলির দিকে তাকাতে হবে। সেটা কেবল সেই ব্যক্তি আর তার সঙ্গে জড়িত আপনজনরাই ভালো বলতে পারবে। তবে এইচএসসি পাস করা এসব শিক্ষার্থীর ওপর এখন প্রচÐ মানসিক চাপ যাবে।
প্রত্যেকেই চাইবে নিজের পছন্দের বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে। কিন্তু বাস্তবতা হলো সবাই এ সুযোগ পাবে না। একজন মানুষের উচ্চ শিক্ষা লাভ করার পাশাপাশি মনুষত্ব অর্জনের শিক্ষা নেয়াটাও জরুরি। উচ্চ শিক্ষা শুধু সার্টিফিকেটে উচ্চ হলেই হবে না মন ও মননশীলতায়ও উঁচু হতে হবে। সেই মানসিকতা গড়তে শুধুমাত্র নামিদামি ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেলেই চলবে না। সা¤প্রতিক সময়ে আমরা এর অনেক উদাহরণ পেয়েছি।
দেশে অনেক কলেজ রয়েছে যেখানে ভর্তি হয়ে অনায়াসে উচ্চ শিক্ষা শেষ করা যায়। তাই মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও চলবে না। সার্টিফিকেট বিদ্যা অর্জন করার পাশাপাশি আমরা যে কিছু ভালো মানুষ চাই। মহান শিক্ষা দিবসের পেছনে যে ইতিহাস রয়েছে আজো আমরা সেখানে পৌঁছতে পারিনি।
শিক্ষা এমন হোক যেন সার্টিফিকেটের গÐি পেরিয়ে মানবতার ছোঁয়া এনে দিতে পারে। ব্যর্থতা শিক্ষার হয় না, ব্যর্থতা হয় শিক্ষার নীতিনির্ধারকদের। কোচিং নির্ভর, প্রাইভেট নির্ভর, গাইড নির্ভর শিক্ষা নিয়ে কতদূর অগ্রসর হওয়া যাবে তা বলা মুশকিল। এ সব রাহু থেকে শিক্ষাকে মুক্ত করে শিক্ষার উদ্দেশ্য সাধনের দিকে এগুতে হবে। তাতেই জাতির মঙ্গল হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও লেখক।