রাখাইনে এখনও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হয়নি

43

হলিউডের অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি বলেছেন, ‘আমি দুইদিন ধরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বিভিন্ন জায়গা ঘুরেছি। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে আমি উপলব্ধি করতে পেরেছি যে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বর নির্যাতন চালিয়েছে। আমি এক রোহিঙ্গা নারীকে প্রশ্ন করেছিলাম, তাদের দেশ মিয়ানমারে ফিরে যাবে কি-না। উত্তরে তিনি আমাকে জানিয়েছেন, তাকে গুলি করে মেরে ফেললেও মিয়ানমারে ফিরে যাবেন না। কাজেই বোঝা যায় মিয়ানমারের রাখাইনে এখনও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হয়নি। তাই বিশ্ব সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত’। রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
গতকাল মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৪ টার দিকে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং ৫নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ের সময় অ্যাঞ্জিলিনা জোলি এসব কথা বলেন। জোলি বলেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত জাতিগোষ্ঠিগুলোর মধ্যে রোহিঙ্গারা অন্যতম। তাই তাদের নাগরিকত্বসহ সব অধিকার দিয়ে মিয়ানমারের ফিরিয়ে নেওয়া উচিত। এজন্য বিশ্ব সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে’।
তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের দিকে হাত দিয়ে দেখিয়ে বলেন, ‘দেখুন আমরা সবাই এখন বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ রোহিঙ্গা শিবিরে অবস্থান করছি। এত বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে এবং তাদের সহায়তা দিয়ে বাংলাদেশ একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এজন্য আমি বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি’। খবর বাংলাট্রিবিউনের
এর আগে গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে কুতুপালং এক্সটেনশন-৪ ক্যাম্পে পৌঁছান অ্যাঞ্জেলিনা জোলি। সেখানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য গড়ে উঠা শিক্ষা কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করেন এবং রোহিঙ্গা শিশুদের সঙ্গে হাত মেলান। এছাড়াও উপস্থিত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। পরে উখিয়ার কুতুপালং ৩নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের রিলিফ ইন্টান্যাশনাল পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। একই ক্যাম্পে নির্যাতিত রোহিঙ্গা নারীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং দুর্দশার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। পরে দুপুরে কুতুপালং ৪নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হোপ ফাউন্ডেশন পরিচালিত হাসপাতাল পরিদর্শন করে চিকিৎসাধীন রোহিঙ্গা নারীদের সঙ্গে কথা বলেন।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন শুরু করে দেশটির সেনাবাহিনী। এতে প্রাণভয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার শিবিরগুলোতে এখন দিন কাটছে তাদের।
রোহিঙ্গা নারীদের ওপর নির্যাতনের কথা শুনে এর আগে ঢাকায় আসার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন হলিউড অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি। সে সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, জোলি যৌন নিপীড়নের শিকার রোহিঙ্গা নারীদের দেখতে বাংলাদেশে আসার পরিকল্পনা করছেন। কিন্তু সে সময়ে দেশে নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনসহ বিভিন্ন কারণে এর আগে অন্তত চার বার অ্যাঞ্জেলিনা জোলির বাংলাদেশ সফর বাতিল করা হয়।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এর বিশেষ দূত হিসেবে অ্যাঞ্জেলিনা জোলি রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করছেন। পাঁচ দিনের বাংলাদেশ সফরে তার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করার কথা রয়েছে।
‘অ্যাঞ্জেলিনা জোলি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছেন’
‘অ্যাঞ্জেলিনা জোলি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছেন। মিয়ানমারে আমার ওপর নির্যাতনের কথা শুনে তিনি হতবাক হয়েছেন, আবেগাপ্লুত হয়েছেন’। হলিউড অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলির সঙ্গে কথা বলার পর এভাবেই নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং এক্সেটেনশন ৩নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নারী রমিজা খাতুন।
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার পর অ্যাঞ্জেলিনা জোলি ক্যাম্প ত্যাগ করেন সন্ধ্যা সাড়ে ৫ টার দিকে। এ সময় রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশুদের সঙ্গে সময় কাটান তিনি। ক্যাম্পে জোলির সঙ্গে কথা বলেছেন রোহিঙ্গা নারী মরিয়ম বেগম। তার স্বামী শফিউল্লাহ বলেন, ‘আমার বাসায় অ্যাঞ্জেলিনা জোলি গিয়েছেন। আমার বাসার চৌকাঠে বসে আমার স্ত্রীকে সান্ত¡না দিয়েছেন এবং আমাদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়েছেন’।
কালো রঙের ওড়না দিয়ে মাথা ও শরীর ঢেকে হেঁটে হেঁটে রোহিঙ্গা ক্যাম্প দেখেন হলিউডের এই জনপ্রিয় অভিনেত্রী। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতেই তিনি এই পোশাকে এসেছিলেন বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসেন জানান, ‘হলিউড অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি দুইদিনের জন্য ঢাকা থেকে কক্সবাজারে আসেন। সোমবার টেকনাফের চাকমারকুল রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে মঙ্গলবার দ্বিতীয় দিনে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করছেন। সারা দিন উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে ব্যস্ত সময় পার করেন তিনি। আগামিকাল বুধবার (আজ) সকালে ঢাকার উদ্দেশ্যে কক্সবাজার ত্যাগ করবেন’।