শঙ্খ প্রেরণার নদ

9

সৈয়দ জেরিন

বান্দরবান জেলার থানচি উপজেলার শেষপ্রান্তে রেমাক্রি জলপ্রপাতের আরও উজানে মিয়ানমার বাংলাদেশ সীমান্তের আরকান পর্বত ঘেঁষে বাংলাদেশ সীমান্তের পাহাড়িঝর্ণা থেকে শঙ্খনদীর উৎপত্তি। এর সাথে যুক্ত হয়েছে থানচি, লামা আলিকদমসহ বান্দরবানের দৃষ্টিনন্দন পাহাড়ের বহু ঝর্ণার ধারা। নীলগিরির আরো অনেক দূর থেকে পাহাড়ি ঝর্ণার ধারাসমূহ নদীর রূপ পেয়েছে। ইংরেজরা এর নাম দিয়েছে সাঙ্গু। স্থানীয়রা এ নদীকে শঙ্খনদী হিসেবেই জানে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে ‘শঙ্খ’ একটি বিশিষ্ট নদী। নানা কারণে সে বিশিষ্ট। তার বিশিষ্টতার মূলে রয়েছে উৎপত্তি ও বঙ্গোপসাগরে মিলিত হওয়ার প্রেক্ষাপট। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, কর্ণফুলিসহ বাংলাদেশের প্রায় সবক’টি নদীর উৎস দেশের বাইরে ভারতে। বাংলাদেশের পাহাড় থেকে উৎপন্ন নদীর মধ্যে হালদা, মাতামুহুরি এবং শঙ্খ নদী উল্লেখযোগ্য।
হালদা নদী খাগড়াছড়ি বাটনাতলি পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে চট্টগ্রামের হাটহাজারি উপজেলার উপর দিয়ে কর্ণফুলি নদীতে মিলিত হয়েছে, সরাসরি বঙ্গোপসাগরের সংযুক্ত হয়নি। এ জন্যে প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননের নদী হালদাকে আক্ষরিক অর্থে নদী বলা যায় না। কর্ণফুলি নদীতে তার গন্তব্য বিলীন হওয়ায় তাকে উপনদী বলাই যুক্তিযুক্ত। উপনদী হলেও হালদা সাংবৎসর সজীব থাকে।
মাতামুহুরি নদী বান্দরবান সীমান্তের ‘ময়ভার পাহাড়’ থেকে উৎপন্ন হয়ে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার মধ্যদিয়ে মহেষখালী চ্যানেলে মিলিত হয়েছে। এ নদীর দৈর্ঘ্য ১৪৮কি.মি.। মাতামহুরি নদীও সরাসরি বঙ্গোপসাগরে মিলিত হতে পারেনি। মাতামুহুরি সাংবৎসর সজীব থাকে না। বর্ষায় তার প্রবাহ খরস্রোতা হলেও শীতে শ্রীহীন হয়ে পড়ে। ১৪৮ কি.মি. দৈর্ঘ্য হলেও এ নদীর জোয়ার ভাটা অংশ সামান্য।
বাংলাদেশে উৎপন্ন নদীর মধ্যে শঙ্খ সবচেয়ে প্রাঞ্জল, সবচেয়ে দীর্ঘ ও ১৭৩ কি.মি. দৈর্ঘ্যরে মধ্যে প্রায় ৪৫ কি.মি. পর্যন্ত এ নদীর জোয়ার ভাটা রয়েছে। বাংলাদেশে উৎপন্ন নদীসমূহের মধ্যে যথার্থ নদী বলা যায় শঙ্খনদীকেই। বাংলাদেশের নদীক‚লে একমাত্র শঙ্খনদী সগৌরবে নিজস্ব ভৌগলিক সীমারেখার মধ্যে বাঁশখালী উপজেলার ৩নং খানখানাবাদ ইউনিয়নের সমুদ্র সৈকতের সাথে মিলিত হয়েছে। সমুদ্র মোহনার অপরপ্রান্তে রয়েছে আনোয়ারা উপজেলার গহিরা গ্রাম। শঙ্খনদী খালখানাবাদ আর গহিরা দুই রূপসীর মুখে আস্ত দু’টি চুম্বন দিয়ে বঙ্গোপসাগরে অভিসারে মগ্ন।
থানচির গহীন অরণ্য ভেদ করে রেমাক্রি জলপ্রপাতে শক্তি সঞ্চয় করে চপলা চঞ্চলা শঙ্খনদী এঁকে বেকে, পাহাড়ি নৃত্যের তালে তালে, কোমর দুলিয়ে তার স্বচ্ছ জলরাশির মিষ্টি স্বাদ বুকে ধারণ করে লামা, আলীকদম, বান্দরবান এবং চট্টগ্রামের, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, আনোয়ারা, বাঁশখালী উপজেলাকে পরম আদরের পরশ বুলিয়ে বঙ্গোপসাগরে চির অভিসার রচনা করেছে।
শঙ্খনদীর অববাহিকার মানুষ এ নদীকে ঘিরে নানা স্বপ্নের বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। এ নদীকে কেন্দ্র করে ধীবররা বংশপরম্পরায় মাছ ধরে জীবীকা নির্বাহ করে আসছে। বঙ্গোপসাগরের জোয়ারের ঢেউ শঙ্খের প্রথম সেতু ‘দোহাজারী সেতু’ পেরিয়ে সাতকানিয়ার বাজালিয়া পর্যন্ত পৌঁছতে দেখা যায়। বান্দরবান শহর থেকে রাঙামাটির পথের যে ব্রিজটি নির্মিত হয়েছে তা শঙ্খের দ্বিতীয় সেতু, আর চাঁদপুর-তৈলার দ্বীপ পয়েন্টে নির্মিত সেতুটি তৃতীয় এবং বান্দরবান শহরের পূর্ব দিকে শঙ্খের উপর নির্মিত সেতুটি চতুর্থ শঙ্খসেতু। শঙ্খের মূলধারার সাথে বান্দরবান ও চট্টগ্রামের অসংখ্য ছোট ছোট পাহাড়ি ঝর্নার ধারা সংযুক্ত হয়েছে। এরা শঙ্খের মূল ধারাকে শক্তি যুগিয়ে আসছে। শঙ্খনদীর তীরে গড়ে ওঠেছে বান্দরবান শহরসহ বহু হাটবাজার, ঘাট।
শঙ্খনদীর বান্দরবান এলাকায় বঙ্গোপসাগরের জোয়ার পৌঁছে না। ওখানে নেই এ নদীর জোয়ার ভাটা। বান্দরবানে জনসাধারণ ও জেলেরা শঙ্খে ধরে মিঠাপানির মৎস্য প্রজাতি। এ নদীর ৫০ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের জোয়ার আসে। ওখানে ইলিশসহ নানা রকম সামুদ্রিক মাছ পাওয়া যায়। দেশের মৎস্য চাহিদা পূরণে এই শঙ্খনদী একটা বিরাট অবদান রেখে চলেছে।
থানচি থেকে খানখানাবাদ সমুদ্র মোহনা পর্যন্ত প্রায় ১৭০ কিলোমিটার দূরত্বের এ নদীর পাদদেশে নানা প্রকার শাক-সবজি, রবিশস্য, তরিতরকারী উৎপন্ন হয়। আর এ নদীকে কেন্দ্র করে বহু সেচ প্রকল্প গড়ে ওঠেছে। বান্দরবান অংশের চেয়ে চট্টগ্রাম অংশে এর বহুমুখী সেচ প্রক্রিয়া রয়েছে। যতটুকু অংশ পর্যন্ত সাগরের জোয়ার ভাটা রয়েছে, এতে নদীর ভাঙ্গনের ফলে নদী সিকস্তি মানুষের দুঃখ বেদনার ইতিহাস যেমন আছে, তেমনি নতুন নতুন চর সৃষ্টি হয়ে নানা শস্য উৎপাদন ও দেশের তরী তরকারীর চাহিদায় বিশেষ ভূমিকা রাখছে শঙ্খের চর। চন্দনাইশের খাগরিয়া, সাতকানিয়ার চরতি, আমিলাইশ, আনোয়ারার হাইলধর, বাঁশখালীর পুকুরিয়া, চাঁদপুরের চরের উৎপাদন দেশের তরিতরকারীর চাহিদা পূরণ করে জাতীয় অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে।
অতীতকালে সড়কপথের উন্নতি হওয়ার পূর্বে এতদাঞ্চলে শঙ্খনদী ছিল যোগাযোগের মাধ্যম। শঙ্খনদীর কুমারখালি থেকে চানখালি হয়ে একটি সংযোগ খাল কর্ণফুলিতে পড়েছে। এ নদীপথে চট্টগ্রাম শহরের সাথে পটিয়া, বাঁশখালী, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, আনোয়ারা, চকরিয়া, পেকুয়ার অসংখ্য লোক যাতায়াত ও মালামাল আনা নেওয়া করতো। এই নদীকে ঘিরে এলাকার নর-নারীর সুখ দুঃখ আশা আকাক্সক্ষাও আবর্তিত হতো। তাই আঞ্চলিক গানের গীতিকার গান বেঁধেছেনÑ
‘তুঁই মুখখান গইরলা হালা
যদি আঁরে লাগে ভালা
শঙ্খনদীর মাঝি
আঁই তোঁয়ার লগে রাজি।’
আর এই শঙ্খনদীকে ঘিরে কবি আল মাহমুদ লিখেছেন-
‘জল কদরের খাল পেরিয়ে জল পায়রার ঝাঁক
উড়তে থাকে লক্ষ রেখে শঙ্খনদীর বাঁক
মন হয়ে যায় পাখি তখন মন হয়ে যায় মেঘ
মন হয়ে যায় চিলের ডানা মিষ্টি হওয়ার বেগ।’
আবার শঙ্খপাড়ের কবি বলেন-
‘কালের সাক্ষী তুমি শঙ্খশবরী
এই দেশে জন্ম তোমার
এদেশেই বাসর সংসার
তোমার স্নেহের বুকে
আমার জীবন গলে চর
থানচির কিশোরী ঝর্ণা পূর্ণ যুবতী হও
প্রেমাশিয়ার উপকূল ছুঁয়ে-’
বর্ষায় শঙ্খ বড়ই খরস্রোতা। ভাসিয়ে নিয়ে যায় দুকূলের ভিটেবাড়ি বাসর সংসার। তাই শঙ্খপাড়ের কবি খরস্রোতা শঙ্খকে প্রস্তাব দেয় :
‘তুমি শান্ত হও
ষোড়শী পার্বতী ললনা
নারীত্বের লজ্জায় হও শীতের নদী
তোমাকে ভালোবাসা দেবো
তরল চাঁদের আলিঙ্গন
ভোরের ভাটায় দেবো
কোমল রবির নিবিড়তর চুম্বন
রেজিস্ট্রার্ড দানপত্র দেবো
অভিসার কুঞ্জ বঙ্গোপসাগর।’

শঙ্খনদীর নাম বিকৃতি প্রসঙ্গঃ
ব্রহ্মপুত্র, কপোতাক্ষ,নীলনদকে আমরা নদী না বলে ‘নদ’ বলি/লেখি। তেমনি শঙ্খও নদী নয়, নদ।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে চট্টগ্রামের শঙ্খনদী নামে ঐতিহ্যভাবে খ্যাত শঙ্খনদের নামকে জাতীয় ভাবে বিকৃত ভাবে প্রচার করা হচ্ছে। বিষয়টি আমাদের জন্য খুবই পীড়াদায়ক। কেননা চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষ অনার্যকাল থেকে এ নদকে শঙ্খনদী হিসেবে জানে। খাঁটি বাংলাদেশে উৎপন্ন নদীর মধ্যে শঙ্খ একটি বড় নদী। ছোটবেলা থেকে আমরা এ নদীকে শঙ্খ নামে জেনেছি। কিন্তু বর্তমানে সরকার অফিসিয়াল কাগজ পত্রে শঙ্খকে ‘সাঙ্গু’ নামে প্রচার করছে। অথচ এ নদীর নাম যে “শঙ্খ” তা আমরা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানেও পাই।
“শঙ্খনদীর সাম্পান ওয়ালা মোরে পাগল বানাইল।” অথবা,
! তুঁই মুখকা গইলল্যা কালা যদি আঁরে লাগে ভালা
শঙ্খনদীর মাঝি আঁই তোয়ার লগে রাজি।”
তাছাড়া শঙ্খ অববাহিকায় জন্মগ্রহণকারী সকল কবি তাদের কবিতায় এ নদীকে “শঙ্খ” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। শুধুমাত্র উপজাতীয়রা শঙ্খকে বিকৃত উচ্চারণে শঙ্গ বা সাঙ্গু বলে থাকে।
দু’একজন অ-কবি ইদানীং শঙ্খকে ‘সাঙ্গু’ লিখতে শুরু করেছে মাত্র। তারা শঙ্খনদীর ইতিহাস জানে না এবং “শঙ্খকাহন” গবেষণা গ্রন্থটি পাঠও করেনি। আমরা ‘সাঙ্গু’ লেখার অমন প্রয়াসেরও নিন্দা জানাই।
বলা বাহুল্য চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষ বান্দবানের থানছি উপজেলার “মদক টং” পাহাড় হতে উৎপন্ন, বাংলাদেশি ভূৎপন্ন নদীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এ নদকে “শঙ্খ” হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, আনোয়ারা এবং বাঁশখালীর উপর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত এ শঙ্খনদীকে সরকারি ভাবে “শঙ্খনদ” হিসেবে নামকরণ করার জোর দাবী জানাচ্ছি।
সরকারি ভাবে ইংরেজদের দেয়া নাম “সাঙ্গু” নামে শঙ্খকে নাম করণ করা চট্টগ্রাম বাসির জন্য দুঃখজনক।
শঙ্খ যেহেতু পুরুষ বাচক শব্দ সেহেতু সরকারি ভাবে শঙ্খনদীকে পুরুষ বাচক ‘শঙ্খনদ’ হিসেবে পুনরায় নামকরণ করা হোক। শঙ্খ ভূৎপন্ন ও নদীর তাবৎ চরিত্র বিচারে বাংলাদেশের জাতীয় নদী হওয়ার দাবী রাখে। যথার্থ বিচার থেকে হালদা নদী নয়, উপনদী। তাই খাঁটি দেশে উৎপন্ন এ শঙ্খনদকে দেশের জাতীয় নদী ঘোষনার দাবী রাখছি।
প্রসঙ্গত দেশে উৎপন্ন ‘মাতামুহুরী’, নদীর চেয়ে শঙ্খ অনেক গুণে শ্রেষ্ঠ। তাই মাতামুহুরী, হালদা নয়, শঙ্খই জাতীয় নদী হবার প্রকৃত দাবীদার।
শঙ্খনদী চলার পথে বাংলাদেশের দীর্ঘ অঞ্চলের নরনারীর হৃদয়ে স্বপ্ন গড়ে, স্বপ্ন ভাঙে, নতুন স্বপ্নের হাতছানি দেয় লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণে। এ নদীর যাত্রা কবে শুরু হয়েছিল আমাদের জানা নেই। কিন্তু আমরা জানি শঙ্খ উপহার দিয়েছে জনপদ, হাট, বাজার নগর বন্দর এবং জনপদের মানুষের জীবনে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। বাংলাদেশের বুকে শঙ্খনদী সগৌরবে তার বিজয় গাঁথা রচনা করবে অনন্তকাল পর্যন্ত।