রনিল বিক্রমাসিংহে শ্রীলঙ্কার নতুন প্রধানমন্ত্রী

7

পূর্বদেশ ডেস্ক

অর্থনৈতিক সংকট ঘিরে সহিংস বিক্ষোভে টালমাটাল শ্রীলঙ্কার নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন দেশটির ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি (ইউএনপি) নেতা রনিল বিক্রমাসিংহে। গতকাল বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে দেশটির ২৬তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তিনি। এর আগেও শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পাঁচবার দায়িত্ব পালন করেন এই ইউএনপি নেতা।
রনিল বিক্রমাসিংহের দল ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির বরাত দিয়ে শ্রীলঙ্কার ডেইলি মিরর এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
জানা গেছে, ইউএনপি নেতা রনিল বিক্রমাসিংহেকে শপথবাক্য পাঠ করান লঙ্কান প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে। রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবনে শপথ গ্রহণ করেন তিনি। শপথ গ্রহণের পর ওয়ালুকারমা মন্দিরে আশীর্বাদ নিতে যান রনিল বিক্রমাসিংহে।
এর আগে বুধবার সন্ধ্যায় শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন রনিল বিক্রমাসিংহে। এরপরই শোনা যায় শ্রীলঙ্কার নতুন প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন এই ইউএনপি নেতা। বিক্রমাসিংহের দল বিষয়টি নিশ্চিত করে। রনিল বিক্রমাসিংহের জন্ম ১৯৪৯ সালের ২৪ মার্চ। সিলন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনার পর সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে রাজনীতিতে যোগ দেন তিনি।
৭৩ বছর বয়সী এই ইউএনপি নেতা দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে সংসদে রয়েছেন। তার ব্যাপক আন্তর্জাতিক সংযোগ আছে এবং তাকে একজন দক্ষ আলোচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে মুখে পড়া শ্রীলঙ্কায় মাসখানেকের বেশি সময় ধরে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলছে। গত সোমবার সরকার সমর্থকদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ এবং দেশজুড়ে জ্বালাও- পোড়াওয়ের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়েন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়ার বড় ভাই মাহিন্দা রাজাপক্ষে। জনরোষের মুখে কলম্বোর প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন থেকে সেনা পাহারায় পালিয়ে একটি নৌঘাঁটিতে অবস্থান নিয়েছেন তিনি।
এরপর বিক্ষোভ দমনে দেশজুড়ে কারফিউ জারির পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও পুলিশকে গুলি চালানোর ক্ষমতা দেওয়া হলেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। প্রেসিডেন্ট গোতাবায়ার পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ চলছিল।
এরই মধ্যে মঙ্গলবার দেশটির প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে বিরোধীদল সামাজি জানা বালাবউইগেয়ায়ার (এসজেবি) নেতা সাজিথ প্রেমাদাসাকে প্রথমে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু সাজিথ জানিয়েছিলেন, প্রেসিডেন্ট পদত্যাগ করলেই কেবল তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেবেন। এরপর বুধবার রনিল বিক্রমাসিংহেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দেন প্রেসিডেন্ট।

পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান গোটাবায়ার
বুধবার শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকশা জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া এক ভাষণে তার পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করেন এবং দেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করেন।
দেশটিতে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম জাতির উদ্দেশ্যে কোন ভাষণ দিলেন প্রেসিডেন্ট রাজাপাকশা। ভাষণে তিনি প্রেসিডেন্টের কিছু ক্ষমতা সংসদের কাছে হস্তান্তর করার প্রস্তাব দেন, যদিও কোন সময়সীমার কথা বলেননি। অনেকেই সমালোচনা করছেন যে তার বক্তব্য আসল সমস্যাগুলোর সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
এর আগে বুধবার রাতে গুজব ছড়িয়ে পড়ে রাজাপাকশা এবং তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা ভারতে পালিয়ে গেছে। সেই খবর আবার কলোম্বোতে ভারতের হাই কমিশন থেকে নাকচ করা হয়।
রাজাপাকশা সেখান থেকে পালিয়ে যেতে পারেন এমন সম্ভাবনা থেকে বিক্ষোভকারীরা ত্রিঙ্কোমালির নৌঘাঁটিতে জড়ো হয়েছে।
প্রেসিডেন্টের ঘোষণা, তিনি সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং বলবেন। দেশে রাজনৈতিক স্থিরতা যাতে থাকে, সেটা তিনি নিশ্চিত করবেন। জাতীয় সুরক্ষার বিষয়টিও তিনি নিশ্চিত করবেন। একই সঙ্গে তিনি বিক্ষোভকারীদের উপর আক্রমণের নিন্দা করেছেন।
গোটাবায়া রাজাপাকসে বলেছেন, দেশ সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে আমি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাছে একটা প্রস্তাব পাঠিয়েছি। অতীতে অনেক নেতার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আমি তাদের কিছু সুপারিশ মেনে কড়া সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছি।
গোটাবায়া এটাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, নতুন সরকারে রাজাপাকসে পরিবারের কেউ থাকবেন না। মাহিন্দ্রা রাজাপাকসে ইতোমধ্যেই পদত্যাগ করেছেন। তার মন্ত্রিসভারও আর অস্তিত্ব নেই। ফলে নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা নেই। সেই ঘোষণা মোতাবেক রনিল বিক্রমাসিংহে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।

সেনা অভ্যুত্থানের গুজব
এদিকে বিরোধী রাজনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, এই সহিংসতা সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের অজুহাত হিসেবে দেখাতে পারে। কলোম্বোর রাস্তায় বিপুল সংখ্যায় সৈন্যদের অস্ত্রসজ্জিত গাড়িবহর দেখে এমন একটা গুজব ছড়ায় যে সেনা অভ্যুত্থান হতে পারে।

মাহিন্দার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা
সদ্য পদত্যাগকারী শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে ও তার ছেলে নামাল রাজাপাকসেসহ ১৫ মিত্রের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। দেশটির স্থানীয় এক আদালত এই রায় দিয়েছেন। এনডিটিভির প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে তাদের ওপর এ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এছাড়া কলম্বোর ম্যাজিস্ট্রেট গত সোমবার শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলার তদন্ত করতে পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন। ওইদিনের সহিংসতায় এখন পর্যন্ত ৯ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া আহত হয়েছে দুই শতাধিক।
লঙ্কান আদালতের এক কর্মকর্তা এএফপি’কে জানিয়েছেন, আদালতে একটি আবেদনে রাজাপাকসে ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। কারণ, যেভাবেই হোক, যেকোনো সন্দেহভাজনকে আটক করার ক্ষমতা পুলিশের রয়েছে।
এদিকে দেশটির পুলিশ বুধবার (১১ মে) জানিয়েছে, কাউকে সরকারি সম্পত্তি লুটপাট, ধ্বংস এবং মানবজীবনের ক্ষতি করতে দেখলে তাদের গুলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত মঙ্গলবার দেশটির সেনাবাহিনীকে এই নির্দেশ দেয় শ্রীলঙ্কান সরকার। সূত্র : বিবিসি, এএফপি।