রেকর্ড চা উৎপাদনের পর রপ্তানি বৃদ্ধির ‘রোডম্যাপ’

14

সবুর শুভ

দেশে চা চাষের ইতিহাস ১৬৮ বছরের। দীর্ঘ এই সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৯ কোটি ৬৫ লাখ কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে গত বছর। করোনা সংকটের মধ্যেও উৎপাদনে এই প্রবৃদ্ধি চা শিল্পের অমিত সম্ভাবনার কথাই বলছে। কেনিয়া ছাড়া এবার বিশ্বের চা উৎপাদনকারী দেশগুলোতে উৎপাদন কমেছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম চা উৎপাদনকারী দেশ ভারতে উৎপাদন কমেছে ১৪ কোটি ২১ লাখ কেজি। শ্রীলঙ্কায় উৎপাদন কমেছে ২ কোটি ৮৩ লাখ কেজি। দুই দেশেই উৎপাদন কমার হার ১০ শতাংশের বেশি। সে তুলনায় ভালো অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। গত বছর দেশের ১৬৭টি চা-বাগান ও ক্ষুদ্রায়তন চা-বাগানে এসব চা উৎপাদিত হয়েছে। এর আগে সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল ২০১৯ সালে। ওই বছর ৯ কোটি ৬০ লাখ কেজি চা উৎপাদিত হয়েছিল। ২০২০ সালে মহামারির প্রথম বছরে চা উৎপাদনে ধাক্কা লেগেছিল। তখন ৮ কোটি ৬৩ লাখ কেজি চা উৎপাদিত হয়। এক বছরের মাথায় উৎপাদন ১ কোটি ২ লাখ কেজি বেড়ে নতুন এ রেকর্ড হয়েছে। দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে চা রপ্তানির বিষয়টি এই শিল্পে নতুন সম্ভাবনার হাতছানি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে রোডম্যাপ তৈরি করে এগোচ্ছে সরকার।
প্রতিনিয়ত চায়ের উৎপাদন যেমন বাড়ছে দেশে চায়ের চাহিদাও তেমনি বেড়ে চলেছে। চা শিল্পের ব্যবস্থাপনায় যোগ হয়েছে ডিজিটাল কার্যক্রম। চা উৎপাদনে বাড়ছে বাগান। সম্প্রসারিত হচ্ছে চায়ের খাত। বাড়ছে বিনিয়োগও। নেয়া হচ্ছে নতুন নতুন উদ্যোগ। শুধু পাহাড়ি ভ‚মিতে নয় সমতলেও হচ্ছে চা উৎপাদন। রপ্তানি হচ্ছে বিশ্বের ২৩টি দেশে। ফলে চা শিল্পে সম্ভাবনার হাতছানি দেখা দিয়েছে। তবে মানসম্পন্ন চা উৎপাদন নিশ্চিত করতে আরও অনেকদূর যেতে হবে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। আজ ৪ জুন শনিবার জাতীয় চা দিবস। ২০২১ সাল থেকে দেশে এই দিন চা দিবস হিসাবে পালিত হচ্ছে। ১৯৫৭ সালের ৪ জুন থেকে ১৯৫৮ সালের ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত প্রথম বাঙালি হিসাবে চা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ৪ জুন বঙ্গবন্ধুর দায়িত্ব গ্রহণের দিনকে স্মারক হিসাবে এ দিনকে জাতীয় চা দিবস ঘোষণা করা হয়। এবার দিবসের প্রতিপাদ্য ‘চা দিবসের সংকল্প সমৃদ্ধ চা শিল্প’।
চা বোর্ড থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, দেশে চা বাগানের সংখ্যা ১৬৭টি। চায়ের মোট ভূমি (বাগান ও ক্ষুদ্রায়তন) ২ লাখ ৮৭ হাজার ৪২২ দশমিক ৬৯ একর। চা বাগানের মোট ভূমির পরিমাণ ২ লাখ ৭৬ ৯৬৩ দশমিক ৯৬ একর। চা বাগানের মোট চা চাষযোগ্য ভূমির পরিমাণ ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫৯৪ দশমিক ৪ একর। ক্ষুদ্রায়তন চা চাষাধীন ভূমির পরিমাণ ১০ হাজার ৪৫৮ দশমিক ৭৩ একর। ২০২১ সালে সালে একর প্রতি গড় উৎপাদন ৬৯৭ কেজি। চা বাগানের মোট শ্রমিকের সংখ্যা (২০২০ সাল) ১ লাখ ৪৩ লাখ ৯৭ জন। ক্ষুদ্রায়তন চা চাষির সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার। বেসরকারি আটটি প্রতিষ্ঠান এখন চা বাজারজাত করছে। দেশের নয়টি ভ্যালিতে (বাগান) উল্লেখযোগ্য পরিমাণে চা উৎপাদন হয়। এর মধ্যে আছে চট্টগ্রাম ভ্যালি ৯৫ লাখ ২৪ হাজার ৫৮৪ কেজি, উত্তরাঞ্চল (বাগান ও ক্ষুদ্রায়তন) ১ কোটি ৪৫ লাখ ৪৭ হাজার ১৭২ কেজি, বান্দরবান (ক্ষুদ্রায়তন) ৭ হাজার ১৪৪ কেজি, লস্করপুর ভ্যালি ১ কোটি ৩৩ লাখ ৩০ হাজার ৭৮৭ কেজি, বালিশিয়া ভ্যালি ২ কোটি ৪১ লাখ ৬ হাজার ১০ কেজি, মনু দলই ভ্যালি ১ কোটি ৪ লাখ ১৯ হাজার ৭৯৫ কেজি, লংলা ভ্যালি ১ কোটি ১০ লাখ ১৯ হাজার ২০৩ কেজি, জুড়ী ভ্যালি ৮৫ লাখ ৭০ হাজার ২৪৭ কেজি, নর্থ সিলেট ভ্যালি ৪৯ লাখ ৮০ হাজার ৬৫২ কেজি। দেশে সাধারণত পাঁচ ধরনের চা উৎপাদন হয়। এগুলো হলো- সিটিসি, অর্থোডক্স, গ্রিন টি, সিলভার টি এবং হোয়াইট টি।
দেশে উৎপাদিত চা বিশ্বের ২৩টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। ২০২০ সালে ২ দশমিক ১৭ মিলিয়ন কেজি চা রপ্তানি হয়। এতে সমৃদ্ধ হচ্ছে দেশের অর্থনীতি, বাড়ছে রাজস্ব। যেসব দেশে চা রপ্তানি হয় সেগুলো হচ্ছে, অস্ট্রেলিয়া, বাহরাইন, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড, ফ্রান্স, সাইপ্রাস, ব্রুনাই, গ্রিস, চীন, জাপান, মরিশাস, মালয়েশিয়া, কানাডা, ভারত, ইতালি, কুয়েত, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, সুইজারল্যান্ড, সলোমন আইল্যান্ড, দুবাই এবং আমেরিকা।
বাংলাদেশ চা বোর্ড বিনিয়োগ ও নতুন পরিকল্পনার মাধ্যমে সমৃদ্ধ করছে দেশের চা শিল্পকে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২০২১-২০ অর্থবছরে সরকারিভাবে বিনিয়োগ করা হয়েছে ১৬২০ দশমিক ৮৪ মিলিয়ন টাকা।
এদিকে চা বোর্ডের পরিকল্পনা শাখার তথ্য মতে, বেসরকারি ১৩টি প্রতিষ্ঠানের অংশীদারিত্বে ১০০টি এবং ৫০টি ব্যক্তি মালিকানাধীন বাগানসহ মোট ১৫০টি চা বাগান আছে। বেসরকারি ১৫০টি বাগানে ২০২১ সালের উৎপাদন মোট উৎপাদন ৮৮ দশমিক ৭৯ মিলিয়ন কেজি।
গত পাঁচ বছরে দেশ থেকে মোট ১৫০ কোটি ২৪ লাখ ৭০০ টাকার চা রপ্তানি করা হয়েছে। এই সময়ে দেশ থেকে গড়ে চা রপ্তানি হয় ২২ কোটি ৫৬ লাখ টাকার। ২০২০ সালে রপ্তানি হয় ৭৫ কোটি ৩২ লাখ ৯০০ টাকা, ২০১৯ সালে রপ্তানি হয় ১১ কোটি ৬৫ লাখ ১০০ টাকা, ২০১৮ সালে রপ্তানি হয় ৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা এবং ২০১৭ সালে রপ্তানি হয় ৩৭ কোটি ৭২ লাখ ৯০০ টাকার চা। দেশে চায়ের চাহিদা বাড়তে থাকায় দীর্ঘদিন ধরে রপ্তানি কমছিল। রপ্তানি কমতে কমতে ২০১৯ সালে ছয় লাখ কেজিতে নেমে আসে। ২০২০ সালে আবার বাড়তে শুরু করে রপ্তানি। দেশীয় রপ্তানিকারকেরা গত বছর ২১ লাখ ৭০ হাজার কেজি চা রপ্তানি করেছে। এ থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। গত দুই দশকে চা রপ্তানি আয় সবচেয়ে বেশি ছিল ২০০৮ সালে ৮৪ লাখ কেজি থেকে ৯৭ কোটি টাকা। দেশে উৎপাদিত চায়ের বড় অংশই আসে মৌলভীবাজার জেলার বাগান থেকে। মোট উৎপাদিত চায়ের ৫৫ শতাংশ উৎপাদন হয় এই জেলায়। এরপর আছে হবিগঞ্জ জেলা, যেখানে উৎপাদিত হয় ২২ শতাংশ। এ ছাড়া উত্তরবঙ্গে ১০ শতাংশ, সিলেট জেলায় ৭ শতাংশ ও চট্টগ্রামে ৬ শতাংশ উৎপাদন হয়।
এদিকে বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. আশরাফুল ইসলাম এনডিসি, পিএসসি বলেন, চা দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি পণ্য ছিল। কিন্তু নানা কারণে এটি অবহেলিত হয়েছিল। এখন আমরা চা শিল্পের হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। ইতোমধ্যে কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে এর ফলও পেতে শুরু করেছি। ফলে গত অর্থবছরে রেকর্ড পরিমাণ চা উৎপাদিত হয়েছে। এর মাধ্যমে চা রপ্তানির হারানো ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ২০১৭ সালে মন্ত্রাণালয় কর্তৃক স্বল্প-মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদী একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। আমরা সেই পরিকল্পনা মতে কাজ বাস্তবায়ন শুরু করেছি। আমাদের লক্ষ্য- প্রতিবছর ২ দশমিক ৫ একর করে চা চাষের আবাদ জমি বৃদ্ধি করা, প্রশিক্ষিত চা শ্রমিক তৈরি করা, সমতলে চা উৎপদান-প্রক্রিয়া-বিপণন বৃদ্ধি করা, ২০২৫ সালে ১৪০ মিলিয়ন কেজি চা রপ্তানি করা, নতুন নতুন ক্লোন উদ্ভাবন করা। একই সঙ্গে আমাদের বৈজ্ঞানিকরা ‘দুটি পাতা একটি কুড়ি’ শ্লোগানকে সামনে রেখে নানা উদ্ভাবনী কাজ পরিচালনা করছেন।
মেজর জেনারেল মো. আশরাফুল ইসলাম এনডিসি, পিএসসি বলেন, চা কার্যক্রমে ইতোমধ্যে অনেক কিছুই আধুনিক ও ডিজিটালাইজড হয়েছে। অনলাইনে টি লাইসেন্স সিস্টেম চালু, অনলাইনে নিলাম প্রক্রিয়া, চারটি চা বিক্রয় ও প্রদর্শন কেন্দ্র স্থাপন, দুটি কেন্দ্র থেকে নিলাম প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। তাছাড়া আমাদের মিশন হলো- চা বাগানের চা চাষযোগ্য জমি চিহ্নিতকরণপূর্বক এর সর্বোচ্চ ব্যবহার করা, ক্ষুদ্র চা চাষে উৎসাহ প্রদান, চায়ের সর্বোচ্চ মান ঠিক রেখে উৎপাদন বৃদ্ধি, চায়ের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ এবং চা রপ্তানির হারানো ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে প্রতি বছর চায়ের চাহিদা বেড়ে ১০ কোটি কেজিতে দাঁড়িয়েছে। সে অনুযায়ী চায়ের উৎপাদন ও চাহিদায় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
দেশে চা এর রাজধানী শ্রীমঙ্গল। এখানে রয়েছে অসংখ্য চা বাগানের টিলাময় সবুজ শ্যামল পাহাড়ি জনপদ। এখানকার চা শিল্পের গুরুত্ব ও পরিবেশগত তাৎপর্য বিশ্লেষণ করে শ্রীমঙ্গলেই ১৯৫৭ সালে ২৮ ফেব্রæয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট’ বা ‘বিটিআরআই’। ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনিছড়ায় প্রথম বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু হয়। ১৯৫৭ সালে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে টি রিসার্চ স্টেশনের গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করা হয়। চায়ের উচ্চফলন নিশ্চিত করতে সর্বপ্রথম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে চট্টগ্রামের কর্ণফুলি এবং শ্রীমঙ্গলস্থ ভাড়াউড়া চা বাগানে উচ্চফলনশীল জাতের চারা রোপণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ভারতবর্ষে চা আবিষ্কার, আবির্ভাব ও পানীয়রূপে চায়ের প্রতিষ্ঠা লাভের বিষয়টি ইতিহাসের এক অনন্য সামাজিক উপাদান। লোক কাহিনী অনুসারে, আকস্মিকভাবেই এই পানীয়টি আবিষ্কার করেছিলেন ২৭৩৭ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দে চীনের সম্রাট শেন নাং। তিনি বিশ্রাম নেওয়ার সময় একটি পাত্রে পানি গরম করা হচ্ছিল তাঁর ব্যবহারের জন্য। নিকটস্থ একটা গাছ থেকে হাওয়ায় উড়ে কিছু পাতা এসে ওই ফুটন্ত পানিতে পড়তে দেখেন তিনি। পানির রং তৎক্ষণাৎ বাদামি রূপ ধারণ করে। উষ্ণ পানির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তিনি তার কিছুটা পান করে বেশ চনমনে বোধ করেন। সেই থেকে চা পানের রেওয়াজ ছড়িয়ে পড়ে গোটা চীনে। আর সেখান থেকে পুরো বিশ্বে। ১৬৫০ সালে চীনে বাণিজ্যিকভাবে চায়ের উৎপাদন শুরু হয়। এই চায়ের বড় ক্রেতা হিসেবে আবির্ভূত হয় ব্রিটিশরা। কিন্তু বিনিময়মূল্যটা ছিল সোনা ও রুপায়।
চা-বাগানমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. শাহ আলম জানান, আবহাওয়ার উপর ভর করে চায়ের উৎপাদন কমে আর বাড়ে। আবহাওয়া বা প্রকৃতির ওপর কারও হাত নেই। করোনার কারণে সেভাবে উৎপাদন ব্যাহত হয়নি।