রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ভূমিকা নিন জাতিসংঘের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর এ আহবান যথার্থ

7

পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে দেশটির সামরিক বাহিনী কর্তৃক নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সর্বশেষ শ্রোতটি আসছিল ২০১৭ সালের আগস্টে। গত চার দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় আশ্রয়প্রার্থী শরণার্থী ছিল এ রোহিঙ্গারা। এর আগে আরো প্রায় ৫লাখ লোক দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলা এলাকায় শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। মিয়ানমার সরকার আগের আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ফেরৎ নেয়ার প্রতিশ্রæতি রক্ষা না করে উল্টো জাতিগত নিধন চালিয়ে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিশাল একটি দলকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাদ্য করে। বাংলাদেশ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সাময়িকভাবে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলেও আশা করা হয়েছিল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় মিয়ানমার জাতিগত অধিকার দিয়ে রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশে ফেরৎ নেবে। কিন্তু সর্বশেষ রোহিঙ্গা দেশত্যাগ করে বাংলাদেশে আশ্রয়ের পাঁচবছর পূর্তি হলেও মিয়ানমার সরকারের টনক নড়েনি। তারা বারবার বাংলাদেশের সাথে করা চুক্তি বা সমঝোতা লঙ্ঘন করে নানা কৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছে রোহিঙ্গাদের ফেরানোর বিষয়ে। অতি সম্প্রতি মিয়ানমার সরকার বাংলাদেশ সীমান্তে বিদ্রোহীদের দমনের নামে যে অস্থিরতা সৃষ্টি করে চলছে তাতে শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্ব সম্প্রদায়ক উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। তাদের নিক্ষিপ্ত গোলাবারুদে স্কুলের শিক্ষার্থীসহ বেশ কয়েকজনের হতাহতের ঘটনায সীমান্তজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ সরকার তীব্র পতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে মিয়ানমারকে সীমান্ত উত্তেজনা বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে। মিযানমারের অতি বাড়াবাড়ির মধ্যেও বাংলাধেশ সরকারের ধৈর্য, সহনশীল মনোভাব এবং শান্তিপূর্ণ উপায় অবলম্বন বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে নিঃসন্দেহে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, ‘আমাদেও সামর্থের ঘাটতি নেই, কিন্তু আমরা মিয়ানমারের সাথে যুদ্ধ করবনা’। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারের সীমান্ত উত্তেজনাসহ রোহিঙ্গাদের ফেরানোর বিষয়টি জাতিসংঘে উপস্থাপন করলে বাংলাদেশকে সমর্থন জানাবে বলে আশ্বস্ত করেছেন। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক অর্জন নিঃসন্দেহে। আশার কথা আমাদের প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়টি নিয়ে জোর তৎপরতা শুরু করেছেন। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে এবং এ সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক স¤প্রদায় ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোকে আরও জোরালো ভূমিকা রাখার আহŸান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত মঙ্গলবার সকালে নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপো গ্র্যান্ডি সাক্ষাৎ করেন। এ সময় শেখ হাসিনা এ আহŸান জানান। এ বিষয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন সাংবাদিকদের বলেছেন, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের মাধ্যমেই রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান করা সম্ভব বলে প্রধানমন্ত্রী তার মতামত পুনর্ব্যক্ত করেন। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে একমত পোষণ করেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রসিকিউটর করিম এ এ খান। তিনি বলেন, এ সময় বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মধ্যে সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের পক্ষে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে চলমান সব প্রচেষ্টার প্রতি বাংলাদেশের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রসিকিউটরকে আশ্বস্ত করেছেন। আইসিসি প্রসিকিউটর করিম খান আগামী বছরের শুরুতে পুনরায় বাংলাদেশ সফরের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী ও ফিলিপো গ্র্যান্ডির সাক্ষাতে বাংলাদেশের কক্সবাজার ও ভাষানচরে আশ্রিত জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সহায়তায় ইউএনএইচসিআর-এর বর্তমান কার্যক্রমগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। মোমেন বলেন, প্রধানমন্ত্রী বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন ও এ সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক স¤প্রদায় ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর আরও জোরদার ভূমিকা পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আমরা আশা করি, জাতিসংঘ রোহিঙ্গা বিষয়ে তাদের অবস্থান আরো স্পষ্ট করবে। ২০২১ সালে বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে জাতিসংঘের রোডম্যাপ দাবি করেছিল। এখনও পর্যন্ত নৈতিকভাবে জাতিসংঘ বাংলাদেশের সাথে একাত্ম থাকলেও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।