রাখাইনের বাকি রোহিঙ্গাদেরও নিয়ে আসার পরিকল্পনা!

78

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কঠোর নির্দেশনা সত্তে¡ও উখিয়ায় রোহিঙ্গাদের জন্য নতুন করে বসতি নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে থাকা অবশিষ্ট সাড়ে তিন লাখ রোহিঙ্গাকেও এদেশে নিয়ে আসতে নতুন বসতি নির্মাণ হচ্ছে কি-না এ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফরে রয়েছেন। এ সময় রোহিঙ্গাদের স্বদেশ (মিয়ানমার) ফেরানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায়। ঠিক সেই সময় নতুন বসতি নির্মাণের ঘটনায় স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ।
জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের জন্য নতুন বসতি নির্মাণ করার স্থানটিও একটি স্পর্শকাতর এলাকা। যে এলাকার পাহাড়ি গুহায় ১৯৯৬ সালের ফেব্রæয়ারি মাসে আবিষ্কার করা হয়েছিল নিষিদ্ধ জঙ্গিবাদী সংগঠন ‘হরকত’র দুটি ঘাঁটি। জঙ্গি ঘাঁটি থেকে বহু অত্যাধুনিক অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ৪১ জন জঙ্গিকে। পরবর্তীতে আদালত এসব জঙ্গিকে যাবজ্জীবন কারদন্ড দেন। সেই সময় থেকে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের লুন্ডাখালী পাহাড়ি এলাকাটির নাম হয় ‘হরকত পাহাড়’।
পাহাড়টিতে ক’দিনের মধ্যেই কয়েকশ ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। আরও ঘর নির্মাণ হচ্ছে। এসব ঘর নির্মাণ শুরুর পর থেকেই এলাকার লোকজন বাধা দিচ্ছিলেন।
এ নিয়ে উখিয়ার পালংখালী ইউপি চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা শিবিরের দেখভাল করার কাজে নিয়োজিত ক্যাম্প ইনচার্জ মোহাম্মদ রাশেদ এলাকাবাসীর কথা অমান্য করেই এসব ঘর নির্মাণকাজ তদারকি করছেন। সরকারি এ কর্মকর্তা (ক্যাম্প ইনচার্জ) দেশের স্বার্থ বাদ দিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর স্বার্থকেই বড় করে দেখছেন।
ইউপি চেয়ারম্যান অভিযোগ করেন, নারী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন নামের একটি এনজিও বিদেশি অর্থায়নে এ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে রাখাইনের বাকি রোহিঙ্গাদের এখানে (বাংলাদেশ) আনতে চায়।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে এক সভায় উখিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী জানান, গোপনে নতুন করে রোহিঙ্গা শিবির তৈরি হচ্ছে। যা উদ্বেগজনক। এ উদ্যোগ এলাকাবাসীর কাছে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। যে সময়ে গোটা দেশবাসী রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরাতে তৎপর, এমন সময় রোহিঙ্গা শিবিরে কর্মরত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো গোপনে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ‘হাতে নিয়ে’ শিবির নির্মাণ করছে। ঘটনাটি কাম্য নয়। এতে প্রমাণ হয় বাস্তবে রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের এখানে নিয়ে আসার বিষয়টি ছিল আন্তর্জাতিক গোষ্ঠির দীর্ঘদিনেরই পরিকল্পনা।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, আমি এমন সময়ে এরকম খবরটি শুনে অবাক হলাম। কেননা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আমার (জেলা প্রশাসক) কাছে কড়া নির্দেশনা রয়েছে, নতুন করে রোহিঙ্গাদের জন্য এক ইঞ্চি জমি দেওয়া হবে না। আমি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক কাজ করব। নতুন করে রোহিঙ্গা বসতি করা হলে সেসব গুঁড়িয়ে দেয়া হবে।
সভায় উপস্থিত উখিয়া উপজেলা সহকারী ভ‚মি কর্মকর্তা (এসি ল্যান্ড) ফখরুল ইসলাম জেলা প্রশাসককে জানান, স্থানীয় প্রশাসনের তরফে তারা এসব নতুন বসতি স্থাপনের ব্যাপারে অনেক বাঁধা দিয়েছেন। কিন্তু রোহিঙ্গা শিবিরে কর্মরত অনেকেই বাঁধা অমান্য করে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠির কথা মতই নতুন বসতি স্থাপনে কাজ অব্যাহত রেখেছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নুতন করে রোহিঙ্গাশিবির নির্মাণের খবরে উখিয়াজুড়ে তোলপাড় চলছে। স্থানীয় প্রশাসনের অগোচরে এ ধরনের শিবির নির্মাণকাজ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা সন্দেহ।
রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের নামে মিয়ানমারের রাখাইনকে বাংলাদেশের সাথে একাকার করার জন্য একজন মার্কিন কংগ্রেসম্যানের নতুন প্রস্তাবনা উত্থাপনের পর নতুন রোহিঙ্গাশিবির করার বিষয়টি এলাকার লোকজন সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি। এমনকি রোহিঙ্গা শিবির নিয়ে জেলা প্রশাসন ও রোহিঙ্গা তদারকির কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের মধ্যে এক প্রকার দ্ব›দ্ব চলছে।
তবে এ নিয়ে রোহিঙ্গাশিবির তত্ত¡াবধানে নিয়োজিত সরকারের অতিরিক্ত সচিব ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, ‘আমরা ইউএনএইচসিআর’র তহবিল নিয়ে এক স্থানে এ ধরনের সাড়ে তিনশ ঘর নির্মাণ করছি। অপরদিকে অন্যস্থানে বন বিভাগের সামাজিক আগর বাগানের ১০০ একর পাহাড়ি ভ‚মিতে আরও প্রায় ৫০০ ঘর করছি। যা মোট জমির সাড়ে ৬ হাজার একরের ভিতর। আমরা কোনভাবেই সাড়ে ৬০০ হাজার একরের বেশী ব্যবহার করছি না। বিষয়টি নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ নেই।
তিনি আরও বলেন, এসব কাজ নতুন করে করা হচ্ছে না। এগুলো আগের কাজ মাঝখানে বন্ধ ছিল, তাই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। যেহেতু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকা রোহিঙ্গাদের জন্যই এসব নির্মাণ করা হচ্ছে।