শিক্ষাজগৎ মুহাম্মদ ইসহাক

79

 

সময়ের প্রয়োজনে ও নিজের জীবনের তাগিদে আমাদেরকে নানামুখী শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়। যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন দেশে হরেক রকমের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে। এদেশেও নানা ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ পর্যন্ত হরেক-রকমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু সমাজের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ বাস করে। অসহায়, গরিব বা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীও আছে। পিছিয়ে পড়া লোকদের বিভিন্ন আর্থিক সমস্যা থাকে ; যার কারণে সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারে না। এ বইয়ের লেখক সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য শিক্ষার কথা তুলে ধরেছেন। কিভাবে দরিদ্র ও অসহায় ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দেয়া যায় এবং তাদের শিক্ষার পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। মানব সমাজের স্বাভাবিক শিশু যেমন রয়েছে, তেমনি প্রতিবন্ধী শিশুও থাকে। প্রতিবন্ধী শিশুর মধ্যে উল্লেখ করা যায় যেমন, শারীরিক প্রতিবন্ধী, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, শ্রবণ প্রতিবন্ধী, মানসিক প্রতিবন্ধী ও বহুমুখী প্রতিবন্ধী শিশু। এ সকল প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষার সুযোগ রয়েছে। ‘প্রতিটি মানব শিশুই অফুরন্ত সম্ভাবনার আধার। আর শিক্ষা হচ্ছে জীবন বিকাশের হাতিয়ার। সাধারণ শিশুদের বেলায় যেমন শিক্ষার কোন বিকল্প নেই তেমনি প্রতিবন্ধী শিশুদের ক্ষেত্রেও একথাটি সমান প্রযোজ্য। তাই প্রতিবন্ধী শিশুদের আত্ম-উন্নয়নে সমাজের মূল গ্রোতধারার সাথে সম্পৃক্ত করার জন্য প্রয়োজন তাদের উপযোগী শিক্ষা, বিশেষ শিক্ষা’ (খান ২০০৯:১৫৭)।
এ বইয়ের মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষার বহুমাত্রিক দিক সম্পর্কে তুলে ধরা হয়েছে। নানান পর্যায়ে ও ভিন্ন পরিস্থিতিতে কিভাবে শিক্ষা বা জ্ঞান অর্জন করা যায়; তা বর্ণনা করা হয়েছে। সময়ের প্রয়োজনে প্রাতিষ্ঠানিক, অপ্রাতিষ্ঠানিক, আনুষ্ঠানিক, উপানুষ্ঠানিক, গণশিক্ষা, সাক্ষরতা শিক্ষা, জীবনব্যাপী শিক্ষা ও অব্যাহত শিক্ষা। আরো নানা ধরনের শিক্ষা অর্জনের মাধ্যম হতে পারে। নিরক্ষরমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার জন্য প্রয়োজন শিক্ষা। সাক্ষরতার হার বাড়ানোর জন্য দরকার শিক্ষা। ‘যে কোন দেশেরই সার্বিক উন্নয়নের প্রাথমিক শর্ত শিক্ষা, শিক্ষার সঙ্গে উন্নয়নের সম্পর্কও ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশ নিরক্ষরতা সমস্যায় জর্জরিত বলেই আমরা সাক্ষরতার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছি। কিন্তু সাক্ষরতার ন্যুনতম জ্ঞান দিয়ে মানুষ শিক্ষিত হতে পারে না। শিক্ষা মানুষকে সাক্ষরতার চাইতে অনেক বেশি কিছু দেয় এক কথায় চিন্তা চেতনার প্রসার ঘটায়, কর্মদক্ষতা বাড়ায়। সাক্ষরতা ও শিক্ষা দুটি পৃথক ধারণা হলেও একটি অপরটির সাথে সম্পর্কিত’ (খান ২০০৯:১০৮)। প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার অজ্ঞতা,কুসংস্কার, নিরক্ষরতা দূরীকরণে শিক্ষার বিকল্প নেই। পৃথিবীর নানান দেশে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস প্রতি বছর ৮ সেপ্টেম্বর পালিত হয়। সাক্ষরতা বৃদ্ধি করার জন্য ও নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্য বিভিন্ন দেশ এ উপলক্ষ্যে কর্মসূচী গ্রহণ করে। বয়স্ক শিক্ষা ও গণশিক্ষার মাধ্যমে সাক্ষরতার হার বাড়ানো যায়।
নারী ও পুরুষ মিলেই পরিবার ও সমাজ। কিন্তু যুগ যুগ ধরে বিভিন্নভাবে নারীকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল। সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে নারীকেও শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে। ‘যেদিন থেকে পৃথিবীর বুকে মানুষের পদচারণা শুরু হয় সে দিন থেকেই শিক্ষার সূত্রপাত। আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সূত্রপাত সমাজ গঠনের মধ্যে দিয়ে। নারী সমাজের একজন হয়েও কেন যেন আনুষ্ঠানিক শিক্ষায়, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় অনেক পিছিয়ে’ (খান ২০০৯:১১৫)। শিক্ষার অভাবে, সচেতনতার অভাবে সমাজ, দেশ ও জাতি অনেক পিছিয়ে যায়। নারীকে শিক্ষার অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার, ভোটের অধিকার ও নারীর ক্ষমতায়ন থেকে অনেক দূরে রেখেছিল। ‘শুধু আঠারো শতক থেকে গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন পুরুষরা নারীর নিয়ন্ত্রিত জীবন থেকে নারীমুক্তি বিষয়টিকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করেন। নারীও পুরুষের মতই মানুষ একথাটি ভাবতে অনেক সময় গড়িয়ে যায়। এর পরই আসে নারী শিক্ষা এবং আনুষঙ্গিক বিষয় নিয়ে ভাবনা – চিন্তা। যাই হোক সেই ইতিহাস অনেক বিস্তৃত। নারীর শিক্ষা, সংস্কৃতি, উন্নত জীবন এসবের জন্য আন্দোলন মানে পুরুষ শ্রেণির সাথে বিরোধ নয়,বিবাদ নয় সমাজ সংসারের বন্ধন আরো সুসংহত ও মজবুত করণ’ (খান ২০০৯:২০১)। বইয়ের আলোচনায় রয়েছে নারী শিক্ষা, নারী শিক্ষার আন্দোলন, নারীর অধিকার,নারীর ক্ষমতায়ন ও নারী জাগরণের ইতিহাস। তাছাড়া নারী জাগরণের যাঁরা স্বপ্ন দেখেছিলেন পথ দেখিয়েছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকয়া। ‘হাঁটি হাঁটি পা পা করে আজ অনেকখানি এগিয়ে শিক্ষা দীক্ষা, সমাজকর্ম সবদিক দিকে। এ যাত্রা অগ্রযাত্রা। বাঙালি নারীর স্বপ্নদ্রষ্টা রোকেয়ার স্বপ্নের পথে অগ্রযাত্রা।একটি সুন্দর সমাজ নির্মাণে জাগরণের পদচারণা মাত্রা। আমাদের নারীর অগ্রযাত্রায় রোকেয়া স্মরণীয়। বাঙালি মুসলমান মেয়েদের আজকের অবস্থানের জন্য রোকেয়া আজীবন স্মরণীয়। নারীর চলার পথ হোক আরো গতিময়, শিক্ষা হোক আরো মানসম্মত, আরো স¤প্রসারিত,যুগোপযোগী এটাই আমাদের কাম্য’ (খান ২০০৯:২১৫)।নারী জাগরণের সাথে জড়িয়ে আছে পরিবার, সমাজ, জাতি ও দেশ। নারী শিক্ষা প্রসারের ফলে নারীর অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়। সমাজকে আলোকিত করার হাতিয়ার হল শিক্ষা। জ্ঞান অর্জন করার জন্য দরকার বই, পুস্তক ও বিভিন্ন গ্রন্থ। বই পড়ার মাধ্যমে অনেক কিছু জানা যায়। সৃষ্টির আদি থেকে জ্ঞান জগতে বইয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। ‘বইয়ের জগৎ মানে জ্ঞানের জগৎ, তথ্যের ভাÐার, কালের সাক্ষী। কালে কালে এ জগতের সৃষ্টি মানুষের প্রয়োজনে। বইয়ের জগতের প্রাণকথা মানুষ, মানুষের জীবন, সমাজ। আর বইয়ের জগতের আধার হল গ্রন্থাগার। বইয়ের জগতের অগ্রযাত্রায় মানব সভ্যতার প্রাচীনতম অবদান’ (খান ২০০৯:৫৩)। তিনি শিক্ষা ক্ষেত্রে শিশুদের শিক্ষা, কিশোর কিশোরীর শিক্ষাক্রম, বিশেষ শিক্ষার বিষয়সমূহ, শিক্ষার বিভিন্ন উপকরণ, নারীর আর্থ-সামাজিক অবস্থা, জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি, সাক্ষরতা, নিরক্ষরতা, গণসাক্ষরতা ও স্যাটেলাইট বিদ্যালয় সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তিনি সুন্দর, সহজ -সরল ভাষায় ও নিজস্ব চিন্তা চেতনা দিয়ে বইটি লিখেছেন। শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। সমাজ পরিবর্তন কিংবা সমাজ নিমার্ণের প্রেরণা শক্তি বা মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে শিক্ষা। গণমাধ্যম শিক্ষা বিস্তার বা শিক্ষা প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যদিক গণমাধ্যম ব্যক্তির মানসিক প্রফুল্লতা, বিনোদন, সৃজনশীল মন ও সৃজনশীল চিন্তাভাবনা তৈরি করে। জনগণের ব্যাপক সাক্ষরতায় অংশগ্রহণের জন্য গণমাধ্যম শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। শিক্ষা সম্পর্কে পড়ার জন্য বইটির খুবই গুরুত্ব রয়েছে। শিক্ষা বিষয়ে গবেষণা করার জন্য সহায়ক হিসেবে বইটি অত্যন্ত কাজে লাগবে। শিক্ষা বিষয়ে যারা লেখাপড়া করে ও পড়তে চাই তাদের জন্য শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের মতো কাজে আসবে।

শিক্ষাজগৎ, শাওয়াল খান, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, জুন ২০০৯, মূল্য ১৭০ টাকা, প্রচ্ছদঃ হাশেম খান, পৃষ্ঠা সংখ্যা -৩২০