রোহিঙ্গা সংকট : নিরাপত্তা ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

20

ড. মো. মোরশেদুল আলম

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ পুরো এলাকাটি যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি ব্যক্তি থেকে সামষ্টিক পর্যায়েও নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। অপরাধ কর্মকান্ডের কেন্দ্র হিসেবে এলাকাটি ব্যবহার হয়ে আসছে। উদাহরণ হিসেবে ইয়াবার কথা বলা যায়। ইয়াবা পাচারের সঙ্গে জড়িত রয়েছে ৯২ শতাংশ রোহিঙ্গা এবং যার ৯৬ ভাগ ইয়াবা বাংলাদেশে প্রবেশ করে মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা টেকনাফ দিয়ে। মাদক পাচারসহ মানব পাচার, অস্ত্রযুদ্ধ, চরমপন্থা এবং সন্ত্রাসবাদ সবকিছু মিলিয়ে নিরাপত্তা ঝুঁকি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের জন্য। সীমান্তবর্তী হওয়ায় ক্যাম্পগুলোকে আন্তসীমান্ত যুদ্ধ এবং সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারেরও ঝুঁকি রয়েছে। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরে অপরাধের হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। রোহিঙ্গা শিবিরে অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত এরকম অন্তত ১৪টি দল সক্রিয় রয়েছে। তাদের যাতে শনাক্ত করা না যায় সেজন্য ওয়াকিটকি এবং মিয়ানমার পোস্ট অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশনস (এমপিটি) সিম কার্ড তারা ব্যবহার করছে। মিয়ানমারে সামরিক দমন-পীড়নের পর এবং কক্সবাজার ক্যাম্পে অবস্থানরত অপরাধীদের চাপে পড়ে হত্যা, ধর্ষণ, চোরাচালান এবং অন্যান্য অপরাধমূলক কাজের মুখোমুখি হচ্ছে সাধারণ রোহিঙ্গারা। তাছাড়া ক্যাম্পগুলোতে রোহিঙ্গা জনসংখ্যার ঘনত্বও উদ্বেগের কারণ। পর্যটনভূমি হিসেবে খ্যাত দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার রোহিঙ্গা শিবির থেকে খুব বেশি দূরে নয়। সমুদ্রসৈকত ইনানী থেকে কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের দূরত্ব মাত্র সাড়ে সাত মাইল। আর কুতুপালং থেকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের দূরত্ব মাত্র ১.৮৬ মাইল। পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে কোনো একটি অঘটন ঘটিয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা কিংবা ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পে লুকিয়ে থাকার সুবিধা রোহিঙ্গা শিবিরকে আরও ভয়ংকর করে তুলছে। ক্যাম্পের নিরাপত্তায় মোতায়েন করা হয়েছে আর্মড পুলিশ ব্যাটেলিয়ান। এদের মোতায়েন করা হলেও তাদের পক্ষে অগোছালো ক্যাম্প ও সীমান্তবর্তী এলাকায় ঘনবসতি থাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা বেশ কঠিন। তাদের আগমনের ফলে মানবিক নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, আন্তরাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্র রোহিঙ্গাদের প্রতি শকুনের দৃষ্টি দিয়ে রেখেছে। বেশির ভাগ রোহিঙ্গা পরিবারের মধ্যে কোনো পুরুষ সদস্য নেই। অধিকাংশই নারী ও শিশু। ফলে বিভিন্ন পাচারচক্র তাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে বিদেশে যৌনকর্মী এবং শিশুশ্রমিক হিসেবে পাচার করছে।
২০২১ সালে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখা রোহিঙ্গাদের অন্যতম শীর্ষ নেতা মহিবুল্লাহকে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়। ক্যাম্পে প্রত্যাবাসনের পক্ষে কাজ করা রোহিঙ্গা নেতারা সন্ত্রাসীদের মূল লক্ষ্য এবং তাদেরকে সুযোগ পেলেই পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হচ্ছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝি বা নেতা ও স্বেচ্ছাসেবক যারা প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করে ও প্রত্যাবাসনের পক্ষে কথা বলে তাদেরকে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা হত্যার জন্য টার্গেট করে। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের কারণে ক্যাম্পে বসবাসকারী সাধারণ রোহিঙ্গারা আতঙ্কের মধ্যে থাকে। ক্যাম্পে মাদক-অপহরণসহ নানা অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করলে কিংবা কোনো মামলার সাক্ষী হলেই সন্ত্রাসীরা সেসব রোহিঙ্গাদের টার্গেট করে। এতে করে বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হয় তারা। আশ্রয় শিবিরগুলো পাহাড়বেষ্টিত হওয়ায় খুনিরা খুন করে সহজে আত্মগোপন করতে পারে। অপরাধীদের বিষয়ে তথ্য প্রদান বা তাদের অপরাধ কার্যক্রমের জন্য কাউকে বাধা মনে করলে তাকেও প্রতিপক্ষ হিসেবে টার্গেট করে হত্যা করা হচ্ছে। ক্যাম্পগুলোতে প্রায় ৮০০ আখড়ায় মাদকদ্রব্য কেনাবেচায় জড়িত অন্তত পাঁচ হাজার রোহিঙ্গা। সীমান্তপথের ৩৩টি চোরাই পথ দিয়ে ইয়াবা ও আইসের বড় চালান ক্যাম্পে ঢুকছে। আইশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তথ্য মতে, দেশে বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার মাদক আসে এবং এর ৭০ শতাংশ ইয়াবা। জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থার মতে, যত মাদক বিক্রি হয় তার মাত্র ১০ শতাংশ ধরা পড়ে। বাংলাদেশে এখন প্রতিদিন ৭০ লাখ ইয়াবা বিক্রি হয়, যার আর্থিক মূল্য ২১০ কোটি টাকার মতো। রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক বেশিরভাগ সন্ত্রাসী গ্রæপের সঙ্গে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রতিনিধিদের যোগাযোগ রয়েছে বলে বিভিন্ন পত্র পত্রিকার তথ্য রয়েছে। ক্যাম্পের পরিস্থিতি অশান্ত করার জন্য সন্ত্রাসী গ্রুপকে কোটি কোটি টাকার ইয়াবা সরবরাহ করছে মিয়ানমার। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এসব সংঘাত ও খুনোখুনির ঘটনার মাধ্যমে মিয়ানমার আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে বোঝাতে চাচ্ছে যে, রোহিঙ্গারা উগ্র প্রকৃতির ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী। ক্যাম্পগুলোতে ৩২টি সন্ত্রাসী গ্রæপ ও উপগ্রæপ সক্রিয় এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন মিয়ানমার থেকে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়। কারণ মিয়ানমার চায় না যে, রোহিঙ্গারা সংঘবদ্ধ হোক। কারণ এর ফলে প্রত্যাবাসনের জন্য চাপ তৈরি হবে ও রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে চাইবে। বিশ^বাসীর নিকট রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী হিসেবে তুলে ধরা, আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়াকে ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করা এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাধাগ্রস্ত করাই হচ্ছে তাদের লক্ষ।
আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিকরা বাংলাদেশে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, পরিবেশগত ও জাতীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েক দশক ধরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশ বিভিন্ন সময়ে আহবান জানালেও মিয়ানমার তাতে সাড়া দেয়নি। এই মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নিজেদের নাগরিক বলেও অস্বীকার করে আসছে মিয়ানমার। মিয়ানমার থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচিত হলেও বাংলাদেশ সরকার তাদের রাখাইন প্রদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠী হিসেবে আখ্যায়িত করে। রোহিঙ্গাদের কারণে শুধু স্থানীয় পর্যায়ে পর্যটনের পরিবেশ বিপর্যয় এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয় হচ্ছে বিষয়টি কিন্তু এমন নয়। এটি সামগ্রিক রাষ্ট্রের জন্যও ঝুঁকি। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদে ও মর্যাদার সাথে প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ সৃষ্টিতে দ্বিপক্ষীয়, ত্রিপক্ষীয় এবং জাতিসংঘসহ অনান্য অংশীজনদের নিয়ে আলোচনা সত্তে¡ও এখনো তাদের মাতৃভূমিতে ফেরত পাঠানো যায়নি। মিয়ানমারে চলমার রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সশস্ত্র সংঘাত বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনকে আরো দুরূহ করে তুলেছে। এর ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এ পরিস্থিকি উগ্রবাদকেও ইন্ধন দিচ্ছে। এ সংকট প্রলম্বিত হতে থাকলে তা এই উপমহাদেশসহ বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তার, গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব, অপরাধ সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণসহ নিজেদের মধ্যে হত্যাকান্ডে জড়িয়ে পড়েছে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ। এর প্রধান কারণ হলো: প্রভাব-প্রতিপত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব, আর্থিক লেনদেন, প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দা সংস্থার উসকানি, মানসিক অস্থিরতা, চাঁদাবাজি, অপহরণ, নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার দ্বন্দ্ব, যোগ্য নেতৃত্বের অভাব, বেকারত্ব, মাদক ব্যবসা, মানব পাচার, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা নিয়ে দ্ব›দ্ব, জঙ্গি সংগঠনের কর্তৃত্ব নিয়ে টার্গেট কিলিং, বাদী হয়ে মামলা দায়ের, মামলার সাক্ষী হওয়া, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সহায়তা করা প্রভৃতি। ইয়াবা ও আইসের কারবার নিয়ন্ত্রণ এবং মাদকের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে আশ্রয়শিবিরে সশস্ত্রগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায়ই গোলাগুলি, খুন ও অপহরণের ঘটনা ঘটছে। প্রত্যাবাসনের বিলম্বের কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েই চলেছে। গত ৬ বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে অস্ত্র, মাদক, ধর্ষণ, অপহরণ, ডাকাতি, পুলিশের ওপর হামলা, হত্যা ও মানব পাচারসহ নানা অপরাধে মামলা হয়েছে।
মিয়ানমারে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে অপরাধ ও মানব পাচারের ঘটনা আঞ্চলিক ও বৈশি^ক নিরাপত্তার জন্য হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। মিয়ানমার ও বাংলাদেশের উপকূল থেকে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড এবং ইন্দোনেশিয়ায় রোহিঙ্গাদের মানব পাচার এখন গুরুতর সমস্যা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ২০১৯ সালের শুরু থেকে ২০২২ সালের ১৫ জুন পর্যন্ত কক্সবাজারের সীমান্ত ক্যাম্পসহ রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এরাকায় বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করে ৪,০৪৮টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্রসহ বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব আগ্নেয়াস্ত্রসহ তিন শতাধিক রোহিঙ্গা ডাকাতকে আটক করা হয়েছে; যাদের বেশির ভাগই ক্যাম্পের বাসিন্দা। ৮-এপিবিএন পুলিশ জানায়, গত এক বছরে ক্যাম্প থেকে আমেরিকার তৈরি অত্যাধুনিক এম-১৬ রাইফেলসহ ২৩০টি বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। সীমান্তের ওপার দিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বিভিন্নভাবে অস্ত্র ঢুকছে। সন্ত্রাসীরা এসব অস্ত্র দিয়ে মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজিসহ প্রভাব বিস্তারে ব্যবহার করছে। মূলত ক্যাম্পে নিরাপত্তার কাজে ব্যবহৃত ভলান্টিয়ার সিস্টেম ভাঙতে সন্ত্রাসীরা অস্ত্রের ব্যবহার করছে। স্থানীয়রা জানান, টেকনাফ ও উখিয়া মিলে বর্তমানে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা ১১লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে। অথচ এই দুই উপজেলায় স্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা পাঁচ লাখের মতো।
রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য বহুমাত্রিক সামাজিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত হুমকি সৃষ্টি করছে। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার পাশাপাশি এ অঞ্চলে বহুজাতিক নিরাপত্তা ঝুঁকিও রয়েছে। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জঙ্গি সংগঠন এবং পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য ও লন্ডনভিত্তিক কট্টরপন্থী ইসলামিস্ট সংগঠনগুলোর সংযোগ ১৯৭৮ সাল থেকে। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী সংগঠনের হাত ধরে চোরাচালানের মাধ্যমে আসা অস্ত্র ও গোলাবারুদ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জঙ্গি সংগঠন এবং রাজনৈতিক সন্ত্রাসীদের হাতে এসেছে এমন সন্দেহ পোষণ করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে আরসা, রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও), ইসলামী মাহাজ, জমিওয়াতুল মুজাহিদানসহ আরো কয়েকটি সন্ত্রাসী সংগঠনের অবস্থান রয়েছে। মাদক, অস্ত্র চোরাচালান, মানবপাচার, ডাকাতি, ছিনতাইসহ সব ধরনের অপরাধে রোহিঙ্গারা জড়িত। রোহিঙ্গাদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে গোষ্ঠীস্বার্থ অর্থাৎ অস্ত্র চোরাচালান, মানবপাচার, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি ইত্যাদির মাধ্যমে বিপুল অর্থ সম্পদের মালিক হয়ে বিলাসবহুল জীবন যাপন করছে। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো নিজেদের হীনস্বার্থ চিরস্থায়ী করার জন্য কক্সবাজার থেকে রোহিঙ্গারা যেন মিয়ানমারে ফেরত না যায় তার জন্য সবরকম অপকর্মে লিপ্ত আছে। নিরাপত্তার হুমকিটি আরো বিপজ্জনক। কারণ স্থানীয় প্রভাবশালী লোকজন এবং প্রশাসনের অসাধু ব্যক্তিদের সহায়তায় রোহিঙ্গারা জাতীয় পরিচয়পত্র ও বাংলাদেশি পাসপোর্ট পেয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া স্থানীয় লোকজনের সাথে বিয়ের মাধ্যমে অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশি নাগরিক হচ্ছে। ভৌগোলিকভাব ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ এবং ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্ট’-এর মাঝে অবস্থিত হওয়ায় বাংলাদেশ মানব পাচারের জন্য একটা আদর্শ রুট। একইভাবে এই অঞ্চল ক্ষুদ্রাস্ত্র পাচারের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চক্র প্রান্তিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মাদক ও ক্ষুদ্রাস্ত্র পাচারের বাহক হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। এতে করে নতুন মাদকচক্র এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠী গড়ে উঠছে। এর ফলে মাদক ও অস্ত্র আরও সহজলভ্য হয়ে উঠছে, যা আন্তরাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সীমান্তবর্তী রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর এমন বিপর্যয়কর পরিস্থিতি বিবেচনা করে কিছু বাস্তবধর্মী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। সীমান্তপ্রাচীর ও ওয়াচ টাওয়ারের মাধ্যমে ক্যাম্পে নজরদারি বাড়াতে হবে। ক্যাম্প ও সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর প্রভাব এখনও ক্যাম্পে রয়েছে। এ ধরনের ঘটনা কমাতে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের নেতাদের ভূমিকা বাড়াতে হবে। ভাসানচরে আরও রোহিঙ্গা স্থানান্তরের উদ্যোগ ত্বরান্বিত করতে হবে। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু না হওয়া পর্যন্ত ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া স্থানান্তর প্রক্রিয়ার আলোকে আরও রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সম্ভাব্যতা খুঁজে বের করতে হবে। মিয়ানমারের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে, অদূর ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা ক্ষীণ। প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘ ঘোষিত ‘নিরাপদ স্বর্গ’ তৈরির বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ভাবতে হবে। ক্যাম্প এবং সীমান্তের নিরাপত্তাহীনতা মানে, গোটা দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের নিরাপত্তাহীনতা। সীমান্তবর্তী রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো প্রতিনিয়ত অপরাধমূলক কর্মকাÐ পরিচালনার ঘাঁটি হয়ে ওঠার পাশাপাশি আঞ্চলিক নিরাপত্তায় হুমকি তৈরি করছে। বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বাস্তব চিত্রটি সামনে এনে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের এখনই উপযুক্ত সময়। রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের চারদিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরাপত্তা বেষ্টনী নির্মাণ, ক্যাম্পের অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায়ীদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রাখা, সীমান্তে কঠোর নজরদারি অব্যাহত রাখা, উখিয়া থেকে টেকনাফ রাত্রিকালীন যৌথ টহল জোরদার, নয়াপাড়া ও হোয়াইক্যং ক্যাম্পের জন্য জমির জটিলতা দূর করতে ব্যবস্থা নেওয়া, মিয়ানমার থেকে নতুন করে যেন অবৈধভাবে কেউ প্রবেশ করতে না পাওে সেদিকে কঠোর নজরদারি, কোনো অবস্থায়ই রোহিঙ্গাদের কাছে সিম বিক্রি না করতে পারে সেজন্য কোম্পানিগুলোকে নির্দেশ দেওয়া এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্যোগ নিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রভৃতি।

লেখক : শিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়