রাষ্ট্রীয় সম্মাননার আমলাতান্ত্রিকীকরণ প্রসঙ্গে

17

ডা. হাসান শহীদুল আলম

( দ্বিতীয় পর্ব )
২০১৫ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেও তা গ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন ন্যাপ সভাপতি প্রবীন রাজনীতিবিদ অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ। ২০১৬ সালের স্বাধীনতা পদক ঘোষণার ১৩ দিন পর যুক্ত হয় কবি নির্মলেন্দু গুণের নাম। স্বাধীনতাপদকের জন্য প্রস্তাবিত নামগুলো কিভাবে যাচাই-বাছাই করা হয় তা দেখা যাক। মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের জারী করা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার সংক্রান্ত নির্দেশাবলী’ অনুযায়ী একাধিক ধাপে যাচাই-বাছাই করে স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হয়।এখানে বলা আছে,মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে পরবর্তী বছরের স্বাধীনতা পুরষ্কারের জন্য প্রস্তাব আহবান করে সব মন্ত্রনালয়, বিভাগ এবং এর আগে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার বা স্বাধীনতা পুরস্কার প্রাপ্তদের কাছে চিঠি পাঠায়। নির্ধারিত যে কোন পুরস্কারের জন্য নাম প্রস্তাব করতে বলা হয় চিঠিতে। প্রস্তাবগুলো নভেম্বর মাসের মধ্যে মন্ত্রী পরিষদ বিভাগে পৌঁছাতে হয়।এরপর স্বাধীনতাপদকের জন্য প্রস্তাবিত নামগুলো ১৬ সদস্যের ‘প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত’ সচিব কমিটির মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করা হয়।উক্ত কমিটির চেযারম্যান হলেন মন্ত্রী পরিষদ সচিব যেখানে বিভিন্ন সচিব সদস্য হিসাবে থাকবেন। যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রস্তাবগুলো জাতীয় পুরস্কার সংক্রান্ত মন্ত্রীসভাকমিটির মাধ্যমে চলে যায় প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনা এবং সিদ্ধান্তের জন্য। জাতীয় পুরস্কার সংক্রান্ত মন্ত্রীসভা কমিটির বর্তমান আহব্বায়ক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। আরও ১১ জন মন্ত্রী আছেন এই কমিটিতে। কিভাবে আমলারা স্বাধীনতা পুরস্কারকে বিতর্কিত করেছিল ? এত বড় এই পুরস্কার পাওয়ার কে যোগ্য আর কে যোগ্য নয়,তা যাচাই করার মূল ক্ষমতা থাকে সচিবদের হাতে। মন্ত্রীদের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় পুরস্কার সংক্রান্ত মন্ত্রীসভা কমিটি শুধু এটা অনুমোদনের কাজ করে বলে সংশ্লিষ্টরা জানায়। ১৯৭৭ সালে প্রবর্তিত এই পুরস্কারের প্রথম বছরেই বংগবন্ধু হত্যাকান্ডের অন্যতম পরিকল্পনাকারী মাহবুবুল আলম চাষী এবং ২০০৩ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের বিরোধীতাকারী শর্ষিনার পীর মওলানা আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহকে এই পুরষ্কার দেয়া হয়েছিল। আমির হামজার নাম প্রস্তাব করেন তাঁর পুত্র,যিনি বর্তমান সরকারের একজন উপসচিব। প্রস্তাবিত সেই নাম সমর্থন করেন সরকারের আর একজন সিনিয়র সচিব। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন ভূমি সংস্কার বোর্ডের পক্ষ থেকে রইজ উদ্দিনের নাম প্রস্তাব করা হয়। ভূমি সংস্কার বোর্ড থেকে কোন রুপ যাচাই বাছাই না করেই ভূমি মন্ত্রনালয়ে সেই নাম পাঠিয়ে দেয়া হয়।
সাহিত্য জগতে পরিচয়হীন এ ব্যক্তিকে পুরষ্কার দেয়া নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়। পরবর্তীতে তাঁদের উভয়ের পুরস্কার বাতিল করা হয়। বিতর্কিত এস এম রইজউদ্দিন ও মো. আমির হামজা এই দুজনকেই পদকের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে আমলাদের মাধ্যমে। আমির হামজার মনোনয়নের কাজটি তাঁরা করেছেন একেবারে ঠান্ডা মাথায়, পরিকল্পনা করে, আমাদের সুস্পষ্ট বার্তা দেয়ার জন্য- তাঁরা চাইলে যে কাউকে যে কোন বিবেচনায় কিংবা কোন বিবেচনা না করেই যে কোন পুরস্কার দিতে পারেন,করতে পারেন যে কোন কিছু।দেখা যাচ্ছে হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত অপরাধীকেও সচিবগন দ্বারা গঠিত কমিটি স্বাধীনতা পুরস্কার পাবার জন্য মনোনীত করতে পারেন। সেই অপরাধীর সাহিত্যকর্ম মানসম্পন্ন না হলেও তিনি যেহেতু সচিবের পিতা অতএব তিনি স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য মনোনীত হতে পারেন। স্বাধীনতা পুরস্কারের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্পর্শ কাতর পুরস্কার যেন তেন লোককে দিয়ে পরে তা প্রত্যাহার করে নেয়াটা ভাল দৃষ্টান্ত নয়। এ কারণে পুরস্কারটি প্রশ্নবিদ্ধ হলো। আর এটা হয়েছে অতিমাত্রায় আমলা নির্ভরতার কারণে। এর ফলে সংস্কৃতিতে আমলাতন্ত্রের আধিপত্যের বিষয়টি স্পষ্ট হলো।
রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের রাজনীতিকরন অত্যন্ত দুঃখজনক। রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের জন্য চূড়ান্তভাবে প্রার্থী নির্বাচনকালে দেশ ও মানুষের কল্যানে অসাধারন অবদান রেখেছেন, এমন সীমিত সংখ্যক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানকে বিবেচনা করার কথা নীতিমালায় থাকলেও বেশীরভাগ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা গুরুত্ব পায় বলে অভিযোগ রয়েছে। অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও অসাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে বিতর্কিত ভূমিকা থাকা সত্তে¡ও কোন কোন ব্যক্তিকে স্বাধীনতা পুরস্কার দিয়ে পুরস্কারটিকে কলংকিত করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্মাননার বাণিজ্যিকীকরণ রাষ্ট্রীয় সম্মাননাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।জনৈক প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ননা তুলে ধরছি। ‘আমার এক বন্ধু লন্ডনে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মূল্যায়ন পেয়েছেন ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে। তিনি রানীর জন্মদিনে উচ্চ খেতাব পেয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কিশোর বয়সে যোগ দিয়েছিলেন।তিন বছর ধরে তিনি চেষ্টা করেছেন স্বাধীনতা পদক পাওয়ার জন্য। বারবারই আমি তার দরখাস্তে সই করেছি। তিনি পদক পাননি। তাকে এক আমলাকে ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে এ পদক পেতে হয়েছে (আবদুল গাফফার চৌধুরী- যুগান্তর, ১৪-০২-২২)।’
স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্তদের বাছাই করার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত মর্যাদাহানিকর। একটি ফরম দিয়ে সেখানে বাপ-দাদা চৌদ্দ পুরুষের বর্ননা দিতে বলা হয়। সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানীকে একুশে পদক দেওয়ার সময়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাঁর বাসায় ফোন করে বায়োডাটা চাওয়া হয় এমন তথ্য জানিয়েছেন একুশে পদকপ্রাপ্ত এ বিশিষ্ট ব্যক্তির পুত্র সাগর লোহানী। তিনি বলেন যে, বাবাকে যখন একুশে পদকের জন্য মনোনীত করা হয় সে সময় মন্ত্রনালয় থেকে বাসায় ফোন করে জানতে চাওয়া হয় বাবার বায়োডাটা। তখন আমরা পরিষ্কারভাবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে জানিয়ে দিয়েছিলাম ‘এই বায়োডাটা জোগাড় করা আপনাদের বিষয়। আপনারা ব্যবস্থা করবেন। আমরা কিছু দিতে পারবো না।’ একজন শীর্ষ নাট্য ব্যক্তিত্বকে বলি ‘আপনারা যদি কামাল লোহানীর কর্ম সম্পর্কে নাই জেনে থাকেন তবে দয়া করে উনার নাম মনোনয়ন তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দিন।’ অথচ একুশে পদক এবং স্বাধীনতা পুরস্কার এর জন্য যাদের নাম মনোনীত হয় তাদের পদক প্রাপ্যতার যোগ্যতার ফিরিস্তি জমা দিতে হয় বা আবেদন করতে হয় এমন নিয়ম এই দুই পদক প্রদানের নীতিমালার কোথাও নেই। মনোনীত ব্যক্তির সারাজীবনের কর্মের উপর একটি ব্রিফ তৈরী করবার দায়িত্ব বর্তায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আমলাদের উপর। কিন্তু সেইসব আমলারা নিজেদের মূর্খতা ও অযোগ্যতা ঢাকবার প্রয়াসে মনোনীত ব্যক্তির কাছে তার বায়োডাটা চেয়ে নেয়।এটি অত্যন্ত অপমানজনক এবং মর্যাদাহানিকর। কে যোগ্য তা নির্ধারন করেন আমলারা। আমলাদের দেয়া এ সব তালিকা মন্ত্রীরা বাছ-বিচারহীনভাবে মেনে নিচ্ছেন। বায়োডাটার বিষয়টি অতীতে অনেকে প্রত্যাখ্যান করলেও অধিকাংশই তালিকা থেকে নাম বাদ যেতে পারে এই আশংকায় মন্ত্রণালয় যা চেয়েছে তা দিয়েছে। যেহেতু প্রকৃতপক্ষে আমলারাই নির্বাচক তাই পদকের জন্য লালায়িত ‘মহান ব্যক্তি’রাও আমলাদের তোষামোদ করতে থাকে যাতে তার নামটি মনোনয়ন তালিকা থেকে বাদ না যায়।
স্বাধীনতা পুরস্কার সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে দেশের বরেন্য বুদ্ধিজীবী, অধ্যাপক এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে আসা উচিৎ। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন অধিদপ্তরকে আমলাতন্ত্র থেকে মুক্ত করে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। আমাদের জাতীয় পর্যায়ের পুরস্কারগুলো বিশেষ করে একুশে পদক এবং স্বাধীনতা পুরস্কারকে মন্ত্রী ও আমলাদের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা থেকে মুক্ত করে স্বতন্ত্র কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। দেশের সৃজনশীল মানুষ ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করতে হবে। সেখানে সরকারী কর্মকর্তারাও থাকতে পারেন, তবে তাঁরা শুধু সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবেন। যাচাই-বাছাই কমিটিতে এমন অন্তত তিনজন সর্বজনশ্রদ্বেয় ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তি জরুরী যাঁরা শিল্প-সাহিত্যের মান নিরুপনের যোগ্যতা রাখেন। মনোনয়নে শুধু ব্যক্তির নাম এবং কেন পুরস্কৃত হবেন তা উল্লেখ করা হবে, চৌদ্দপুরুষের বৃত্তান্ত নয়। যে সব নির্নায়কের ভিত্তিতে স্বাধীনতা পদকের প্রাপক নির্ধারিত হবেন, সুনির্দিষ্টভাবে সে সব নির্ণায়ক প্রনয়ন করে তা জনসমক্ষে তুলে ধরা হোক। এতে পুরো প্রক্রিয়ার দৃশ্যমানতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হবে। (চলবে )
লেখক: ডায়াবেটিস ও চর্মযৌনরোগে স্নাতকোত্তর
প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত চিকিৎসক, চট্টগ্রাম