শওকত ওসমানের জননী : নারীত্ব ও মাতৃত্বের অন্তর্বেদনা

1255

বাংলা কথাশিল্পের আঙ্গিক ও বিষয়ের ব্যাপক পরিবর্তনের সূচনা ধরা হয় ‘কল্লোল’ (১৯২৩) থেকেই। কল্লোলের যুগধর্ম শওকত ওসমানকে (১৯১৭-১৯৯৮) কতটা প্রভাবিত করেছিল, সুনির্দিষ্ট করে তা বলা মুশকিল। তবে গ্রামবাংলার তৃণমূলসংলগ্ন মানুষের প্রত্যক্ষ জীবন অভিজ্ঞতা তাঁর লেখা পাওয়া যায়। দরিদ্র্যের পাঁকচক্রে বিদীর্ণ মানুষের সামাজিক সত্তা, ব্যক্তির পর্যুদস্ত, বিপন্ন অস্তিত্ব শওকত ওসমানের লেখার শিল্প-প্রাণ হয়ে উঠেছে।
বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, শওকত ওসমানের জীবন জীজ্ঞাসা, দার্শনিক কৌতুহল ও সমাজতাত্ত্বিক অন্বেষা অন্য মুসলামান বাঙালি লেখকদের মতো নয়। পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, সেক্যুলার মানস ও বিশ্লেষণী মনোদৃষ্টি তাঁর লেখাকে অনন্যতা দান করেছে। শওকত ওসমান হয়ে উঠেছেন অন্য মুসলমান বাঙালি লেখকদের থেকে আলাদা, মর্যাদাবান এক রূপদক্ষ কথাশিল্পী।
শওকত ওসমানের ‘জননী’ (২০১৫) উপন্যাসে আমরা সেই পরিচয় পাই। এ উপন্যাসে কেন্দ্রীয় চরিত্র জননী দরিয়া বিবি। শওকত ওসমান দরিয়া বিবির দু’টি সত্তাকে শিল্পাবয়ব দেয়ার চেষ্টা করেছেন।
১. মাতৃত্ব
২. নারীত্ব।
একই চরিত্র কিন্তু অভিন্ন দু’টি সত্তা। এ দু’টি সত্তার টানাপোড়েন, অন্তঃবাস্তবতা ও বহিঃবাস্তবতার অন্তর্দ্ব›দ্ব দরিয়া বিবিকে শুধু বিপর্যস্ত করেনি, আপন অস্তিত্ব বিলোপের দিকেও নিয়ে যায়।
দরিয়া বিবির প্রথম পরিচয়, সে শিক্ষাবঞ্চিত একজন গ্রামীন নারী। নারীত্বের নিজস্ব কিছু চাহিদা থাকে। সেটি মনোদৈহিক। তার মনের অনির্দিষ্ট চাওয়া-পাওয়া। স্বপ্ন-কল্পনা, দৈহিক প্রয়োজনের কথা অবহেলা করার অর্থ তার নারীত্ব সত্তাকে অস্বীকার করা। নারী- প্রণয়িনী, প্রসিতবর্তিকা, আধার। প্রকৃতি সূত্রে, জেন্ডার ইকোইজমের কারণে নারী প্রাপ্ত হয় অসাধারণ কিছু গুণ এবং সীমাবদ্ধতা। যা অবিকল্প এবং পুরুষের বিপরীত। নারীত্বের ভেতরগত শক্তিই তাকে শ্রেয় এবং পেয় করেছে। নারীর সঙ্গ মধুর ও মদির। নারীর সঙ্গ-শয্যা, পুরুষকে পিপাষার্ত ও প্রশান্ত করে। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসয্য সম্পন্ন পুরুষ-সত্তার যোগ্য সঙ্গী করেই প্রকৃতি তাকে তৈরি করেছে।
দরিয়া বিরি নারী সত্তার বিকাশ ও ব্যবহার এক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। নারীত্বের আমোঘ প্রয়োজনেই তিনজন পুরুষের চারটি সন্তানকে দরিয়া বিবি গর্ভে ধাণ করতে বাধ্য হয়েছে। তিনটি সন্তানের জননী হয়েছে দরিয়া বিবি স্বামীর সঙ্গমেই, বৈধভাবে। শেষের সন্তানটি গর্ভে আসে অবৈধভাবে, অনিচ্ছাকৃত, সমাজ নিন্দিত পথে, পর পরুষের সঙ্গমে। উপন্যাসে বর্ণিত সমাজ ও বাসস্তব পরিস্থিতির কথা আমাদের বিবেচনায় আনতে হয়। স্মরণ করা প্রয়োজন যে, উপন্যাসে বর্ণিত সমাজ হচ্ছে ধর্মভীরুয মুসলিম সমাজ। দরিয়া বিবি সেই পরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রবল প্রতাপের শৃঙ্খলে বন্দি একজন মুসলিম নারী। যে ধর্ম কেবল নারীদের জন্য বিধান প্রচার করে, তার ইজ্জত আবরু ঢেকে রাখার কথা বলে। নারীর ভালো এবং মঙ্গলের জন্যই ধর্ম এসব বিধান দেয় কিন্তু নারীর অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ক্ষমতায়নের জায়গা করে দেয় নি,ইে সমাজ। বরং নারী বলে তাকে অনেক অর্থনৈতিক, সামাজিক কাজ থেকে দূরে রেখে ছিল। এই যে ডেন্ডার পলিটিকস্ বা লিঙ্গ বৈষম্য- এটি তৈরি করেছে ধর্মের নামে পুরুষতন্ত্র এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। ধর্ম ও পুরুষতন্ত্রের স্বরূপ উপন্যাসে অংকিত হয় এভাবে
‘কোরান-কেতাবে যা হুকুম আছে, সেইমতো কাজ করছি, আমাদের দোষ দাও কেন? বাপের কোলে বেটা মরলে তার ওয়ারিশানাদের কোনো দাবি দাওয়া থাকেনা।
ঃ ওসব হাদিস কালাম আমার কাছে শোনাতে এসোনা। মানুষকে পথের ভিখিরি করতে আল্লাহ বলে দিয়েছে? (ওসমান, ২০১৫:৫৪)
দরিয়া বিবির প্রথম স্বামী জাবেদ হোসেন গঞ্জ থেকে ফেরার পথে সর্প দংশনে মৃত্যুবরণ করে। শরিয়ত মতে পিতা জীবিত থাকা অবস্থায় পূত্রের মৃত্যু হলে তার সন্তান উত্তরাধিকারী সম্পত্তির ভাগ পায় না। সুতরাং বাধ্য হয়ে দরিয়া বিবি মৃত স্বামীর ভিটা ত্যাগ করে। পুত্র মোনাদিরকেও তার দেবররা জোর করে রেখে দেয়। গ্রামীন অসহায় নারী দরিয়া বিবির বেঁচে থাকার কোনো অবলম্বন নেই। ধর্ম না সমাজ তার দায়িত্ব নেয় না। কোরান-কেতাব, আল্লাহর দোই স্রেফ অজুহাত। আসল কথা সম্পত্তির লোভ। সম্পত্তি থেকে দরিয়া বিবিকে এবং ছেলে মোনাদিরকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে ধর্মের দোহাই পেড়েছে। ব্যবহারিক জীবন কেউ যে ধর্মের ফরয বিধানগুলো পালন করে, তা নয়। কেবল সম্পত্তির ক্ষেত্রে ধর্মের বিধান ও আল­াহর দোহাই খুব কঠিনভাবে উল্লেখ করা হয়। দারিয়া বিবির ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এতিম শিশু মোনাদির এবং বিধবা নারীর বেঁচে থাকার অবলম্বনটুকু কেড়ে নিয়ে তাদেরকে পথের ভিক্ষুক বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ।
পাঁচ মাস পর বিপত্মীক আলী আজহার খাঁর সঙ্গে দরিয়া বিরি দ্বিতীয়বার বিয়ে হয। মহেশডাঙ্গার মামুলী কৃষ আলী আজহার কেবল চাষের আয় দিয়ে সংসার চালে না। তাই বাড়তি রোজকারের আশায়, রাজমিস্ত্রির কাজ করতে দূর গ্রামে যায়। তবু সংসারের অনটন যায় না। বংশের যাযাবর বৃত্তি আজহারের রক্তে মিশে আছে। মাঝে মাঝে সে সংসার বিবাগী হয়ে উধাও হয়ে যায়। দ্বিতীয় স্বামী আলী আজহারের ঘরে জন্ম হয় পুত্র আমজাদ এবং মেয়ে নাঈমার। আলী আজহারের অনুপস্থিতিতে সংসার, সন্তান নিয়ে চরম দুঃখ দারিদ্রের মধ্যে, উপবাস, অনাহারের মধ্যে দিন কাটাতে হয় দরিয়া বিবিকে। হঠাৎ একদিন অসুস্থ হয়ে বাড়ি আসে অজহার এবং কিছুদিন রোগে ভুগে মৃত্যু হয় আজহার খাঁর।
হতভাগ্য নারী দারিয়া বিবির জীবন যেন শ্মশানে পরিণত হয়। আজহার বেঁচে থাকতেই প্রথম স্বামীর ঔরসজাত পুত্র মোনাদির এসে সংসারে ঠাঁই নেয়। মোনাদিরকে পেয়ে দরিয়া বিবির মাতৃ-হৃদয়ের মমতা ফল্গুধারায় প্রবাহিত হয়। ‘কিন্তু একটি ঘটনায় আজহার প্রচন্ড রেগে গিয়ে মোনাদিরকে মারধর করলে, অভিমানী মেনাদির মহেশডাঙ্গা থেকে শহরে চলে যায়। সেই থেকে আজহার ও দরিয়ার সম্পর্কে ফাটল ধরে। আজহারের জীবিতাবস্থায় এ সম্পর্কে আর স্বাভাবিক হয়নি।’ (শিরীন, ১৯৯৩:৩০) আজহারের মৃত্যুর পর মোনাদির মায়ের কাছে ফিরে আসে। পুত্র-কন্যার হা-মুখের গ্রাস জোগাড় কার জন্য হাড়ভাঙ্গা খাটুনি, হাস-মুরগি, গাছ, গুরু-ছাগল, বিক্রি করেও দরিয়া বিবি কূল পায় না। এই সময়টায় তার নারীত্বের চেয়ে মাতৃত্বের দায়িত্ব বড় হয়ে দেখা দেয়। মাতৃত্বের দৃঢ়তা, পবিত্রতা নিয়ে আত্মবিশ্বাসে অটল থাকে দরিয়া বিবি। সন্তান বাৎসল্য আর সন্তানের প্রতি তার অপরিসীম মমতা দরিয়া বিবিকে মায়ের মহান মর্যাদার অভিসিক্ত করে। মোনাদিরের পড়ার খরচ, আমজাদ, নাইমার ক্ষুধার দুর্বিসহ তাড়নার গোপনে শৈরমীর কাছে ঘড়া বন্ধক দেয়। নিজে অনাহারে থেকেও সন্তানদের দু’ বেলা খাওয়ানের জন্য দরিয়া বিবি ব্যাকুল হয়ে ওঠে। তবু সে কারো কাছে হাত পাতে না। কারণ তার রয়েছে আত্মমর্যাদাবোধ। আশেকজান জাকাতের কাপড় এনে দিলে সে রাগ করে তা দাওয়ার নিচে ফেলে দেয়। দরিয়া বিবির চরিত্র চিত্রণে শওকত ওসমান অসামান্য শিল্পকুশলতার পরিচয় দিয়েছেন। বিশেষত তার চরিত্রের পরিবর্তন, জীবনের এক একটি পর্যায়ে তার কষ্ট সহিষ্ণুতা, সংগ্রামশীল দৃঢ় মনোবল, মর্যাদাবোধ দরিয়া বিবিকে মহীয়সী নারীতে পরিণত করেছে।
ক্রমে সংসারের ভবিষ্যত ধূসর হতে থাকে। অভাবক্লিষ্ট সংসারে পুত্র-কন্যা নিয়ে দরিয়া বিবি যখন বিপর্যস্ত, সুযোগ সন্ধানী ইয়াকুব অঢেল অর্থ নিয়ে দরিয়া বিবির সংসারে প্রবেশ করে। ইয়াকুব, আলী আজহারের ফুফাতো ভাই। সে হিসেবে দেবর-ভাবী সম্পর্ক ধরে এবাড়িতে আসে। আসার সময় আনাজ-তরকারি থলে ভরে নিয়ে আসে। অন্তহীন অভাব সত্ত্বেও দরিয়া বিবি ইয়াকুবের দেওয়া অনাজ-তরকারি আস্তাকুড়ে ফেলে দেয়। তার সাহস ও মনোবল তবু দৃঢ় থাকে।
অভাবের অজগর দরিয়া বিবিকে ক্রমে গ্রাস করে। পুত্র স্নেহে অন্ধ দরিয়া বিবি শেষ পর্যন্ত অনন্যোপায় হয়ে মোনাদিরের লেখা পড়ার খরচ চালানোর জন্য ইয়াকুবের কাছে যায়। দুর্দিনেও মোনাদিরের চিঠি আসে। সে লিখেছে
‘বহুদিন বহুজায়গায় ঘুরিয়া আমি এখন স্কুলে পড়িতেছি। পাঁচ টাকা যদি আমার জন্য মাস-মাস পাঠান, কোন রকমে আমার দিন চলিতে পারে।’ (শওকত, ২০১৫:১৮৪)
মাতৃত্বের দায় ও দায়িত্বই দরিয়া বিবিকে ইয়াকুবের কাছে যেতে বাধ্য করে। প্রয়োজনের অধিক টাকাও দেয় ইয়াকুব। চাহিদার অধিক অর্থ দিয়ে সে আসলে সাহায্য করেনা, লম্পট ইয়াকুব দরিয়া বিবির হৃদয় জয়ের চেষ্টা করে। টাকা হাতে পেয়ে দরিয়া বিবির মুখে হাসি ফোটে। ‘নারীবাদীরা বলেছেন নারীর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতাই নারীকে নারী করে রেখেছে।’ (মাসুদুজ্জামান, ২০০৭:১৬)
‘দু’দিন পর ইয়াকুব এখানে পৌঁছিল, দরিয়া বিবি তার শরণাপন্ন হইল। ভাই, আমার একটা আরজ তোমাকে রাখতে হবে। আপনার আরজ! বলুন, বলুন। ইয়াকুব ভয়ানক আগ্রহ দেখাইয়া বলিল, আপনি এত চুপচাপ থাকেন কেন?
ভাই, চুপচাপ কি সাধে থাকি। দেখছনা, কত সুখে আছি।
আপনার দুঃখ কি। আপনার মুখের হাসির দাম লাখ টাকা।’ (শওকত, ২০১৫: ১৮৫)
অন্যসময় হলে এমন গায়ে পড়া প্রশংসা দরিয়া বিবি বেয়াদবির সামিল মনে করতো। আজ তা গায়ে মাখে নি। স্বামীহীন নারীর দৃঢ়তা ও দর্প ক্রমে শিথিল হয়ে আসে। অভাবের কাছে, ক্ষুধার কাছে, সবই তুচ্ছ, পরাজিত হয়। অভাবে নষ্ট হয় স্বভাব। সন্তানদের প্রয়োজনে ইয়াকুবের দয়া ও দান নিরবেই গ্রহণ করে দরিয়া বিবি।
মাতৃত্বের কাছে পরাজিত হয় ব্যক্তিত্ব। ইয়াকুবের দানে ও ঋণে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরা পড়ে দরিয়া বিবি। দর্পের দেয়াল ভেঙ্গে পড়ে। শুধু তাই নয়, ইয়াকুবের ঋণ থেকে মুক্তির দায়ও অনুভব করে দরিয়া বিবি। স্বামীহীনা নারীর উপবাসী মনে নারীত্বের অনুভূতি দোল খায়। দরিয়া বিবির শারীরিক-জৈবিক, যৌনতা ও যৌনতত্ত্ব তার অবস্থানগত কারণে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাড়ায়। নারীবাদী ধারণায় ইয়াকুব আর দরিয়ার শিশ্নকেদ্রিক অবস্থান স্পষ্ট। ‘জেন্ডাতত্ত্বে পুরুষের অবস্থান বিশেষভাবে নির্ধারিত। ইতিহাসই বুঝিয়ে দেয়, পুরুষের অধিকার সার্বিক। তাই পুরুষ সাহসি- যে সাহসিকতা হলো একই সঙ্গে নৈতিক ও শারীরিক।’ (মাসুদুজ্জামান, ২০০৭: ৩১) দরিয়া বিবির দিকে তাকায় ইয়াকুব। সে দৃষ্টি দরিয়া বিবির নারীত্ব তত্তায় আন্দোলন জাগায়-
‘ইয়াকুব তার আগমনের পথে অথবা নিতম্বের দিকে চাহিয়া আছে। কিন্তু তার দৃষ্টি শোভন মনে হয় না। পানের বাটার নিকট ফিরিয়া আসিয়া দরিয়া বিবি সংকুচিত। চোখাচোখি সে ইয়াকুবের দিকে তাকা। … অবসর সময় তার মনে আন্দোলন জাগে। আসলে লোকটা খারাপ না। তবে অমার্জিত রুচি।’ (শওকত, ২০১৫:১৫০)
ইয়াকুবের লোলুপদৃষ্টি দরিয়া বিবির চোখ এড়ায় না বরং প্রশ্রয় দেয়, সে প্রশ্রয়ই ইয়াকুবকে সাহসী করে তোলে। স্বামীর শয্যায় অভ্যস্ত নারী দরিয়া বিবির নারীত্বের ক্ষুধা কি জেগে ওঠে শরীরে? নাহলে হন্তারক দুপুর কি করে উপস্থিত হয়? বাইরে বৈশাখের উত্তপ্ত দিন। ক্লান্ত শরীরে বেশ ঘুম ধরে ছিল
‘কিন্তু ঘুম তাহার আবার আচমকাই ভাঙ্গিল। দরিয়া বিবি হঠাৎ অনুভব করে, কার যেন গভীর আলিঙ্গনে সে একদম নিস্পিষ্ট। চোখ খুলিয়া দেখিল, ইয়াকুব। … বাঁশের দরজা খোলা ছিল, এখন বন্ধ। দরিয়া বিবির মনে হয় হঠাৎ যেন ঠান্ডা হইয়া আসিতেছে তার সমস্ত শরীর। আর একজনের উত্তপ্ত নিঃশ্বাস শুধু নাকে লাগিতেছে।… নিস্তেজ নিথরতায় দরিয়া বিবি চুপ করিয়া রহিল। আর চোখ খুলিল না। সে যেন অন্ধ হইয়া গিয়াছে।’ (শওকত, ২০১৫: ১৯০)
ঘটনা হয়ত আকস্মিক, ঘুমন্ত অবস্থায় ইয়াকুব দরিয়াকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করে দখল নেয়। কিন্তু ‘চোখ খুলিয়া দেখিল, ইয়াকুব।’ পুরুষ প্রকৃতিগতভাবে বেশি সক্রিয়, যেমন যৌনক্ষেত্রে সে নারীর মধ্যে নিজেকে প্রবেশ করিয়েই মানব শিশুর জন্ম দেয়। অন্যদিকে নারী পুরুষের তুলনায় নিস্ক্রিয়, সে শুধু নিজের মধ্যে পুরুষকে প্রবেশ করায়। (মাসুদুজ্জামান, ২০০৭: ১৬)
ইয়াকুবকে দেখার পরও দরিয়া কেন নিশ্চুপ এবং প্রতিক্রিয়াহীন ছিল?
আমরা দেখি দরিয়ার শরীর ‘ঠান্ড’ হয়ে আসছে। সঙ্গম সুখ কি তাকে ‘নিথর’ এবং ‘চুপ’ করিয়ে দিয়েছিল? এপ্রশ্ন মোটেই অবান্তর নয়। কারণ, আমরা দেখছি সে ‘আর চোখ খুলিল না।’ দরিয়া বিবি চোখের পাতা বন্ধ রাখার অর্থ তার শারীরিক তৃষ্ণায় অবগাহন। তৃপ্তি ও সুপ্তিতে সে এতোই বিভোর ছিল যে, চোখ খুললে সে সুখ উবে যেতে পারে। প্রসঙ্গত, ফ্রয়েড বলেছেন, মানুষের প্রাত্যহিক জীবন তার যৌবচেতনা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।’ ফ্রয়েডের এ ধারণা আসলেই বিপ্লবাত্নক। ফরাসী দার্শনিক জ্যাঁক লাকাঁ বলেছেন, নারীত্বের ব্যাপারটা অপ্রতিনিধিত্বশীল এবং উপস্থাপনা করা যায় না। নারীর যৌনতা বা শিশ্নের ‘জুইসঁস’ পরমসুখ পাওয়াটাই বড় কথা। তাই ‘নারী’ কথাটাকে ঘিরে পুরুষ রহস্যের মধ্যে ডুবে থাকে (মাসুদুজ্জামান, ২০০৭:২০)। ইয়াকুবও দরিয়া বিবির অপার নারীত্বে ডুবে যায় এবং ঘুমন্ত দরিয়া বিবিকে ‘আলিঙ্গনে’ ইয়াকুব করায়ত্ত করে ফেলে। দরিয়া বিবি ‘চোখ খুলিলনা’ দ্বারা শিশ্নের পরমসুখের ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যা শরীর কেন্দ্রিক নারীত্বেরই একটি সত্তা। হেগেল যেমন বলেন, আত্ম-অন্য’র (সেলফ-আদার) বৈপরীত্যসূচক ধারণাই আমাদের সমস্ত সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে। সামাজিক ক্ষমতার কাঠামো ঐতিহাসিকভাবে তৈরি হয়েছে যে, সমাজে পুরুষ-উঁচু, নারী-নিচু অবস্থান। যদিও স্যামঁন দ্য বোভেয়া সমাজে নারী-পুরুষের এই অবস্থানগত পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
সমাজে যেহেতু পুরুষ পরিচয়কে নির্দিষ্ট করে দিয়েছে, ফলে নারী সঙ্গে পুরুষের সম্পর্ক টানাপোড়েন বা বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। নারী তার সুনির্দিষ্ট যৌন-পরিচয় দ্বারা নিজের আত্মপরিচয় জানার, বোঝার চেষ্টা করেছে। নারীর অভিজ্ঞতা এভাবে নারীবাদীদের ডিসকোর্সে পরিণত হয়েছে।
‘জননী’ উপন্যাসে ইয়াকুবও সমাজ নির্ধারিত পুরুষ পরিচয়ে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে সন্তানের জন্ম দেয় কিন্তু সন্তানের দায় তাকে বহন করতে হয় না। সে দায় দায়িত্ব অনিবার্যভাবে জননী দরিয়া বিবিকে নিতে হয়। কারণ, সে রক্তে ও শরীরে ধারণ করেছে অমৃতের ফল। সে হয়ে ওঠে জননী। যোনি-জনন+ঈ ‘জননী’ থেকে ‘জন্ম’ শব্দের অর্থ মাতৃ জঠর থেকে নির্গত হওয়া, ভূমিষ্ঠ হওয়া, উৎপত্তি, উদ্ভব, আবির্ভাব বোঝায়। দরিয়া বিবিও জননী হয়। উদ্বেগের সড়ক বেয়ে সেই রাত্রি আসে-অন্ধকার যার লীলাভূমি।
যদি দিনের বেলায় প্রসব বেদনা শরু হতো, তবে এতো মানুষের সামনে, পুত্র-কন্যার সামনে কোথায় মুখ লুকাতো। বেদনা শুরু হয় রাতেই। দরিয়া বিবি নিঃশ্বাস চেপে রান্না ঘরে ঢুকে ভেতর থেকে অর্গল বন্ধ করে দেয়। হাতের প্রদীপটা নামিয়ে মাদুর বিছায়। প্রসবা জননীর স্ফীত পেট প্রদীপের আলোয় উজ্জ্বল দেখায়। মাদুরে উপুড় হয়ে পড়ে। প্রসবজনিত চিৎকারের স্বাধীনতা পেলে ভালো হতো কিন্তু দরিয়া বিবির সেই স্বাধীনতা নেই। বেদানায় মুখ কুঞ্চন করে। মাটির কন্যা জননীর আশ্রয় ছাড়া উপায় নেই। এক হাত পেছনে দেয়, হাত পিছলাইয়া যায়। বাহিরে তার জন্য কত অপমান, লজ্জা, ধিক্কার অপেক্ষা করছে।
‘আজ বিজয়িনীর মতো দরিয়া বিবি ধাত্রী ও প্রসূতি হইয়া যায় একত্রে। নিজেই নিজের শরীরের উপর অসম্ভব ঝাঁকুনি প্রয়োগ করে সে। … দেড় ঘন্টা কেমন করিয়া কাটিল বিধাতা জানেন। … মাটির গামলা ও পানি পূর্বেই রাখা ছিল। … তাড়াতাড়ি নিজে পরিষ্কার হইয়া তার নবতম অতিথিকে মাই খুলিয়া দিল। কি সুন্দর চুকচুক শব্দ হয়। কি মোটাতাজা গৌররঙ শিশু। শিশুর মুখের দিকে চাহিয়া থাকিতে থাকিতে হঠাৎ কয়েকটি অশ্রু পড়িল অলক্ষিতে।’ (শওকত, ২০১৫:২০৫)
উপর্যুক্ত বর্ণনায় ‘জননী’ হিসেবে দরিয়া বিবির ভূমিকা তুলনাহীন। মাতৃত্বের হৃদয় উজাড় করা সবটুকু মমত্ব ও কর্তব্য ঢেলে দিয়েছে দরিয়া বিবি। শর্ত ও স্বার্থহীন জননীর এভালোবাসা, লোকচক্ষুর আড়ালেই থাকে। বাহিরের পৃথিবী তা মনে রাখেনা, ভুলে যায়।
শওকত ওসমান ‘জননী’ উপন্যাসে দরিয়া বিবির মাতৃত্বকে মহান মর্যাদার উচ্চকিত কওে অঙ্কন করেছেন। কেননা জননী দরিয়া বিবি হচ্ছে কলঙ্কিত মা। সমাজ অনুনুমোদিত, নিন্দিত পথে সে সন্তানের জন্ম দিয়েছে। দরিয়া বিবি জানে, সমাজ তার এই মাতৃ পরিচয়কে মেনে নেবে না। এমনকি পেটের সন্তানও মায়ের নিন্দিত পরিচয়কে মেনে নেবেনা। কারণ, পিতৃতান্ত্রিক সমাজে ‘মা’ চরিত্রটি বড়বেশি আইডিয়ালাইজ বা আদর্শায়িত। ‘মা’ চরিত্রকে সবচেয়ে নিষ্কলুষ, পবিত্র ধারণা নিয়ে সন্তান বড় হয়। মা সম্পর্কে কোনো অপকথা বাঙালি সন্তান সহ্য করে না। অশিক্ষিত গ্রাম্য নারী হলেও দরিয়া বিবি এই সামাজিক, নৃতাত্ত্বিক কারণগুলো বুঝে ছিল।
সেই লজ্জা ও গ্লাণির কথা ভেবেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ত্বরিত।
‘ভোর হইয়া আসিয়াছে। … গরুর দড়িগাছি দরিয়াবিবি নিজেই মাচাঙে দাঁড়াইয়া চালে টাঙ্গাইল। … আর দেরি করা চলেনা। … দড়ির ফাঁসের দিকে দরিয়া বিবি তাকাইল। সারাজীবনে কত উদ্বেগ, কত সংগ্রামজনিত ক্লান্তি ওইখানে ঝুলাইয়া রাখিয়া আজ সে নিশ্চিত হইতে চায়। তার আগে দরিয়াবিবি ডিপা নিভাইয়া ঘর অন্ধকার করিয়া দিল।’ (শওকত, ২০১৫:২০৬)
দারিদ্র্য-লাঞ্ছিত গ্রামীন নারী, লজ্জিত জননী, তার মুখ লুকাবার জায়গা এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে কোথায়? সমাজ সে জায়গা রাখেনি। তাই কলঙ্কিত জননী আত্মহননে বাধ্য হয়। মৃত্যুর কোমল কাপড়ের আড়ালে জননী দরিয়া বিবি মুখ লুকায়। তবু মাতৃত্বের মহান মূর্তিকে সে অক্ষুন্ন রাখে। কেননা, অবৈধ সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত সে অপেক্ষা করে। সমাজ অনুনুমোদিত হলেও অনাগত সন্তান নিষ্পাপ, নিষ্কলুষ। তাই নিজেই প্রসূতি, নিজেই ধাত্রী হয়ে সে সন্তান ভূমিষ্ঠ করায়। তাকে প্রয়োজনীয় শুশ্রুষা দেয়, বুকের দুধ খাওয়া, রঙিন কাঁথায় ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে আত্মহত্যা করে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে কলঙ্কিনী জননীর হয়ত স্থান নেই কিন্তু তার সন্তানের জায়াগ নিশ্চয় করে দেবে সমাজ?
অর্থাৎ দরিয়া বিবির নারী-সত্তা তাকে বাঁচার জন্য প্রলোভিত করলেও মাতৃত্ব-সত্তা তাকে বাঁচতে দেয় না, বরং আত্মহননের দিকে ঠেলে দেয়। সন্তান বাৎসল্য তাকে মহিয়ান করে সত্য কিন্তু তার আত্মত্যাগ ও গৌরবকে স্বীকার করেনা। শওকত ওসমানের ‘জননী’ উপন্যাসে দরিয়া বিবির নারীত্ব ও মাতৃত্ব, এই দুই সত্তার টানাপোড়েন ও অন্তর্বেদনা প্রগাঢ়ভাবে রূপায়িত হয়েছে। বাংলা উপন্যাসে যা বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
দরিয়াবিবি নিজের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শাশ্বত জননীত্বকে জয়ী করেছে।