রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দুই বছর পুতিন বিজয়ী হতে যাচ্ছে কি

5

মো. দিদারুল আলম

ন্যাটোর সদস্য হওয়া নিয়ে দুই বছর আগে প্রতিবেশি ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় হামলা শুরু করে রাশিয়া। এই যুদ্ধ এখনো চলছে। কখন শেষ হবে কেউ জানে না। রুশ প্রসিডেন্ট ভলাদিমির পুতিন এখনো বিশ্বাস করেন যে, যুদ্ধে তিনিই জিতবেন। পুতিনের এমন আশাবাদের পেছনে রয়েছে ইউক্রেনের জন্য ৬০ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা বিল পাসে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা, ইউক্রেনের ভূমির প্রায় ১৮% এখন রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে, পশ্চিমা শক্তিগুলো ২০২২ সালে ইউক্রেনের পক্ষে সমর্থনের যে প্রদর্শন করেছিল, তা ২০২৩ এও জারি ছিল। কিন্তু তাদের সেই সমর্থন প্রকাশ সম্প্রতি যেন অনেকটাই ¤্রয়িমাণ হতে শুরু করেছে। রণক্ষেত্রে কিয়েভের সীমিত সাফল্য, ইউরোপের আর্থনীতিতে অস্থিরতা সম্প্রতি ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর আভদিভকার দখলের মতো বিষয়গুলো বিদ্যমান।
রাশিয়ার যুদ্ধ ইউক্রেনে মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞ বয়ে নিয়ে গেছে। রুশ সামরিক বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতিটাও কম হয়নি। রাশিয়ার শহরগুলোতেও কামানের গোলা ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। দেশটির লাখো মানুষকে সামরিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর বড় ঘটনা ছিল, ভাড়াটে যোদ্ধা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ভাগনারের বিদ্রোহ। এরপর এক উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় নিহত হন ভাগনার প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোশিন। এছাড়া ইউক্রেনে যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের অভিযোগে পুতিনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত। যুদ্ধের দুই বছরের মাথায় এসে এখন পুতিনের সবচেয়ে বড় সমালোচকের মৃত্যু হলো।
এদিকে ২০২৪ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রেও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও ইউক্রেনের জন্য দুঃসংবাদ আসতে পারে। বিশেষত, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে হোয়াইট হাউসে ফিরলে এমন আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নিতে পারে। ইউক্রেন ও ন্যাটো জোটকে বিপুল সহায়তা দেওয়ার বিরোধী ট্রাম্প। তিনি বরং, রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের পরিত্যাগ করার পক্ষে। ইউক্রেনে ব্যাপকভাবে সামরিক সহায়তা কমে যাওয়ার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ অনুমানে এখন মনোযোগ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এর ফলে খারকিভ, ঝাপোরিঝিয়া ও খেরসনের মতো যুদ্ধের সম্মুখভাগে ইউক্রেনিয় প্রতিরোধ কতোটা টিকে থাকতে পারবে– সেই অনুমানও করেছেন তাঁরা। রাশিয়ার সাথে সংঘাত শুরু হওয়ার পর ইউক্রেনকে বিভিন্ন খাতে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ১১০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। নতুন করে আরও অর্থ পাঠানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বাইডেন সরকার।
ইউক্রেনে যুদ্ধ শিগগিরই থেমে যাবে, এমন সম্ভাবনা এখন আগের চেয়ে দুর্বল। গত বছরের এই সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে, ভলাদিমির পুতিন এখন আগের চেয়েও শক্তিশালী। শুধু সামরিক শক্তির বিচারেই নয়, রাজনৈতিকভাবেও গত বছরের চেয়ে অনেক বেশি শক্ত অবস্থানে রয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট।
যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চিত। ইউক্রেনের শীতকালীন অভিযান সম্প্রতি থেমে গেছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। আবার রাশিয়ার দিক থেকেও তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। যুদ্ধের ফল আসলে নির্ভর করছে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শত মাইল দূরের ব্রাসেলস ও ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের ওপর। ইউক্রেনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার প্যাকেজ ওয়াশিংটনের অনুমোদন পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ভাষায়, ‘সস্তা রাজনীতি’র শিকার হয়ে এই প্যাকেজ ওয়াশিংটনের অনুমোদন পাচ্ছে না। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক সহায়তা ইউক্রেন পাবে কি না, তা নির্ভর করছে হাঙ্গেরির সমর্থন দেওয়া-না দেওয়ার ওপর। রাশিয়াকে অবরোধ দেওয়ার পর গত দুই বছরে সেই দেশের মানুষের জীবন অনেক বদলেছে। রাশিয়া আগে যে পণ্যগুলো বাইরে থেকে আমদানি করত, সেগুলো এখন তাদের কারখানাতেই তৈরি হচ্ছে।
পশ্চিমের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে যুদ্ধের গতিপথ রাশিয়ার পক্ষে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য পুতিন ২০২৪ সালকে ‘বড় সুযোগ’ হিসেবে দেখেছেন। পুতিন ইউক্রেনে পশ্চিমা সামরিক সহায়তায় সাময়িক ছেদ আশা করছেন। গোলাবারুদ উৎপাদন ২০২৫ সালের প্রথম দিকে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। সামনে মার্কিন নির্বাচন, এ অবস্থায় কিয়েভকে সমর্থন করার মতো ভূরাজনৈতিক কৌশলের দিকে যুক্তরাষ্ট্র কম নজর দিতে পারে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে নিজেদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। ফলে কিয়েভের সমর্থনে তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সম্ভাবনা কম।
বাংলাদেশ থেকে ৬ হাজার কিলোমিটার দূরত্বের ইউক্রেন কিংবা ৪ হাজার কিলোমিটার দূরত্বেও দেশ রাশিয়ার দুর্যোগে বাংলাদেশকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে-সে তো বাংলাদেশের মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। শুধু বাংলাদেশই নয়, ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়ার সব কটি দেশই কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বছরকালের মধ্যে দুটি দেশের এই যুদ্ধের কারণে। এই যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশে সারের দাম ১০৫ শতাংশ, চিনির দাম ৬০ শতাংশ, পেট্রোলের দাম ৪৭ শতাংশসহ এমন কোনো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস নেই যেটির দাম বাড়েনি। যে কারণে দেশের সকল শ্রেণির মানুষ বিবিধ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে।
যে কারণে বিশ্বযুদ্ধ না হলেও বিশ্বযুদ্ধের কুফলের প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। যুক্তরাষ্ট্র তার অর্থনৈতিক সুবিধা টিকিয়ে রাখার জন্য যুদ্ধকে না বলার সম্ভাবনা কম। তারা চাইবে যুদ্ধকে জিইয়ে রাখতে। কারণ তার অস্ত্র বিক্রি প্রয়োজন আছে, আর ইউক্রেনের হার মানে তার ও মিত্রদের হেরে যাওয়া। বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিরতা ও দেশে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বৃদ্ধির কারণে ডলারের তুলনায় টাকার মূল্য প্রায় ২৫ শতাংশ অবমূল্যায়িত হযয়েছে। স্বার্থান্বেষী একটি মহলের মুনাফালোভ ও কারসাজির ফলে ডলারের অতিমূল্য আরো তীব্র হয়েছে।
মন্দার প্রভাবে শিল্পোৎপাদনসহ অর্থনৈতিক সংকোচনের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, গ্যাস, ভোজ্যতেল, সারসহ শিল্পদ্রব্যের মূল্য ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে ও বেকারত্ব বাড়ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং উন্নত বিশ্বের দেশগুলোকে এর মধ্যে জড়িয়ে যাওয়াকেই দায়ী করছেন । পুরো বিশ্বের চাওয়া যত দ্রæত সম্ভব এই যুদ্ধের অবসান হওয়া উচিত।
লেখক: কথাসাহিত্যিক, কলেজ শিক্ষক ও চিত্রনাট্য লেখক