শফি সুমনের ‘সময়ের ছড়া’

143

বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যে শফি সুমন একটি পরিচিত নাম। গীতিকার হিসেবেও তাঁর পরিচিতি সারা দেশব্যাপী। বর্তমান সময়ে শিশুসাহিত্যের আদৃত ও আলোচিত মাধ্যম কিশোর কবিতায়ও রয়েছে তাঁর সরব উপস্থিতি। তাঁর কিশোর কবিতায় অনায়াসে একজন চিরায়ত কিশোরকে খুঁজে পাওয়া যায়। একটি কিশোরের স্বাভাবিক চপলতা, শৃংখল ভাঙার প্রবণতা, নিজের মতো করে চলার ইচ্ছা, আবেগ অনুভূতির নিখাদ রূপায়নে শফি সুমনের হাত বরাবরই পোক্ত। ‘আকাশের সীমানায় পাখিদের ঠিকানায়, নির্বাচিত কিশোর কবিতা, প্রিয় বাংলাদেশসহ তাঁর এ পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দশ। সম্প্রতি অমর একুশে গ্রন্হমেলাকে সামনে রেখে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর সমাজমনস্ক ছড়াগ্রন্হ ‘সময়ের ছড়া’। গ্রন্থটিতে স্থান পেয়েছে আমাদের যাপিত জীবনের চালচিত্র নিয়ে রচিত তেইশটি ছড়া।
সময়ের ছড়া মানে সময়েরই দর্পণ। লেখকমাত্রই ব্যক্তি, পরিবার,সমাজ তথা দেশ ও মাটির প্রতি দায়বদ্ধ। সে দায়বদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে লেখক কখনো আশ্রয় নেন স্যাটায়ারের। কখনো হাস্য কৌতুকের, কখনো তীর্যক বাক্যবাণের। একজন লেখকের মনে যখন সমাজের নানা অসঙ্গতি রেখাপাত করে তিনি তখন তা সাহিত্যের রসায়নে, শব্দের কৌশলী প্রয়োগে, বাক্যের নিবিড় বুননে, ছন্দ ও অনুপ্রাসের দোলনায় দোলায়িত করে উপস্হাপন করেন তখন তা পাঠকের মনে দোলা না দিয়ে পারে না।
কম আয়তন বেশি মুখের দেশ বাংলাদেশ। এ দেশটিতে প্রতি পদে পদে নানা সমস্যা। নাগরিক জীবনের অপরিহার্য উপাদানগুলোর অভাব কীভাবে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে, অর্থনীতির চাকাকে স্হবির করে তোলে তারই স্বরূপ উন্মোচন ও তা থেকে মুক্তির উপায় নিয়ে উচ্চকিত হয়েছেন শফি সুমন তাঁর প্রথম ছড়াটিতে-
বিদ্যুৎ পানি নেই/ নেই গ্যাস তেল
আলো নেই অফিসে/ কারখানা ফেল।
…………………………………………
এক টানে নিয়ে যায়/ আংটি ও চেইন
এই সব দেখে কী/ ঠিক থাকে ব্রেইন?
তাই বলি এক হও / এই সব তাড়াতে
চেতনার লাখো হাত/ এক সাথে বাড়াতে।
(মুষ্টিবদ্ধ হাত, পৃষ্টা-০৯)
ঘুষ যেন লেবেনচুষের মতো আমাদের সমাজে হয়ে উঠছে দিন দিন ওপেন সিক্রেট। ঘুষ নামক অনৈতিক প্রসঙ্গটি ছড়াকার ‘কামলা ‘ নামের আড়ালে চিত্রিত করেছেন অসাধারণ দক্ষতায় –
কলম পেশার কামলা তিনি আমলা অফিস পাড়ায়
নথি দেখেন চশমা এঁটে
সময় তাকে তাড়ায়।
ব্যস্ত থাকেন সই দেওয়াতে
উপরিটা নেন খামে
সৎলোকেরই বেশ ভূষা তার
অফিস কাঁপান নামে।
(কামলা, পৃষ্টা-১০)
একইভাবে ‘একালের সফদার” নামের ছড়ায় শফি সুমন আমাদের দেশের কিছু চিকিৎসকের ব্যবসায়ী মনোভাবের চিত্র এঁকেছেন অত্যন্ত সাবলীলভাবে-
রোগী এলে লাইনে/ ব্যবসায়ী আইনে
নাম্বার টুকে দেয়/ ব্যবসায়ী ছোড়া
একে একে ঘরে ঢোকে/ যাঁরা ঢোকে কোনো রোগে
রোগী দেখে সেবা নামে/ গুনে টাকা তোড়া।
( একালের সফদার- পৃষ্ঠা-৩০)
শফি সুমন গ্রন্থটিতে শান্তি এ সম্প্রীতির পক্ষে অন্তরায় বিষয়গুলোর পাশাপাশি আমাদের স্বাধীকার আন্দোলনের প্রথম পাঠ ভাষা আন্দোলন, শ্রমজীবি মানুষের জেগে উঠার দিন- মে দিবস, আমাদের মহোত্তম অর্জন স্বাধীনতা নিয়েও লিখেছেন চমৎকার বেশ কটি ছড়া। পাশাপাশি তিনি আমাদের সমাজে নিত্য ঘটমান নানা নৈরাজ্য প্রতিরোধ করে একটি সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখেছেন। সে লক্ষে দীপ্ত শপথে উচ্চকিত হয়েছেন এভাবে-
নূতন করে সব গড়ে নাও নিজের মতো করে
জীর্ণ সমাজ ভেঙে ফেলো নূতন সমাজ গড়ে।
(শপথ, পৃষ্ঠা-১১)
মঈন ফারুকের দৃষ্টি নন্দন প্রচ্ছদে বত্রিশ পৃষ্ঠার ‘সময়ের ছড়া’ গ্রন্হটি প্রকাশ করেছে কথন প্রকাশন, চট্টগ্রাম। দাম রাখা হয়েছে মাত্র একশত টাকা। আমরা গ্রন্হটির বহুল প্রচার ও প্রসার কামনা করছি।