রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কঠোর হতে হবে

5

মো. দিদারুল আলম

রমজান মাসকে সামনে রেখে প্রতিবছর অসাধু ব্যবসায়ীরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। রোজার কয়েক মাস আগেই নীরবে বাড়িয়ে দেওয়া হয় নিত্যপণ্যের দাম। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। যাতে রমজানের শুরুতে অথবা কয়েকদিন আগে এসব পণ্যের দাম বাড়াতে না হয়। অন্যদিকে ভোক্তারাও যেন বলতে না পারেন, রমজান ঘিরে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে। আবার রমজানের ঠিক আগমুহূর্তে সরকারের সঙ্গে বৈঠক করে ব্যবসায়ীরা পরিকল্পনা অনুযায়ী কোনো কোনো পণ্যের দামও লোক দেখানো সামান্য কমিয়ে দেন।
বছরের পর বছর চলছে তাদের এই অপকৌশল চলছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীদের। আর এর মাধ্যমে ওইসব ব্যবসায়ী প্রতিবছর নিরীহ ভোক্তার পকেট থেকে হাতিয়ে নিচ্ছেন হাজার কোটি টাকা। এবারও সেই চক্রটি একই কৌশল অনুসরণ করছে। রমজাননির্ভর পণ্যের দাম দুই মাস আগে থেকে বাড়ানো হচ্ছে। সাথে আছে অন্যান্য দ্রব্যও।
আমাদের দেশে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায় কারণে-অকারণে। কোনো একটি অজুহাত পেলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বাড়িয়ে দেওয়া হয়। কখনও রোজা, কখনও ঈদ বা কখনও জাতীয় বাজেট ঘোষণার কারণে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করা এক নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই অশুভ প্রবণতা লক্ষ্য করে আসছি আমাদের সেই ছোটবেলা থেকে এবং আজও সেই একই ধারা অব্যাহত আছে। বরং বলা যায় যে, সেই প্রবণতা এখন বেড়ে গেছে মাত্রাতিরিক্ত হারে। একটি জিনিসের দাম বৃদ্ধি পেলে এ নিয়ে কথা বলতে না বলতে আরেকটি জিনিসের দাম বেড়ে যায়।
প্রতিবছর এক লাখ টন ছোলার চাহিদার মধ্যে রোজার মাসেই লাগে ৮০ হাজার টন। স্থানীয়ভাবে ছয় হাজার টন ছোলা উৎপাদন হলেও এক লাখ টন আমদানি করা হয়। গত তিন মাসে ৩০ হাজার টনের মতো ছোলা আমদানি করা হয়েছে। আরো ১৫ হাজার টন ছোলা আমদানির এলসি খোলা হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জানা গেছে। সরকার ছোলা আমদানিতে ভ্যাট কমিয়েছে। তারপরও বাজারে এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব নেই বললেই চলে। গত এক মাসে ছোলার দাম কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়ে ১১০ থেকে ১১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জেও বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। রোজার আগে সবচেয়ে বেশি দাম বাড়ছে ছোলা, ডাল, চিড়া, গম ও চিনির। ভোজ্যতেলের মধ্যে পাম অয়েলের দাম না বাড়লেও সয়াবিনের দাম বেড়েছে। শীতে পাম অয়েল জমে শক্ত হয়ে যাওয়ার কারণে চাহিদা কম থাকায় দাম বাড়েনি। তবে রোজা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এ পণ্যটির দামও বাড়তে পারে।
কিন্তু অসাধুদের এই কারসাজির কৌশল ‘ওপেন সিক্রেট’ হলেও সব সময়ই রহস্যজনক কারণে ‘নীরব দর্শকের ভূমিকায়’ থাকে কর্তৃপক্ষ। নেওয়া হয় লোক দেখানো কিছু পদক্ষেপ। কিন্তু আসে না কোনো কার্যকর ফল। কোনো বছরই ওইসব ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং নির্বিঘেœ চালিয়ে গেছেন তাদের অপকর্ম। তাদের জাঁতাকলে কোনো কারণ ছাড়াই পিষ্ট হচ্ছেন সাধারণ ভোক্তা। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা প্রত্যেক দ্রব্যের দাম বাড়ালেও যাদের এ নিয়ে সোচ্চার হওয়া উচিৎ , তারা চুপচাপ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে।
ডালজাতীয় অধিকাংশ পণ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ডলারের বিনিময় হার বেশি হওয়ায় আমদানিতে খরচ বেশি পড়ছে। তার প্রভাব পড়ছে ডালের বাজারে। গত ছয় মাসে মসুর ডালের দাম দফায় দফায় বেড়েছে। এখন ছোলাসহ কয়েক পদের ডালের দাম নতুন করে বাড়ানো হচ্ছে। রমজান মাস শুরু হতে এক মাস ১০-১২ দিন আছে। এমনিতে সব কিছুর দাম বাড়তি। তার ওপর রমজান নির্ভর পণ্যগুলোর অনেক দাম। এই অবস্থায় ভোক্তাদের দীর্ঘশ্বাস বাড়ছে।
আমদানি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ সত্তে¡ও দেশে এখনো ডলারের তীব্র সংকট বিদ্যমান। সেই সঙ্গে রিজার্ভের ক্ষয়ও অব্যাহত রয়েছে। ব্যাংকগুলোতে ডলার মিলছে না বাড়তি দামেও। ফলে অতি জরুরি পণ্যর চাহিদামাফিক আমদানি করা যাচ্ছে না। বাধ্য হয়েই আমদানি কমিয়েছেন তারা, যার প্রভাব পড়েছে বাজারে পণ্যের মজুদের ওপর। এ কারণে সামনে রমজানকে ঘিরে এসব পণ্যের চাহিদা, মজুদ ও সম্ভাব্য জোগানের মধ্যে টানাপোড়ান তৈরি হয়েছে। এই সুযোগে ব্যবসায়ীরা বিদ্যমান পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে পণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়িয়ে দিচ্ছেন।
কোনো কিছুর দাম বেড়ে গেলে সেটি না খাওয়া কিংবা বিকল্প কিছু খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া অথবা ইনিয়ে-বিনিয়ে জিনিসের দাম বৃদ্ধির পক্ষে ওকালতি করা এবং এই ইস্যুতে কথা বললে তাকে সরকারবিরোধী বা উন্নয়নবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা সংকটকে আরও ঘনীভূত করে এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের দ্রব্যের দাম বাড়াতে উৎসাহ জোগায়।
দেশের নানামুখী সংকটের কারণে কিছু দ্রব্যের সরবরাহ কম। তাছাড়া ডলারের মূল্য বৃদ্ধি, মাত্রাতিরিক্ত ট্যাক্স বৃদ্ধি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ঋণপত্র খুলতে ব্যাংকগুলোর অনীহায় রোজার বাড়তি চাহিদার কারণে কিছু দ্রব্যের দাম হয়তো অল্পকছু বাড়তে পারে। কিন্তু প্রায় সব পণ্যের অতিরিক্ত দাম বাড়ানো কোনো অবস্থা গ্রহণযোগ্য নয়।
বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সংসার খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। যদিও সরকারের হিসাবে গত এক বছরে দেশের মানুষের আয় বেড়েছে, মজুরিও বেড়েছে। টাকার অঙ্কে বেড়েছে মাথাপিছু আয়। কিন্তু সবই কাগজে-কলমের হিসাব। আর তাতে সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি পাচ্ছে না; বরং সংসার চালাতে অনেককে ধারদেনা করতে হচ্ছে। ভাঙতে হচ্ছে সঞ্চয়। মূলত উচ্চ মূল্যস্ফীতিই খেয়ে ফেলছে মানুষের আয়। এই অবস্থায় সামনে আসছে রমজান। সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে মধ্যবিত্তদের অবস্থা আরো খারাপ হবে।
নি¤œবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের বর্তমান লাগামহীন বাজার দরে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে। একটি ক্রয় করতে গেলে আরেকটি ক্রয় করতে পারছে না তারা। তাই সবকিছু বিবেচনা করে সরকারের প্রতি আমাদের আবেদন, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কমানেই সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হোক।
লেখক : নাট্যজন ও কলামিস্ট