লটারিতে না আসা শিক্ষার্থীদের অবস্থা কী হবে?

18

গত ২৮ নভেম্বর মঙ্গলবার বিকালে সারা দেশে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ভর্তি লটারির ফলাফল ঘোষণা হয়েছে। ঢাকায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার্থী ভর্তির ডিজিটাল লটারি কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এবং শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের ফেইসবুক পেইজে অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। লটারি হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমে ফলাফল পেয়ে গেছেন। সূত্র জানায়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) আওতাধীন ৬৫৮টি সরকারি এবং ৩ হাজার ১৮৮টি বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রথম থেকে নবম শ্রেণিতে ২০২৪ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য অনলাইনে আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হয় গত ২৪ অক্টোবর। ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত আবেদন নেওয়ার কথা থাকলেও পরে তা বাড়িয়ে ১৮ নভেম্বর করা হয়। মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) সূত্রে জানা গেছে, এবার কেন্দ্রীয় এই লটারির অধীনে আসা সারা দেশের সরকারি-বেসরকারি ৩ হাজার ৮৪৬টি বিদ্যালয়ে মোট আসন রয়েছে ১১ লাখ ২২ হাজার ৯৪টি। এসব আসনের বিপরীতে আবেদন করেছিল ৮ লাখ ৭৩ হাজার ৭৯২ জন ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থী। মোট আসনের মধ্যে ৬৫৮টি সরকারি বিদ্যালয়ে আসন আছে ১ লাখ ১৮ হাজার ১০১টি। এর মধ্যে আবেদন করেছে ৫ লাখ ৬৩ হাজার ১৩টি জন ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থী। ২০২১ এ আগে প্রথম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য পরীক্ষা না নিয়ে লটারি হত। করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে ২০২১ শিক্ষাবর্ষে সব শ্রেণিতেই শিক্ষার্থী ভর্তিতে লটারি শুরু হয়। এবারও সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলেছেন, ‘লটারির মাধ্যমে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু করায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেধার সমতা প্রতিষ্ঠা, ভর্তি কোচিং বাণিজ্য, অবৈধভাবে শিক্ষার্থী ভর্তি রোধ, শিশু মনে অতিরিক্ত পড়ালেখার চাপ কমানো, সময় ও অর্থ সাশ্রয়, পছন্দের বিদ্যালয়ে ভর্তির অশুভ প্রতিযোগিতা বন্ধ এবং শিক্ষার্থীদের যে কোনো বিদ্যালয়ে পড়ার অধিকার নিশ্চিত হয়েছে। ভর্তি প্রক্রিয়ায়ও শতভাগ নিরপেক্ষতা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। তাই ধারাবাহিকভাবে এবারও জনকল্যাণে এবং মেধার সমবণ্টন নিশ্চিত করতে সরকারি, বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দৈবচয়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থী নির্বাচন করে ভর্তির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিক্ষা উপ-মন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, সরকারি সহযোগিতা পাওয়ার পরও অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি পরীক্ষার কোচিং ক্লাস করত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তিকে কেন্দ্র করে একটা ইকনোমি গড়ে উঠেছিল। শিক্ষার্থী ভর্তি নিয়ে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান নানা ধরনের বৈষম্য করত। অনলাইন লটারির মাধ্যমে ভর্তি প্রক্রিয়া চালু হওয়ায় ভর্তি, কোচিং বাণিজ্য এবং বৈষম্য কমে এসেছে। দেশের মানুষ ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে ভর্তির এ প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন। সেই সাথে ভর্তি পরীক্ষার নামে কোচিং বাণিজ্য বন্ধ হওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরে এসেছে, কিন্তু শহরে বসবাসকারী পরিবারের সন্তানদের জন্য একধরনের দুঃসংবাদও রয়েছে। ডিজিটাল লটারি যেহেতু উন্মুক্ত এখানে গ্রাম ও মফস্বল এলাকার পরিবারের সন্তানদের জন্যও লটারিতে অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে। ফলে দেখা যাচ্ছে লটারিতে গ্রাম বা মফস্বল এলাকার অনেক সন্তান ডিজিটাল লটারিতে আসন পেয়ে যাচ্ছে, পক্ষান্তরে শহরে জীবন ও জীবিকার জন্য বসবাসরত অনেক পরিবারের মেধাবী সন্তানও লটারিতে আসন পাচ্ছে না। এতে গ্রামের চেয়ে শহরের বাসিন্দাদের বড় ধরনের সংকটে পড়তে হচ্ছে। কোমলমতি শিশু ও তার পরিবার হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছ। সামর্থবানদের অনেকে বাধ্য হয়ে প্রাইভেট স্কুল বা কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করাতে সক্ষম হলেও নি¤œ ও মধ্য আয়ের সন্তানদের অনেকে ঝরে পড়ার উপক্রম হচ্ছে। বিষয়টি উপেক্ষা করার মত নয়। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এ বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে।
এর আগে দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের একযুগে এইচএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ হয়েছে ২৬ নভেম্বর। এখন উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের অংশ নিতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিযুদ্ধে। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর সবচেয়ে কঠিন প্রস্তুতির নাম ভর্তিযুদ্ধ। আমরা চাই, সব শিক্ষার্থী কাক্সিক্ষত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হোক। কিন্তু মানভেদে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছুরা ভর্তি হতে পারে না। এটা অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এনে দেয়। প্রত্যেকেই চান, তার সন্তান সবচেয়ে ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হোক। কিন্তু দেশে এ ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা বা অসুস্থ প্রতিযোগিতা অনেক বেশি। জানা গেছে, চলতি বছর সারাদেশে এইচএসসি ও সমমানে পাস করেছেন ১৩ লাখ ৫৭ হাজার ৯১৫ জন। সারাদেশে ভর্তিযোগ্য আসনের সংকট না থাকলেও পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয় বা চাহিদামাফিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পাবে না অনেকে। ফলাফলে দেখা গেছে, সারাদেশে চলতি বছরে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৯২ হাজার ৫৯৫ জন। এই শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য থাকে মূলত সরকারি বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিযোগ্য আসন রয়েছে প্রায় ৭০ হাজার। সে হিসাবে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদেরও আসন হবে না। চলমান শিক্ষার উদ্দেশ্যের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। দেশে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ও হচ্ছে, অনেকেই সেখানে শিক্ষক হচ্ছেন- এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। প্রশ্ন উঠছে শিক্ষকদের যোগ্যতা নিয়ে। বর্তমান সরকার জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নসহ শিক্ষা ক্ষেত্রে এ সংস্কার ও গুণগত পরিবর্তন সাধনে বদ্ধপরিকর। আমরা আশা করি, ভর্তি কার্যক্রমকে বৈষম্যহীন করতে এখানে সংস্কার প্রয়োজন রয়েছে।