রাষ্ট্রভাষা বিতর্কে বাংলা ভাষার অবস্থান ও মর্যাদা

13

মো. মোরশেদুল আলম

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলেও পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ভাষাগত ভিন্নতা ও ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতা জাতীয় ঐক্য ও সংহতি সুদৃঢ় করতে ব্যর্থ হয়। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ভাষা আন্দোলন ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে ক্রমশ দানা বাঁধতে থাকা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রথম বহিঃপ্রকাশ। এ আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদী এবং পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় এলিটদের মধ্যে এক প্রত্যক্ষ দ্ব›েদ্বর সূচনা করে। বাংলা ভাষার উপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও মুসলিম লীগ চক্রের আক্রমণ ছিল মূলত বাঙালি জাতির আবহমান ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, হাজার বছরের ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের উপর আঘাত। ভাষা আন্দোলনই ছিল এদেশের প্রথম গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং এই আন্দোলনের মধ্যে অবচেতন বাঙালির জাতীয়তাবাদী অনুভব ছিল।
পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মপ্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগে থেকেই রাষ্ট্রভাষা কী হবে তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছিল। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে পাকিস্তানের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ইসলামি আদর্শের আলোকে শিক্ষা সংস্কারের উদ্দেশে করাচিতে পাকিস্তান এডুকেশনাল কনফারেন্স আহŸান করেন। এতে উর্দুকে একমাত্র জাতীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে পূর্ববাংলার প্রতিনিধিরা এর বিরোধিতা করেন। এ সভায় পূর্ব বঙ্গের পক্ষে আবদুল হামিদ ও হাবিবুল্লাহ বাহার বাংলা ভাষাকে পূর্ববাংলার শিক্ষার মাধ্যম করার প্রস্তাব দেন। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করার প্রস্তাব করলে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ জ্ঞানগর্ভ যুক্তি দিয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পাল্টা প্রস্তাব করেন। ড. জিয়াউদ্দিনের মতামতের বিরোধিতা করে তিনি দৈনিক আজাদ পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছাড়াও ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রতি বহু লেখক তাঁদের দ্ব্যর্থহীন সমর্থন জানিয়েছিলেন। ফলে পূর্ববাংলার শিক্ষিত সমাজ এবং ছাত্রসমাজের মধ্যে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সপক্ষে প্রবল জনমত সৃষ্টি হয়। পত্র-পত্রিকায় লেখালেখির পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেও বাংলা ভাষার দাবিকে জোরদার করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানিদের অধিকাংশের মাতৃভাষা বাংলার উপর পশ্চিম পাকিস্তানিদের আগ্রাসনের কারণ হিসেবে তাঁরা যদিও ‘এক পাকিস্তানের সংহতি’র দোহাই দিয়েছিলেন, কিন্তু এর নেপথ্যে কাজ করেছিল ঔপনিবেশিক চিন্তাভাবনা। বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে যাতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ না ঘটে, সে বিষয়ে তাঁরা প্রথম থেকেই সতর্ক ছিলেন। তাঁদের মনে আশঙ্কা ছিল যে, বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা হলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে পুরো পাকিস্তানের উপর বাঙালি জাতির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হবে। তাই তাঁরা প্রথম থেকেই বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করা শুরু করেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন সরকারি ফরম, ডাকটিকিট, মুদ্রা, রেলের টিকিট প্রভৃতিতে কেবল ইংরেজি ও উর্দু ভাষা ব্যবহার করা হয়। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের বিষয় তালিকা থেকে এবং নৌ ও অন্যান্য বিভাগের নিয়োগ পরীক্ষায় বাংলাকে বাদ দেওয়া হয়। এমনকি পাকিস্তান গণপরিষদের সরকারি ভাষা হিসেবে ইংরেজি ও উর্দুকে নির্ধারণ করা হলে পূর্ববাংলার শিক্ষিত মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়।
পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে পরিলক্ষিত হয়, সমগ্র পাকিস্তানের ৫৪.৬ শতাংশ মানুষ বাংলাভাষী এবং মাত্র ৭.২ শতাংশ মানুষ উর্দুভাষী। পাকিস্তানের সমগ্র অঞ্চলের মোট সাতটি ভাষার মধ্যে বাংলা ভাষা অর্ধেকেরও বেশি মানুষের মাতৃভাষা এবং অন্য ছয়টি ভাষায় অর্ধেকেরও কম মানুষ কথা বলে। অতএব যে কোন বিচারে, যুক্তির মাপকাঠিতে এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে একমাত্র বাংলা ভাষা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়ার অধিকার রাখত। কিন্তু সমাজ ও রাজনীতির মৌলিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে পাকিস্তানের শাসকমহল ধর্মের দোহাই দিয়ে বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির উপর নগ্নভাবে আক্রমণ শুরু করে। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ২ সেপ্টেম্বর বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে ছাত্র-শিক্ষকদের যৌথ উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তমদ্দুন মজলিস’ প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদান রাখা জনমানুষের প্রথম সংগঠন হিসেবে একে চিহ্নিত করা যায়। সংগঠনটি বাংলা ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম ও আইন-আদালতের ভাষা করার পক্ষে প্রচারণা চালায়। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা-না উর্দু? শিরোনামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে সংগঠনটি।
অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি আদায়ের জন্য নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১ ফেব্রুয়ারি ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। গণপরিষদের অধিবেশন শুরু হলে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ২৩ ফেব্রুয়ারি কংগ্রেসদলীয় সংসদ সদস্য কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত একটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করে ইংরেজি ও উর্দুর সঙ্গে বাংলাকেও গণপরিষদের সরকারি ভাষা রাখার প্রস্তাব করলে ২৫ ফেব্রুয়ারি তাঁর প্রস্তাবের উপর আলোচনা হয়। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানসহ সরকারদলীয়রা এ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে প্রচন্ড ক্ষোভ প্রকাশ করেন। খাজা নাজিমুদ্দীন বলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ মানুষ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে দেখতে চায় এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার কোনো যৌক্তিকতা পূর্ববঙ্গবাসী অনুভব করে না। বস্তুত ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ এমন একটা ধারণা সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালান যে, ভাষা আন্দোলন ভারতীয় উগ্র হিন্দু নেতৃবৃন্দ দ্বারা প্ররোচিত। গণপরিষদ পাকিস্তানের সংহতি রক্ষার জন্য একমাত্র উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য অভিমত দেয়। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ২৬ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ কলেজ, মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল কলেজসহ প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে ধর্মঘট পালিত হয়। এ সময় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এবং তমদ্দুন মজলিসের যৌথ সভায় ১১ মার্চ সারা বাংলায় প্রতিবাদ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ভাষা আন্দোলনের বিস্তৃতি লাভ, বিদ্যমান রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বহুমুখী সীমাবদ্ধতা, পরিবর্তিত পরিস্থিতির বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে অনুষ্ঠিত সভায় ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। নবগঠিত এ পরিষদের আহŸানে ১১ মার্চ সারা বাংলায় প্রতিবাদ দিবস পালিত হয়। এ প্রতিবাদ দিবসে পূর্ব পাকিস্তান সচিবালয়ের প্রথম গেটের সামনে বিক্ষোভ মিছিলের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন পরিষদের আহŸায়ক শামসুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, কাজী গোলাম মাহবুব প্রমুখ নেতারা। গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ১৩ মার্চ ঢাকা শহরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পূর্ণ ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয় এবং ১৫ মার্চ পর্যন্ত ধর্মঘট অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি পেলে খাজা নাজিমুদ্দীন ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৫ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সাথে ৮ দফা সম্বলিত একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়। বাংলাকে পূর্ববাংলার সরকারি ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করার বিষয়টি প্রাদেশিক পরিষদে উত্থাপিত এবং গৃহীত হলেও ক্ষমতাসীন দল কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে সুপারিশ করার বিষয়টি এড়িয়ে যায়। ফলে পূর্ববাংলার ছাত্রসমাজ নতুন করে আন্দোলন শুরু করে। ১৭ মার্চ ছাত্ররা মিছিলসহ প্রাদেশিক পরিষদের সভাকক্ষের দিকে অগ্রসর হলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এরপর ১৯ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ ঢাকায় আগমন করেন এবং ২১ মার্চ রেসকোর্সের গণসংবর্ধনায় বক্তৃতা দেন। তিনি উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে জোর দেন এবং যারা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সংগ্রামে নিয়োজিত তাদেরকে দেশের শত্রু বলে আখ্যায়িত করেন। ফলে জনসভায় ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষ জিন্নাহ্র বক্তৃতায় বিক্ষুব্ধ হয় এবং সভার বিভিন্ন অংশ হতে মৃদু না না ধ্বনি ওঠে। বাংলা ভাষার দাবিতে ছাত্র-জনতা আন্দোলন করার কারণে নাজিমুদ্দীন সরকার আন্দোলনকারীদের ওপর যেভাবে জুলুম, নির্যাতন চালিয়েছে জিন্নাহ্ তার নিন্দা না করে বরং মুসলিম লীগ সরকারের কর্মকান্ড সমর্থন করেন। ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে ছাত্রদের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে পুনরায় জিন্নাহ্ একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বলে ঘোষণা করার সাথে সাথে উপস্থিত ছাত্ররা ‘নো নো’ বলে প্রতিবাদ করে। ২৪ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধিবৃন্দ জিন্নাহ্র সাথে দেখা করে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার যুক্তিগুলো তুলে ধরে একটি স্মারকলিপি দেন। উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রয়োজনীয়তা জিন্নাহ্ তাদেরকে বুঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রতিনিধিবৃন্দ জিন্নাহ্র যুক্তিগুলোর সাথে একমত হতে পারেননি। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ৬ এপ্রিল পূর্ববাংলার ব্যবস্থাপক সভার অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন প্রস্তাব উত্থাপন করেন যে, ইংরেজির স্থলে বাংলা রাষ্ট্রভাষা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি ও এর শিক্ষার্থীদের অধিকাংশের মাতৃভাষা হবে যথাসম্ভব বাংলা। প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দীনের প্রস্তাব কিছুটা সংশোধনীর পর পূর্ববাংলা প্রদেশে ইংরেজির স্থলে বাংলাকে সরকারি ভাষা এবং যত শীঘ্র সম্ভব এটাকে বাস্তবায়ন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অধিকাংশ স্কলারদের মাতৃভাষা হবে বাংলা এভাবে একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে পাস হয়। এভাবেই ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্বের পরিসমাপ্তি ঘটে। মুসলিম লীগের অব্যাহত ষড়যন্ত্র, সরকারের দমননীতি, পূর্ববাংলার শিক্ষিত শ্রেণির একাংশের পাকিস্তানের প্রতি অন্ধ মোহ, রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ভেতরে মতাদর্শগত বিতর্ক, ভাষা ও সংস্কৃতি ইস্যুতে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে এ পর্বের আন্দোলন এগিয়ে যেতে পারেনি।
প্রথম পর্বের আন্দোলন আপাতদৃষ্টিতে থেমে গেলেও সাময়িক স্থবিরতা কাটিয়ে আন্দোলন পুনরায় দানা বাঁধতে শুরু করে। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ২৭ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে এক সভায় উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করলে ছাত্রদের প্রতিবাদের মুখে তিনি বক্তৃতা শেষ করতে পারেননি। এ সময় বাংলা ভাষা নিয়ে আবার নতুন করে চক্রান্ত শুরু হয়। ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ৭ ফেব্রæয়ারি পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী পূর্ববাংলার ফজলুর রহমান পেশোয়ার শিক্ষা উপদেষ্টা বোর্ডের সভায় আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব করেন। এ ঘোষণা প্রচারের পরই ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীরা তীব্র প্রতিবাদ জানায়। এরপরও পাকিস্তান সরকার আরবিকে অন্যতম রাষ্ট্রীয় বর্ণমালার মর্যাদা দেয়ার উপায় বের করতে মৌলানা আকরাম খাঁর নেতৃত্বে ১৬ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ববাংলার ভাষা সংস্কার কমিটি গঠন করেন। এ কমিটি বাংলা ভাষা ব্যবহার ও প্রয়োগ সম্বন্ধে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল উদ্যোগ নেয়ার প্রস্তাব করলেও আরবি হরফে বাংলা লেখার তীব্র বিরোধিতা করে প্রতিবেদন পেশ করলে পরিকল্পনাও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
১৯৫১ খ্রিস্টাব্দের ১১ মার্চ যুবলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উদ্যোগে প্রায় অকার্যকর রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ পুনর্গঠিত করে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। বাংলা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বছর। এ বছরের ২৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন ঢাকায় আসেন। ২৭ জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে পূর্ববঙ্গের প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় খাজা নাজিমুদ্দীন বলেন, ‘কায়েদে আজম উর্দুকেই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথা ঘোষণা করেছিলেন এবং সেই অনুযায়ী উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’ নাজিমুদ্দীনের বক্তৃতা বেতারযোগে সরাসরি প্রচারিত হওয়ায় তা সমগ্র প্রদেশে ভয়ানক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ২৯ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত ছাত্র সভায় ৩০ জানুয়ারি ঢাকা শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়। এভাবে আন্দোলন ক্রমাগত শক্তিশালী হয়ে উঠার পটভূমিতে পরিবর্তিত পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ৩১ জানুয়ারি ঢাকা বার লাইব্রেরি হলে অনুষ্ঠিত এক সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ, আওয়ামী মুসলিম লীগ, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, যুবলীগ, খিলাফতে রব্বানী পার্টি প্রভৃতি দল এবং সংগঠন থেকে প্রতিনিধি নিয়ে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি করে ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। ৩০ জানুয়ারির ছাত্রসভা থেকে পরবর্তী ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়। ভাষাসংগ্রামী গাজীউল হক ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনের সভায় সভাপতিত্ব করেন। ঢাকা শহরের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী বিক্ষোভ মিছিলসহ ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘আরবি হরফে বাংলা চলবে না’ ইত্যাদি স্লোগান দিয়ে শহর প্রদক্ষিণ করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ কর্মসূচি পালন করে। ৬ ফেব্রুয়ারি করাচী থেকে প্রকাশিত ডন পত্রিকার সম্পাদকীয়তে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্ররা যে আন্দোলন করছে তাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলে আখ্যায়িত করা হয়। তবে এসময় পূর্ববঙ্গের প্রগতিশীল পত্রিকাগুলো ভাষা আন্দোলনের পক্ষে লেখনী ধারণ করে। ঢাকা থেকে প্রকাশিত ইংরেজি দৈনিক Pakistan Observer পত্রিকায় ‘Crypto Facism’ নামে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশের দায়ে পাকিস্তান সরকার ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে পত্রিকাটির প্রকাশনা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ফলে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়। ধর্মঘট শেষে ছাত্রসভা থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনের প্রস্তুতি দিবস এবং ২১ ফেব্রুয়ারি সমগ্র প্রদেশব্যাপী ধর্মঘটের আহŸান জানানো হয়। পূর্ববাংলা ব্যবস্থাপক পরিষদের বাজেট অধিবেশনের দিন থাকায় ধর্মঘটের জন্য ২১ ফেব্রæয়ারিকে বেছে নেওয়া হয়। ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল উক্ত বাজেট অধিবেশনে পরিষদের সদস্যদের সমর্থন আদায় করে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রস্তাব পাস করানোর জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করা। অত্যন্ত সংগঠিতভাবে ২১ ফেব্রুয়ারি সফল করার জন্য প্রস্তুতি চলতে থাকে। কিন্তু মুসলিম লীগ প্রশাসন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকা শহরে এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে সকল প্রকার সভা-সমাবেশ-মিছিল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রসমাজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে সমবেত হয়ে সরকারের জারিকৃত ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলার সভায় গাজীউল হক ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। ৪ থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, ফেনী, কুমিল্লা, সিলেট, দিনাজপুর, নোয়াখালী, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ প্রভৃতি স্থানে বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়। ছাত্ররা ছাড়াও সাধারণ মানুষ এসব বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দিয়ে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান দেয়। ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ব ঘোষিত সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১৪৪ ধারা জারির কারণে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে ছাত্র-জনতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সমবেত হতে শুরু করে। ছাত্ররা মিছিল নিয়ে স্লোগান দিতে দিতে প্রাদেশিক পরিষদের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে। প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের নিকট রাষ্ট্রভাষা বাংলা জানিয়ে স্মারকলিপি দেয়াই তাদের উদ্দেশ্য ছিল। পুলিশ তাঁদের বাধা দিতে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে এবং লাঠিচার্জ শুরু করে। ছাত্ররা পরিষদ ভবনের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে এবং মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের গেইট দিয়ে রাস্তায় বের হয়ে আসার চেষ্টা করলে পুলিশ গুলি চালায়। এতে আবুল বরকত, আব্দুল জব্বার, মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন, রফিক উদ্দিন আহমদ, আবদুস সালাম, শফিকুর রহমানসহ নাম না জানা বেশ কয়েকজন শহীদ হন। এছাড়াও অনেকে আহত এবং অনেকে বন্দি হন। পরবর্তী সময়ে ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দের ২৯ ফেব্রæয়ারি পাকিস্তান গণ-পরিষদে পাকিস্তান ইসলামী রিপাবলিকের প্রথম সংবিধান গৃহীত হয় এবং ২১৪ নং অনুচ্ছেদে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কো বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় বাঙালির জীবন উৎসর্গের দিন ২১ ফেব্রুয়ারির এ শহিদ দিবসকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। জাতিসংঘভুক্ত সকল স্বাধীন দেশ যথাযোগ্য মর্যাদায় দিনটি পালনের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১-এর চেতনা বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাঙালির সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ঘটাতে সাহায্য করেছিল। বাঙালি জাতির স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার অর্জনের লক্ষ্যে এ ভাষা আন্দোলন পরবর্তী আন্দোলনসমূহ সফলভাবে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। এভাবে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন পূর্ববাংলায় বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার যে স্ফুরণ ঘটায় তা আর থেমে থাকেনি; বরং পর্যায়ক্রমে আরো বিকশিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও যুদ্ধের বদৌলতে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়