রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আবারো আগুন, পুড়ল ২৯টি ঘর

9

উখিয়া প্রতিনিধি

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একের পর এক অগ্নিকান্ড সংঘঠিত হচ্ছে। সপ্তাহ পার হতে না হতেই আবারো ক্যাম্পে আগুনে পুড়েছে ২৯টি ঘর। গতকাল সোমবার দিবাগত রাত ২টার দিকে ক্যাম্প-৫ এর মেইন ব্লক-বি, সাব ব্লক-বি/৩ এবং ডি/২তে এই অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। এতে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) অধিনায়ক মো. নাইমুল হক এ খবর নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, ইরানী পাহাড় পুলিশ ক্যাম্পের আওতাধীন মেইন ব্লক-বি, সাব ব্লক-বি/৩ এবং ডি/২ তে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। ওই আগুন ছড়িয়ে সাব ব্লক-বি/৩ এর ২৫ টি এবং ডি/২ এর ৪টি ঘর সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। অগ্নিকান্ডের কারণ জানা যায়নি। বর্তমানে আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন ম্যানেজার এমদাদুল হক। তিনি বলেন, অগ্নিকান্ডের খবর পাওয়ার পরপরই ক্যাম্পে পৌছে আগুনে নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হই।
উল্লেখ্য, গত বছরের ২২ মার্চ রাতে উখিয়ার ৮ ও ৯ নম্বর ক্যাম্পে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে বহু বসতবাড়ি পুড়ে যায়। নিহত হন ১৫ রোহিঙ্গা। গত ২ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৭টার দিকে অগ্নিকান্ডে বালুখালী ক্যাম্পের জাতিসংঘের অভিবাসন বিষয়ক সংস্থা (আইওএম) পরিচালিত করোনা হাসপাতাল ও পাশের কয়েকটি বসতি পুড়ে যায়। সর্বশেষ গত ৯ জানুয়ারি বিকালে উখিয়ার ১৬ নম্বর শফিউল্লাহ কাটা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ঘটে। এতে প্রায় ৫শ’ ঘর পুড়ে যায়।
রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে অগ্নিকান্ড বেড়েই চলেছে। এতে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে। বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি। রোহিঙ্গা নেতাদের অভিযোগ, শরণার্থী শিবিরগুলোতে বারবার অগ্নিকান্ড ঘটলেও তা প্রতিরোধে শক্ত কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে শিবিরে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা বাড়ছে। প্রতিবছর শিবিরে ৫০-৬০টি মতো অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা বলছেন, আগুন লাগার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করার মতো ‘প্রযুক্তি’ তাদের হাতে নেই। তবে আগের চেয়ে অগ্নিকাÐ কমেছে।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে ৬৫টি অগ্নিকাÐ ঘটেছে। ২০২০ সালে ঘটেছিল ৮২টি। যদিও রোহিঙ্গাদের হিসাবে এই সংখ্যা আরও বেশি।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উখিয়া স্টেশনের কর্মকর্তা মো. এমদাদুল হক জানান, আগুন লাগার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা খুবই কঠিন। দেশে সেই প্রযুক্তিও নেই। অগ্নিকান্ডের পর ক্ষয়ক্ষতি ও ঘটনাস্থল বিশ্লেষণ করে ঘটনার কারণ অনুমান করা হয়ে থাকে।
তিনি আরও জানান, মূলত রোহিঙ্গাদের অসাবধানতার কারণে ক্যাম্পে শীত মৌসুমে এ ধরনের ঘটনা ঘটে। সবাইকে আরও বেশি সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। তবে আগের তুলনায় শিবিরে আগুন লাগার ঘটনা কমেছে।
সাধারণ রোহিঙ্গারা বলছে, শিবিরে বারবার আগুন লাগার পেছনে অন্য কোনও কারণ আছে। তবে এটা সত্য, কিছু ঘটনা রোহিঙ্গাদের অসাবধানতার কারণে ঘটছে। কর্তৃপক্ষের উচিত ক্যাম্পে আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে তাৎক্ষণিক নেভানোর ব্যবস্থা রাখা। এছাড়া আগুন লাগার ঘটনায় তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন করা দরকার। এছাড়া আগুনের ঘটনা থামবে না।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের টেকনাফ স্টেশনের কর্মকর্তা মুকুল কুমার নাথ জানান, বেশিরভাগ শিবির পাহাড়ি এলাকায় হওয়ায় আগুন নেভানো কঠিন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি ঝুপড়িঘর ও ঘনবসতির কারণে দ্রæত আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
উখিয়ার বালুখালীর একটি শিবিরে ২০২১ সালের ২২ মার্চ আগুন লেগে শিশুসহ ১১ জনের মৃত্যু হয়। আশ্রয় হারায় প্রায় ৪৫ হাজার শরণার্থী। তবে সেই সময় জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর মৃতের সংখ্যা ১৫ জন উল্লেখ করেছিল। এরপর আগুন লাগার ঘটনাটি ‘পরিকল্পিত’ বলে অভিযোগ করেন ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গারা।
রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করে এমন একটি সংগঠনের কর্মী জানান, আশ্রয়কেন্দ্রে কিছু খারাপ লোক রয়েছে, যারা আগুন লাগার ঘটনায় জড়িত। তারা চায় এখানে সবসময় অশান্ডি থাকুক। তাছাড়া কিছু ঘটনা রোহিঙ্গাদের অবহেলার কারণেও ঘটে থাকে। ফলে শিবিরে আগুন লাগার ঘটনা ঠেকাতে কর্তৃপক্ষের পরিকল্পিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।
সম্প্রতি আন্ডর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডবিøউ) জানায়, শিবিরে আগুন লাগার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ২০২১ সালের প্রথম চার মাসে ৮৪ বার আগুন লাগে, যা আগের বছরের মোট সংখ্যার চেয়ে বেশি। এতে অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন, গৃহহীন হয়েছেন কয়েক হাজার রোহিঙ্গা।
এইচআরডব্লিউ বলছে, এসব ঘটনায় রোহিঙ্গাদের অবহেলার কথা যেমন শোনা যাচ্ছে, তেমনি কেউ কেউ নাশকতার কথাও বলছেন। তবে, বাস্তবে কী ঘটছে সেটা জানা যাচ্ছে না। কারণ, আগুন লাগার ঘটনাগুলো যথাযথ তদন্ত হচ্ছে না।
অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ সামছু-দ্দৌজা নয়ন বলেন, আগুন লাগার কারণ চিহ্নিত করার প্রযুক্তি আছে কিনা জানা নেই। তবে শরণার্থী শিবিরগুলোতে অগ্নিকান্ রোধে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। শফিউল্লাহ কাটা শিবিরে আগুন লাগার ঘটনায় প্রতিবেদন দেওয়া হবে।