রাজনীতিবিদের অদূরদর্শিতা দলকে বিপর্যস্ত করে

32

মো. শফিকুল আলম খান

সমস্ত উদ্বেগ, উত্তাপ, উৎকণ্ঠা, সংশয় ও জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দ্বাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া অত্যন্ত সুষ্ঠু ও সফলতার সাথে সুসস্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি এবং এর মিত্রদের ভোট বর্জনের মধ্যে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ টানা চতুর্থবার নির্বাচিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুসারে প্রায় বিয়াল্লিশ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে।শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ইতোমধ্যে ছত্রিশ সদস্যের মন্ত্রী সভা গঠন করা হয়েছে। বিএনপি এবং তার মিত্ররা শুরু থেকেই বলে আসছিল তত্ত¡াবধায়ক সরকার ছাড়া হাসিনা সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনে অংশ নেবে না এবং কোন নির্বাচন করতে দেয়া হবে না দেশে। তারা যে কেন উপায়ে নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দেন। শেখ হাসিনা পদত্যাগ না করা পর্যন্ত কোন সংলাপেই বসবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেয় তারা। অপরদিকে আওয়ামীলীগও গো ধরে বসে সরকার সংবিধানের বাইরে এক চুলও নড়বে না। তারাও জানিয়ে দেয় সংবিধানের বাইরে কোন সংলাপ হবে না। এর মধ্যে লম্বা সময় দিয়ে নির্বাচন কমিশন সাত জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে ভোটের দিন নির্ধারণ করে দ্বাদশ সংসদের তফশীল ঘোষণা করে।নির্বাচন প্রতিহতের জন্য বিএন পি প্রথমে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় আন্দোলন শুরু করলেও ২৯অক্টোবর থেকে তারা সহিংস হয়ে উঠে। ঐ দিন তারা সারাদিনব্যাপী হরতাল পালন করে। এরপরে তারা দু’মাস প্রতি সপ্তাহে চারদিন করে অবরোধ ও হরতাল পালন করে। অবরোধ ও হরতাল পালনকালে তারা শত শত গাড়ীতে আগুন দেয়। আগুন দেয় কয়েকটি চলন্ত ট্রেনের বগীতে। এতে প্রাণ হারাতে হয় বেশ কিছু সাধারণ মানুষকে। তারা নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে নিরীহ একজন পুলিশকে। নির্বিচারে হামলা চালায় প্রধান বিচারপতির বাড়িতে। হামলা চালিয়ে জ্বালিয়ে দেয় পুলিশ বক্স। গাড়ী বা ট্রেনে আগুন জ্বালিয়ে বা ভাংচুর করে কিছু আতংকের সৃষ্টি হলেও বিরোধী দলের হরতাল এবং অবরোধের সময় যান চলাচল ও জীবন যাত্রা বলা যায় মোটামুটি স্বাভাবিক ছিল। অন্যদিকে সরকারও হার্ড লাইনে চলে যায়। বিএনপির শীর্ষ নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম, আমির খসরু মাহমুদ, মীর্জা আব্বাস, গয়েশ্বর রায়সহ শত শত নেতা কর্মীকে বিভিন্ন অভিযোগে গ্রেফতার করে।
এদিকে অনেক আগে থেকেই বিদেশী রাষ্ট্রদুতগণ বিশেষ করে আমেরিকার আ্যমবেসডার পিটার হাসের প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়। আমেরিকা ভিসা নীতি ঘোষণা করে। অন্যদিকে বিশেষ একটা শ্রেণি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেশে এবং বিদেশে বসে বিভিন্নভাবে সত্য মিথ্যা প্রচারণা শুরু করে বলে এখনি হাসিনা সরকারের পতন হচ্ছে। হাসিনা তার মন্ত্রীদের নিয়ে পালাচ্ছে। বিশেষ বিমান, বিমান বন্দরে অপেক্ষায় আছে। বিদেশে অবস্থানরত বিএনপি নেতা তারেক জিয়া আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য স্কাইপিতে মিটিং করে প্রতিনিয়ত দিক নিদর্শনা দিয়েছেন। শেষের দিকে তারা অসহযোগ আন্দোলনেরও ডাক দিয়ে ভোটারদের ভোট প্রদানে নিবৃত্ত করার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালায়।কিন্ত বিএনপির নির্বাচন প্রতিহত করার সমস্ত প্রয়াস ব্যর্থ করে সাত জানুয়ারি যথানিয়মে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
আমরা একটু পিছনে ফিরলে দেখি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার পর সামরিক অভ্যুথান ও পাল্টা অভ্যুত্থান এর মাধ্যমে সেনা প্রধান জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসেন। এ সময়ে সেনানিবাসে আরো অনেকগুলো ছোটখাট অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়। অন্য এক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হলে স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় আসেন। নব্বই সালে তত্ত¡াবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি তাদের মিত্রদের নিয়ে যুগপৎ আন্দোলন শুরু করে। পরে বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি বিজয় লাভ করে। একইভাবে ছিয়ানব্বই সালে বিচারপতি হাবিবুর রহমানের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। পরেরবার বিচারপতি লতিফুর রহমানের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আবার বিএনপি ক্ষমতায় আসে। এবার ক্ষমতায় এসে বিএনপি ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার অভিপ্রায়ে তাদের দলের বিচারপতি হাসান আহমদকে তত্বাবধায়ক সরকার প্রধান করার উদ্দেশ্যে বিচারপতিদের চাকরির মেয়াদ দু’ বছর বাড়িয়ে দেয়। তত্বাবধায়ক সরকারকে নিয়ে এখান থেকেই শুরু হয় বিতর্ক। আওয়ামী লীগ এই বিচারপতির মেয়াদ বৃদ্ধির বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলে। এরপর বিএনপির রাষ্ট্রপতি ইয়াজ উদ্দিন আহমদ নিজে নিজে তত্ত¡াবধায়ক সরকারের প্রধান হয়ে যান। আওয়ামী লীগ তার অধীনে নির্বাচন করতে সম্মত হলেও তার বিভিন্ন পক্ষপাতিত্বমূলক কার্যক্রমের প্রতিবাদে ড. আকবর আলী খানসহ বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা সরকার থেকে পদত্যাগ করেন। এরমধ্যে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসে। দু’বছর পরে তত্ত্বাবধায়ক প্রধান ফখরুদ্দিন আহমদের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়। এই চারটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে যে দল পরাজিত হয়েছে তারাই প্রতিপক্ষের বিরূদ্ধে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনেছিল।
ফখরুদ্দিন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে আদালতের রায়ের প্রেক্ষিতে তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করার বিষয়টি বাতিল করে দেয়। যার কারণে চৌদ্দ সালে বিএনপি দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ না নিয়ে আন্দোলনের নামে সারা দেশকে ধ্বংস স্ত‚পে পরিনত করেছিল। সারা দেশে হাজার হাজার গাড়ীতে পেট্রোল বোমা মেরে শত শত নিরিহ মানুষকে তারা হত্যা করেছিল। ভোটের আগের রাতে শত শত ভোট সেন্টার আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। তাদের এই নৃশংসতায় কয়েকজন প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসার আগুনে পুড়ে মারা যায়। এরপরেও তারা নির্বাচন প্রতিহত করতে পারে নি।
আটারো সালে বিএনপি একই কায়দায় দাবী আদায় করতে ব্যর্থ হয়ে শেষ মুহূর্তে হযবরল অবস্থায় জোট বদ্ধ হয়ে আওয়ামীলীগ সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেয়। অভিযোগ আছে বিএনপির শীর্ষ নেতারা বিভিন্ন প্রার্থীর নিকট থেকে বিপুল পরিমান টাকা নিয়ে এক একটা আসনের বিপরীতে কয়েকজনকে মনোনয়ন দিয়ে জগাখিচুড়ির সৃষ্টি করে। পরে নির্বাচনের দিন সকালে তারেক জিয়ার নির্দেশে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে তারা ভোট বর্জন করে। যার কারনে কিছু কিছু ভোট সেন্টারে আওয়ামী লীগ আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ পায়। আবার কিছূ কিছু কেন্দ্রে বাক্সে রাতে ভোট ভর্তির অভিযোগও উঠে। এই অভিযোগ যতটুকু সঠিক গত পাঁচ বছরে স্বার্থান্বেসিরা গোয়েবিয়লস কায়দায় তা শতগুণ ফুলিয়ে ফাপিয়ে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়েছে। তবে এটিও সত্য আওয়ামী লীগের মুষ্টিমেয় অতি উৎসাহি কিছু ব্যক্তি যারা এই কাজ করেছিল প্রকারান্তরে তারা দলকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। যার খেসারত আওয়ামী লীগকে আরো বহু বছর দিতে হতে পারে।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে দেখা যায় বিএনপি বারবার ভুল সিদ্ধান্তের কারণে টানা ষোল/সতের বছর ক্ষমতার বাইরে রয়েছে। এখন আরো পাচঁ বছর অপেক্ষায় থাকতে হবে। বিএনপিতে বহু নেতা আছে। কিন্ত জাতীর এধরনের পরিস্থিতিতে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার মত প্রজ্ঞাসম্পন্ন দূরদর্শী নেতার অভাবের কারণে দলকে যেমন বিপর্যস্ত হতে হয় তেমনি দেশকেও পরোক্ষভাবে এর ফল ভোগ করতে হচ্ছে।
সত্তর সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগ এল এফ ও অর্থাৎ লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার এর অধীনে নির্বাচন করেছিল। দলের ভিতরে বাইরে অনেক বড় বড় নেতা বঙ্গবন্ধুকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের দেয়া শর্তের খড়গ্ মাথায় নিয়ে এই নির্বাচনে অংশ না নেয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী সিদ্ধান্তে নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের একচ্ছত্র নেতার ম্যান্ডেট পেয়েছিলেন। যেটা পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে সহায়ক হয়েছিল।বিএনপি গত পনের বছরে না পেরেছে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলতে না পেরেছে ক্ষমতায় যাওয়ার বিকল্প কোন পথ বের করতে বা সরকারকে হটাতে। প্রতিবারই তারা শেখ হাসিনার কৌশলের কাছে পরাজিত হয়েছে। এটা এখন পরিস্কার বতর্মান যুগে দেশের জনগন অবরোধ হরতালের মত কর্মসূচীতে সাড়া দেয় না। এগুলো এখন ভোতা হয়ে গেছে। তাই এখন বিএনপিকে আন্দোলনের বিকল্প পথ খুজে বের করতে হবে। সাথে সাথে এটাও স্পষ্টত প্রমাণিত হয়েছে যে বিদেশের মাটিতে বসে নিদের্শনা দিয়ে আন্দোলন পরিচালনা করা যায় না।বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিয়ে তা প্রতিহত করার ভুল সিদ্ধান্তের কারণে তাদের হাজার হাজার নেতা ও কর্মী এখন জেলে আবদ্ধ। ভবিষ্যতে জামিন পেলেও আদালতে হাজিরা দিতে দিতে তাদের আগামী পাঁচ বছর কাটাতে হবে। প্রতিবার আন্দোলনের ব্যর্থতায় হাজার হাজার কর্মী হতাশাগ্রস্থ হয়ে রাজনীতি থেকে নিষ্কৃয় হতে পারে। একইভাবে বয়োজ্যেষ্ঠ নেতারা যারা মনে করেছিলেন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ক্ষমতার স্বাদ পাবেন তারাও আরো দীর্ঘ সময়ের জন্য কতটুকু সক্রিয় থাকবে প্রশ্ন থেকেই যায়। তাই আমার মতে আটারো সালে নির্বাচনের দিন মাঝখানে ভোট বর্জন না করলে তারা অনেক আসনে বিজয়ী হত। ঠিক একইভাবে দ্বাদশ বা এই নির্বাচনে অংশ নিলে আওয়ামীলীগের সাথে তাদের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হত। এমনকি জয়েরও সম্ভাবনা ছিল। কারণ চৌদ্ধ সাল আর আটারো সালের নির্বাচন এবার হত না। পশ্চিমা দেশসহ সারা বিশ্ব ঈগল চোখে এই নির্বাচনের দিকে দৃষ্টি রাখত। এরপরেও তারা ক্ষমতায় যেতে না পারলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সদস্য নিয়ে তারা সংসদে যেতে পারত। একই সাথে তারা সংসদ এবং মাঠে জনগণের কথা বলার সুযোগ পেত। এতে দেশে ধীরে ধীরে নতুন করে গণতান্ত্রিক ধারা সুচিত হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ ছিল।
এখন বাস্তবতা হচ্ছে আওয়ামীলীগ প্রধান শেখ হাসিনা পঞ্চম বারের মত সরকারের দায়িত্ব গ্রহন করেছেন। তার টানা তিনবারের শাসন আমলে দেশের সব সেকটরে অভুতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। অবকাঠামো, বিদ্যুত, জ্বালানি খাতে যে উন্নয়ন সাধিত হয়েছে তা নজির বিহীন। সামাজিক উন্নয়নের সব সূচকে এ অঞ্চলের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে আছে। কিন্ত এই সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হচ্ছে সমাজে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ, দুর্নীতি প্রতিরোধ, বিদেশে টাকা পাচার এবং দ্রব্য মূল্যের উর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ। বর্তমানে সরকারের প্রথম এবং প্রধানতমঃ কাজ হবে এগুলো স্থায়ীভাবে সমাধানের জরুরি ব্যবস্থা নেয়া।
লেখক: বাংলাদেশ রেলওয়ের অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক