শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স.)

6

 

মহান রব্বুল আলামিন বিশ্বে শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে হযরত মুহাম্মদ (স.) কে প্রেরণ করেছেন। আর যেহেতু ইসলাম শব্দের মধ্যেই শান্তি কথাটি নিহিত রয়েছে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নবী করিম (স.) এ শান্তির বাণী প্রচার করে গিয়েছেন। তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন নিকট ও দুরের মানুষের ময়দানে। জাহেলীয়াতের ঘোর অন্ধকার যুগে শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার বাণী ও নুরে হেদায়ত নিয়ে হযরত মুহাম্মদ (স.) আবির্ভূত হন ঊষার ধুসর মরু আরবের মক্কা নগরে। তাঁর কর্মময় পবিত্র জীবনের ইতিহাস এক বিরামহীন অনাবিল শান্তি প্রতিষ্ঠার মহোজ্জ্বল ইতিবৃত্ত। বাল্যকালে তিনি আরবের বুকে প্রচলিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান এবং উদার চিত্ত সমমনা যুবককে নিয়ে গঠন করেন কল্যাণধর্মী একটি শান্তি সংস্থা। হিলফুল ফুযুল নামের এ সংস্থাটি পৃথিবীর ইতিহাসে আদি সেবা সংঘের মর্যাদার দাবিবার। আরববাসীদের মধ্যে শান্তি ও সম্প্রীতি সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রতিজ্ঞাকারীগণ আল্লাহর নামে যে হলফ করেছিলেন তা যথেষ্ট কার্যকর হয়েছিল। দেশ থেকে অশান্তি, বিশৃংখলা, উৎপীড়ন ও অত্যাচার দুর হয়েছিল। পরবর্তীকালে কুরাইশরা এই নবীন প্রতিষ্ঠানের প্রধান উদ্যোক্তা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) জীবনের কোন মুহূর্তে তা ভুলে যান নি। বদরের যুদ্ধের বন্দীদিগের ব্যাপারে তিনি ফরমালেন- ইসলাম তো এসেছে কেবলমাত্র ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করতে এবং নির্যাতিত অত্যাচারিতের সাহায্য করতে। নবুওয়তের পূর্বে কাবা গৃহে হাজরে আসওয়াদ পুন:স্থাপন নিয়ে বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে নিশ্চিত সংঘর্ষের উপক্রম হলে সেখানেও শান্তির দূত হযরত মুহাম্মদ (স.) আবির্ভূত হন। তখন সমবেত জনতা সমস্বরে বলে উঠলো, “হাজাল আমীনু কাদ রাদীনা” এই তো আল আমীন মুহাম্মদ (স.) আমরা সবাই তাঁর সিদ্ধান্তে সম্মত। বস্তুত এই গোত্রীয় কোন্দলের শান্তি পূর্ণ মীমাংসা সহ বিভিন্ন জটিল সমস্যার সমাধানে কিশোর বয়সেই তিনি একজন সফল ও সুযোগ্য শান্তি স্থাপকের স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন। নবুওয়ত প্রাপ্তির পর দেশ ও জনগণের শান্তি ও মুক্তির জন্য তিনি আঘাতের পর আঘাত সহ্য করেও জন্মভূমি মক্কায় অবস্থান করেন। এই কথা ভেবে যে, একদিন তারা অনুতপ্ত হবে এবং নিজেদের ভূল বুঝতে পেরে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করবে। কিন্তু দিনের পর দিন তাদের নিপীড়ন বৃদ্ধি পাওয়ায় দীর্ঘ তের বছর পরে আল্লাহর আদেশে তিনি প্রিয় জন্মভূমির মায়া পরিত্যাগ করে মদীনায় হিজরত করেন। এতদসত্ত্বেও মদীনার মাটিতে তারা তাঁকে শান্তিতে থাকতে দেয়নি। একদিকে মক্কার কুরাইশগণ অন্যদিকে মদীনার ইয়াহুদী ও পৌত্তলিকরা তাঁকে ও মুসলিমদেরকে নানা ভাবে অপমান ও উত্ত্যক্ত করতে শুরু করলো যার ফলে তিনি তাঁর নীতি পরিবর্তন করতে বাধ্য হলেন। প্রথমে নীতি ছিল সর্বাবস্থায় ধৈর্য ধারণ করা আল্লাহর হুকুমে পরে তিনি যুদ্ধ নীতি গ্রহণ করলেন। চির বিবদমান শতধা বিচ্ছিন্ন আরব জাতিকে তিনি একত্রিত করে মদীনায় একটি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। কোরান ও সুন্নাহ মোতাবেক শাসন কার্য পরিচালনা করে তিনি বিশ্বের বুকে এক বরকত মত ও শান্তিময় সোনালী ইতিহাস রচনা করে গিয়েছেন।
শান্তির অগ্রদুত মুহাম্মদ (স.) বদর যুদ্ধের বন্দীদের সাথে সেদিন যে উদারতা এবং মহানুভবতার নজীর পেশ করলেন বিশ্বের ইতিহাসে তা স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে। প্রিয়নবী (স.) এর অনুপম গুণাবলী যে শত্রুকেও কেমন শান্তিপূর্ণভাবে বশীভূব করে ঈমান ও ইসলামের পথে নিয়ে আসে।
অজস্র ঘটনার মধ্যে ইহুদী জায়িদ বিন সানার তার একটি উজ্জল দৃষ্টান্ত। হযরত রসুলুল্লাহ (স.) হযরত ওমর বিন খাত্তাব (র.) সহ মদীনায় তাঁর কয়েকজন সাহাবা পরিবেষ্টিত ছিলেন। এ অবস্থায় জায়িদ উপস্থিত হয়ে তাঁর কাছ থেকে মহানবীর (স.) ধার নেয়া অর্থ অত্যন্ত কর্কশ ভাষায় দাবি করলেন। তিনি রসুলুল্লাহর (স.) জামা টেনে ধরায় তার স্কন্ধ মোবারক অনাবৃত হয়ে যায়। জায়িদ বলেন, আপনারা আবদুল মুত্তালিবের বংশের লোকেরা কারো কাছে ধারদেনা করলে তা পরিশোধের চেষ্টা করেন না। ব্যাঘ্রসেনা ওমর (র.) কাছে ছিলেন, ক্রোধে তাঁর চোখ মুখ লাল হয়ে উঠেছে কেবল। রাগত কণ্ঠে সবিময় বলে উঠলেন হে পামর! তুই সত্যি সত্যি তাই বলেছিস আমি যা শুনেছি। এই বলে তিনি ইহুদীকে ধরতে উদ্যাত হলেন, প্রিয় নবী (স.) হযরত ওমরকে (র.) নিবৃত করলেন, বললেন, “এতো পাওনাদার, এর কথা বলার অধিকার আছে। ক্ষনিক পরে ইহুদী তার প্রকৃত রূপ প্রকাশ করলো, বিনীত কন্ঠে নিবেদন করলো- আমি একজন ইহুদী ধর্ম যাজক। তাও রাতে আখেরী নবীর পরিচয় দেখেছি, তিনি অস্বাভাবিক ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতার অধিকারী হবেন। ইনি সত্য সত্যিই হক নবী কিনা আমি শুধু তা পরীক্ষার জন্য এই হঠকারিতা করেছি”। এরপর ইহুদী নবীজীর কাছে ক্ষমা চেয়ে ইসলাম কবুল করে নিল।
শান্তির অগ্রদুত বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স.) ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়ে জীবনের সর্বোচ্চ মহানুভবতা ও ক্ষমাশীলতার পরিচয় প্রদান করেছেন। মহা প্রাণ মহানবী (স.) তাদের সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন- “আপনারা সবাই মুক্ত এবং স্বাধীন”।
অপ্রত্যাশিতভাবে প্রাণ ফিরে পাওয়ার ফলে সেদিন যখন মক্কাবাসীরা বিজয়ী রসুলুল্লাহকে (স.) যে কোন মুল্য দিতে প্রস্তুত ছিল, তখন তিনি একবার ক্ষমার ন্যুনতম শর্ত হিসেবে তাদের ইসলাম গ্রহণের প্রস্তাবও দিলেন না। ব্যাপারটি মানুষের চিন্তার জগতে আলোড়ন সৃষ্টি না করে পারে নি। তার এ ক্ষমা প্রদর্শন এবং সে সাথে তার দশ সহ¯্র সৈন্যের বিজিত শহরে সুনিয়ন্ত্রিত প্রবেশকে নিরপেক্ষ ঐতিহাসিকগণ বিস্ময়পূর্ণ বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। শান্তির স্বপক্ষে মহানবী (স.) এর এই মহানুভবতা পৃথিবীর ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে।
একদা নির্জন পথে একজন বিবেকবান আরব পথিক আবু জেহেলকে প্রশ্ন করলো হে আমাদের নেতা, এখানে আপনি ও আমি ভিন্ন তৃতীয় জনের অবস্থান নেই। বলুন মুহাম্মদ যা যা বলছে তা কি সত্য? আবু জেহেল তদুত্তরে বলছিল- আল্লাহর শপথ মুহাম্মদ কখনো মিথ্যে বলেনি। সে সর্বদা ন্যায় নীতির কথাই বলে।
এমনিভাবে হযরত জানের শত্রæরাও দৃঢ়তার সাথে তাঁর সত্যবাদিতা ও ন্যায়নীতির সাক্ষ্য দিয়েছিলো।
একবার এক যুবক প্রিয় নবীর (স.) সমীপে এসে আরজ পেশ করল হে আল্লাহর রসুল! আমাকে ব্যভিচার করার অনুমতি দেন। অন্য কোন ব্যক্তি হলে প্রশ্নকারী যুবককে চড় থাপ্পড় বা হুমকী ধমকী দিয়ে বের করে দিত। কিন্তু বিশ্ব জগতের শান্তির অগ্রদুত শুধু অন্যায়ের রোষ প্রকাশকেই তাঁর দায়িত্ব ভাবতেন না বরং অন্যায়ের যথার্থ প্রতিষেধক দানকেও নিজের পবিত্র দায়িত্ব মনে করতেন। তাঁর অন্তরে সে যুবকের প্রতি ক্ষোভ ঝলসে উঠার পরিবর্তে সৃষ্টি হলো মমতা ও করুণার স্পন্দিত উর্মি। তিনি তাকে স্নেহভরে সান্নিধ্যে টেনে আনলেন। মায়া কণ্ঠে তাকে বললেন আচ্ছা, যে কাজটি তুমি অন্য কোন মেয়ের সাথে সম্পাদন করতে চাচ্ছ, যদি কেউ তা তোমার মায়ের সাথে করতে চায় তুমি কি তা সহ্য করবে? যুবকের চিন্তা জগতে বাক্যটি প্রচন্ড আলোড়ন সৃষ্টি করল। একে একে তার বুদ্ধি কপাট উন্মুক্ত হতে শুরু করল। উত্তরে সে বলল- না, এয়া রসুলাল্লাহ! হুজুর (স.) বললেন- তা হলে অন্যান্যরাও তাদের মায়ের ক্ষেত্রে এ কাজ অপছন্ধ করবে নিশ্বয়ে। আচ্ছা বলতো কেউ যদি তোমার বোনের সাথে এ কাজ করে তুমি কি তা নিরবে মেনে নেবে? যুবক বলল না, এয়া রসুলাল্লাহ! নবীজী বললেন- অন্য লোকও তার বোনের জন্য একাজকে অবশ্যই ঘৃণা করবে। পরিশেষে তার কাঁধে তিনি হাত রেখে এ দোয়া করলেন “হে আল্লাহ! তার পাপ মোচন করে দাও। অন্তর নির্মল করে দাও। গুপ্তাঙ্গ হেফাজত কর।” পরে যুবকটি এ জঘন্য পাপের প্রতি চিরদিনের জন্য ঘৃণা প্রকাশ করে মজলিশ থেকে প্রস্থান করল।
সার কথা, ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবন তথা সর্বত্র শান্তি প্রতিষ্ঠায় হযরত মুহাম্মদ (স.) এর অবদান নি:সন্দেহে অতুলনীয়। একমাত্র তার আদর্শ পরিপূর্ণভাবে অনুকরণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমেই বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

লেখক : ইসলামি চিন্তাবিদ, প্রাবন্ধিক