রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরিণাম ও পরিণতি

12

লিটন দাশ গুপ্ত

গত ফ্রেব্রæয়ারি মাস শুরু থেকে বিশ্ববাসী ইউক্রেনের উপর রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। আদৌ হামলা বা যুদ্ধ হবে কিনা, হলে কি প্রকারের যুদ্ধ বা কত দিন স্থায়ী হতে পারে, তা নিয়ে অনেকদিন যাবৎ নানান জল্পনা কল্পনা চলছিল। অনেকেই আবার তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সম্ভাবনার কথাও বলেছিল। অবশেষে সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে গত ২৪ ফেব্রæয়ারি রাশিয়া ইউক্রেনের উপর হামলা শুরু করে। যা এখনো পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে।
‘গেøাবাল ফায়ার পাওয়ার’ এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের সামরিক শক্তিতে রাশিয়ার অবস্থান দ্বিতীয় এবং ইউক্রেনের অবস্থান বাইশতম। সামরিক শক্তির অতিমাত্রায় তারতম্যের কারণে যুদ্ধে দুই দেশের ভারসাম্য বজায় থাকবেনা ভেবেছিলাম। সাধারণ দৃষ্টিতে স্বাভাবিকভাবে আমিও মনে করেছিলাম, যুদ্ধ সপ্তাহ খানেকের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু শেষপর্যন্ত দুইমাস গত হল, যুদ্ধের পরিসমাপ্তি কখন হতে পারে এবং পরিণতি কি, তা এখনো বুঝা যাচ্ছেনা। তবে বিশ্বের আয়তনের দিক দিয়ে সর্ববৃহত্তম ও সামরিকদিক হিসাবে দ্বিতীয় শক্তিশালী রাষ্ট্র রাশিয়া, ইউক্রেনের কাছে পরাজিত হবে তা প্রশ্নই আসেনা। কারন যার কাছে রয়েছে অত্যাধুনিক ও অত্যাধিক সামরিক সরঞ্জাম এবং পৃথিবীর সর্বাধিক পারমানবিক অস্ত্রের ভান্ডার। এইদিকে কয়দিন আগে পারমানবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম ‘সামারাত’ নামে নতুন একটি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সফল পরীক্ষা চালিয়েছে রাশিয়া। একইসাথে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন জানিয়েছে, যারা রাশিয়াকে হুমকি দেবার চেষ্টা করবে, তাদের দুইবার ভাবতে বাধ্য করবে এই নতুন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রটি। আবার যুদ্ধের শুরুতেই রাশিয়া তার পারমানবিক অস্ত্র সর্বোচ্চ সক্রিয় রাখার নির্দেশ দিয়েছিল। অন্যদিকে ইউক্রেনকে আরো সামরিক সাহায্য দেবার প্রশ্নে ন্যাটোজোট এবং তাদের আরো বন্ধু ৪০টি দেশের মন্ত্রীরা যখন জার্মানিতে বৈঠকে বসে, তখন রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রী ক্ষুব্ধ হয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে বলে এমন যুদ্ধের কথা আশংকা ব্যক্ত করেন, যা এক প্রকার হুমকি স্বরূপ। এত সব কারণে স্বাভাবিকভাবে বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রসমূহ উদ্বিগ্ন না হয়ে থাকতে পারেনা। এছাড়া ভøামিদির পুতিনের চরিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি যা বলেন বেশীভাগ ক্ষেত্রে তা করে থাকেন। সেই হিসাবে আমাদের উদ্বিগ্ন একটু বাড়িয়ে দেয় বৈকি। রাশিয়া অবশ্য ইউক্রেনের সাথে এই সংঘাতকে যুদ্ধ বলছেনা, এটি পাশ্ববর্তী রাষ্ট্রে সামরিক অভিযান হিসাবে আখ্যায়িত করছে।
রাশিয়া ইউক্রেন সংঘাতের মূল কারণ হচ্ছে, ইউক্রেন সামরিক জোট ন্যাটোতে অন্তর্ভুক্ত হতে চাওয়া। ন্যাটোর আওতায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাজ্য জার্মানি ফ্রান্সসহ মোট ত্রিশটি রাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দলবদ্ধ কোন সামরিক গোষ্ঠীর সাথে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ইউক্রেন অন্তর্ভুক্ত হলে রাশিয়াকে স্বাভাবিকভাবে আগামীতে অস্বস্তি পড়তে হবে। কারণ ন্যাটো হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও বড় সামরিক জোট। যেটি ১৯৪৯ সালে ১২ টি দেশ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন’ সংক্ষেপে ন্যাটো নামে। এটি মূলত গঠিত হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাশিয়ার সম্ভাব্য আগ্রাসন প্রতিহত করার লক্ষ্যে। ন্যাটোর গঠনতন্ত্রেও লেখা আছে, তাদের কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে জোটের অন্য সদস্যরা হামলা মোকাবেলায় এগিয়ে আসবে। এই থেকে সার্বিক বিষয় বিশ্লেষণ করলে বুঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া ন্যাটোসহ সুপারপাওয়ার রাষ্ট্রসমূহের একপ্রকার পুরানো ক্ষমতা প্রদর্শনের দ্ব›দ্ব!
উল্লেখ্য প্রাচীন ইতিহাস সমৃদ্ধ ইউক্রেন ইতোপূর্বে সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৯১ সালে ইউক্রেন নিজেকে স্বাধীন ঘোষণা করে। ঐ সময় গণভোটে ইউক্রেনের জনগণ স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থন দিয়েছিল। সেই সময় ইউক্রেনের এই ঘোষণার প্রেক্ষাপটে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের অন্যতম মূল কারণ বলে অনেকে মনে করে থাকে। বর্তমানে আয়তনের দিকে ইউক্রেন ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র হলেও পৃথিবীর বৃহত্তম রাষ্ট্র রাশিয়ার তুলনায় নগন্য। অর্থাৎ আয়তনে ইউক্রেনের তুলনায় রাশিয়া প্রায় ত্রিশগুণ বড়। জনসংখ্যার হিসাবে ইউক্রেনের প্রায় তিনগুন মানুষ আছে রাশিয়ায়। আগেই বলেছি সামরিক শক্তির বিচারে দ্বিতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র রাশিয়া, অন্যদিকে ইউক্রেন বাইশতম শক্তিশালী রাষ্ট্র। অর্থনৈতিকভাবে ইউক্রেন ইউরোপের সবচেয়ে দুর্বল রাষ্ট্রের মধ্যে একটি। সেই হিসাবে মনে করেছিলাম সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই রাশিয়ান ঝড়ে উড়ে যাবে ইউক্রেন। কিন্ত না, তা হয়নি উপরোন্তু বলা যায় এখনো পর্যন্ত ইউক্রেন সম্মানজনকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় এই যুদ্ধ কয়দিন চলতে পারে বা কয়দিন ইউক্রেন টিকে থাকতে পারে তা রাজনৈতিক সচেতন আন্তর্জাতিক খবরাখবর বিশ্লেষকদের মধ্যে কৌতুহল সৃষ্টি হয়েছে। এইছাড়া গত কয়দিন আগে ভারতে সফররত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন আগামী বছর অর্থাৎ ’২৩ সালের শেষ মাস পর্যন্ত রাাশিয়া ইউক্রেনের যুদ্ধ চলতে পারে।
এইতো গেলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তির সম্ভাব্য সময়। এবার আসি যুদ্ধের সম্ভাব্য পরিণতি কি হতে পারে তা নিয়ে খানিক ভাবনার কথা। রাশিয়া ইউক্রেন যুুদ্ধের পরিণাম সম্পর্কে যদি বলি, এরই মধ্যে সমগ্র বিশ্বে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিভিন্ন মিডিয়া থেকে জানা যায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অধিকাংশ দেশে দ্রব্যমূল্য চরম বৃদ্ধি পেয়েছে। তৈলসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এইদিকে পশ্চিমাদের নজীরবিহীন কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া চরম সংকটে রয়েছে। চলমান পরিস্থিতির কারণে এরই মধ্যে রাশিয়ার নি¤œবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আর এভাবে বেশী দিন চলতে থাকলে দেখা যাবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ক্ষমতায় টিকে থাকা চ্যালেঞ্জ এর সম্মুখীন হতে পারে। কারণ এরই মধ্যে রাশিয়ায় যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছে। এই হলো তাদের রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ একপ্রকার সৃষ্ট সমস্যার ফলে পরবর্তীতে সম্ভাব্য পরিণতি। অন্যদিকে বলা যায়, ইউক্রেনকে সাহায্যকারী ন্যাটোর সদস্যভুক্ত কোন দেশের উপর রাশিয়া যদি হামলা চালিয়ে বসে, তাহলে ন্যাটোর সংবিধান অনুযায়ী অন্য সকল দেশ রাশিয়ার উপর হামলার প্রতিশোধ নিবে। এতে করে ন্যাটোর অন্য রাষ্ট্র ইউক্রেনের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে পারে। আর রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধে রাশিয়ার বিপক্ষে ন্যাটো সরাসরি যুক্ত হবার পরিণাম তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা এতে আমার মত অনেক বিশ্লেষকের সন্দেহ নেই। আর তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ মানে এটি ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নয়, কিংবা ১৯৪৫ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নয়, এটি হবে ২০২২ বা তৎপরবর্তী তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। যার ভয়াবহতার কথা ভেবে এখানো আমরা অপেক্ষাকৃত যারা নিরাপদ রাষ্ট্রে আছি আমাদেরও উদ্বিগ্ন না হয়ে বসে থাকার উপায় নাই। তাই বিশ্ব পরিস্থিতি যাতে ঐদিকে না যায় সেটাই সকলের কাম্য।
আসলে শান্তি সম্পর্কে যতটা লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ হয়, পক্ষান্তরে যুদ্ধ নিয়ে লিখতে অস্বস্তি অনুভূত হয়। কারণ যুদ্ধ মানে নির্যাতন ধ্বংস মৃত্যুর পাহাড়, অভাবের হাহাকার আর কান্নার আর্তনাদ। বর্তমান গেøাবাল ভিলেজে যুদ্ধ কেবল সংশ্লিষ্ট দেশ সমূহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনা। বিশ্বের প্রায় সকল দেশে যুদ্ধের কমবেশী প্রভাব পড়ে। যেমন- ইউক্রেন থেকে বাংলাদেশের দূরত্ব প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার। এতদূর হবার সত্তে¡ও বাংলাদেশে তেল গম সহ অন্যান্য খাদ্যশস্যের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। কূটনৈতিক ভাবে বিশ্বের সকল দেশ দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে । যেমন- কয়দিন আগে পাকিস্তানের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের কারনে তাকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের চক্রান্তে! যাই হোক, বিষয় সেটা নয়- কথা হচ্ছে, আমরা যুদ্ধ নয় শান্তি চাই। সহসায় বন্ধ হোক রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত। আমরা এই অঞ্চলের শান্তিকামী মানুষের এটাই প্রত্যাশা।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট