রথের পুকুর পাড়ে তুলসীধামের প্রাচীনতম রথযাত্রা

6

উত্তম কুমার চক্রবর্ত্তী

প্রকৃতির অনাবিল সৌন্দর্যমÐিত পাহাড়বেষ্টিত নন্দিত তপোবন বন্দরনগরী চট্টগ্রামের তুলসীধাম। সেখানে রয়েছে বিশ্বব্রহ্মাÐের অধিপতি জগতের নাথ শ্রীশ্রী মদনমোহনজী। আছেন রামভক্ত হনুমান এবং নিত্য লীলাময় যুগাচার্য ঋষি শ্রীমৎ স্বামী অদ্বৈতানন্দ পুরী মহারাজের পুণ্য সমাধিপীঠ। প্রতিবছর আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে এই পুণ্যলোকে মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয় জগৎপতি শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা। অদ্বৈত-অচ্যুত ভক্তের পদচারণায় মুখরিত হয় তুলসীধামসহ চট্টগ্রামের জনপথ। এ যেন ভক্ত আর ভগবানের এক মহামিলন তীর্থ। পরিশুদ্ধ প্রাণের সম্মিলিত যাত্রাই হলো প্রকৃত যাত্রা। আর সেই যাত্রাপথে ভগবান রথ থেকে নেমে এসে ভক্তের সাথে প্রেমডোরে আবদ্ধ হন। সার্থকমÐিত হয় রথযাত্রা।
অশুভ বুদ্ধি দ্বারা মন চালিত হলে জগৎপতিকে হৃদয় রথে চালিয়ে নেওয়া অসম্ভব। কারণ এই রথের রথী স্বয়ং জগন্নাথ, যিনি অনাথের নাথ, অগতির গতি মহাজ্যোর্তিময় পুরুষ। তিনি চড়েন শুদ্ধতম দেহ রথে। মোহাচ্ছন্ন কামনা-বাসনাযুক্ত দেহরথে তিনি চড়েন না। তাইতো স্বামী অদ্বৈতানন্দজী ঋষিযুগকে আহবান জানিয়েছেন যাতে করে প্রত্যেকে পরিশুদ্ধ মনে জীবন রথের রথীকে নিয়ে আসল গন্তব্যে পৌঁছতে পারে। মন বিষয় বাসনামুক্ত হলে তবেই বুদ্ধির জোরে দেহরথ চালিয়ে আমরা পৌঁছাতে পারবো অমৃতলোকে।
মানবজীবনের লক্ষ্যই হলো ঈশ্বর প্রাপ্তি। আর তা কেবল বিশুদ্ধ প্রেম-ভক্তি মিশ্রিত সাধনার মাধ্যমে সম্ভব। শাস্ত্রে বলা হয়েছে- ‘রথস্থ বামনং দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে।’ রথে বামনরূপী জগন্নাথ দর্শন করলে পুনঃর্জন্ম হয় না। তত্ত¡গত দিক থেকে দেহরথে ভগবৎ দর্শনের কথা বলা হয়েছে। স্বামীজি বলেছেন, গুরুকৃপা ছাড়া আত্মরাজ্যে পরমাত্মার মিলন অসম্ভব। তাঁর অমর সৃষ্টি শ্রীশ্রী দশমহাবিদ্যার তত্ত¡বোধময়ী সাধন সঙ্গীতে স্বামীজি গাইলেন-
‘বিবেক সারথী-শমদম সাথী
প্রবোধবারি গুরুদত্ত মহাধন।’
একমাত্র গুরু নির্দেশিত সাধন পথ অবলম্বন করে সংসার পথে অগ্রসর হওয়ার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার মধ্যে রয়েছে অপার শান্তির পরশ। তাই বলদেবের রথ প্রথমেই চলতে দেখি। আর তিনি হলেন গুরুতত্ত¡। প্রকৃতপক্ষে গুরুপ্রদত্ত সাধন প্রণালী অনুসরণ করলে ভয়ের আশংকা থাকে না। ভক্তাধীন ভগবান। ভগবান গীতায় তাঁর প্রিয় শিষ্য অর্জুনকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘ন মে ভক্তপ্রণশ্যতি।’ অর্থাৎ, হে অর্জুন আমার ভক্তের বিনাশ হয় না। একমাত্র প্রকৃত ভক্তই পারে ভক্তির অমিয়ধারায় ভগবানকে দেহ মধ্যস্থ রথে উপবেশন করে মহাজ্যোতির অমৃতময় রাজ্যে আত্মদর্শন করতে। ভক্তিতে ঈশ্বর প্রীত হন। স্বামীজি তাঁর মহাগ্রন্থ ধর্ম প্রবেশিকাতে এই প্রসঙ্গে বলেছেন-“ঈশ্বর প্রাপ্তির চরম উপায় ভক্তি, ভক্তিতে ভগবান মূর্ত, ভক্তি প্রীতিরূপা।” দ্বিতীয়ত সেই অর্থেই ভক্তি মহারাণী সুভদ্রার রথ নিয়ে যাত্রা। প্রেমভক্তির মহাযাত্রায় জগতের নাথ প্রীত হয়ে ভক্তহাতে প্রসাদ গ্রহণ করেন। হস্ত-পদহীন বহিরিন্দ্রিয় বর্জিত শ্রীদেহ জগন্নাথ দেহ। তিনিই পরমাত্মা স্বরূপ। ইন্দ্রিয়রহিত বাহ্যক্রিয়া বিমুখ। তিনি থাকেন দেহপুরে। অন্তরাত্মার অবস্থিতি যেখানে সেখানটাই আনন্দপুরী। আনন্দপুরীরতে আনন্দের স্বরূপ শ্রীভগবানের উপস্থিতি। মানবদেহটাই প্রকৃত রথ। তাইতো কঠোপনিষদে ঋষিপুত্র নচিকেতাকে যমরাজ ব্রহ্মবিদ্যায় আত্মতত্তে¡র উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিলেন:
আত্মানং রথিনং বিদ্ধি শরীরং রথমেবতু।
বুদ্ধিংতু সারথিং বিদ্ধি মনঃ প্র গ্রহমেবচ \
আমাদের এই দেহটা হলো উত্তম রথ। আত্মা তার রথী বা আরোহী। বুদ্ধি হলো সেই দেহ রথের চালক এবং মন হলো লাগাম বা দড়ি। ইন্দ্রিয়সমূহ রথের অশ্ব এবং রূপ, রস, শব্দ, গন্ধ, স্পর্শ অশ্বের বিচরণভূমি। সংসার পথে এই দেহরথ নিয়ত ধাবমান। বুদ্ধির অধিষ্টাতা বাসুদেব যদি কৃপা করেন তাহলেই ভক্তের ভগবৎ প্রাপ্তি সম্ভব। তিনি তখন জীবনের মহাসমুদ্র পাড়ি দিয়ে চিন্ময় রাজ্যের সন্ধান লাভ করতে পারেন। তখন তার বার বার ভগবানে স্ফূর্তি হয়। ভক্ত হৃদয় ভগবৎ প্রেমে পূর্ণতা লাভ করে। সেই অর্থেই সর্বশেষ জগন্নাথ দেবের রথে উঠে যাত্রা।
কালের যাত্রাপথে তুলসীধামের রথযাত্রা উৎসব প্রায় দুইশত বছরের অধিক পুরনো। রথযাত্রার আধ্যাত্মিক দিকটি সম্পূর্ণ জীবনভিত্তিক। সেই আধ্যাত্মিক দিক বিবেচনা করে স্বর্ণযুগের সত্যদ্রষ্টা ঋষি স্বামী অদ্বৈতানন্দ পুরী ১৯৬১ সালে তুলসীধামে পুনরায় নবরূপে রথযাত্রার সূচনা করেন। এই যাত্রাপথে জীবনতরীর কাÐারী হয়ে রইলেন জগদ্গুরু স্বামী অদ্বৈতানন্দ পুরী এবং গুরু পরম্পরা ঋষি বংশের ধ্রæবতারা শ্রীমৎ স্বামী অচ্যুতানন্দ পুরী ও শ্রীমৎ স্বামী নারায়ণ পুরী মহারাজ। যাঁরা গেয়েছেন মানবমুক্তির জয়গান, নির্দেশনা দিয়েছেন দেহরথকে সঠিক পথে পরিচালিত করার। ঠিক একইভাবে তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে শ্রীমৎ স্বামী দেবদীপানন্দ পুরী মহারাজের সুন্দর ও দক্ষ পরিচালনায় বর্তমান তুলসীধামের রথযাত্রার প্রতিটি আয়োজন হয়ে থাকে অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও আধ্যাত্মিকতায় সমৃদ্ধ। এ যেন ভক্তদের সাথে নিয়ে স্বামীজির আদর্শ মাথায় ধারণ করে সত্য ও সুন্দরের পথে তাঁর যাত্রা। শ্রীজগন্নাথের রথযাত্রা প্রকৃতপক্ষে উজ্জ্বল চৈতন্যের সাথে আপন প্রাণের মহামিলনের যাত্রা। দেহপুরে অন্তর পুরুষের ঐশীস্পর্শে মানবজীবন ধন্য হোক স্বামী অদ্বৈতানন্দজী তুলসীধামে রথযাত্রার মাধ্যমে তা-ই চেয়েছেন। মানুষে মানুষে সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করে সত্য, সুন্দর ও সঙ্গতিপূর্ণ ঐক্য গড়ে মহানন্দময় জীবনের দিকে প্রতিটি মানুষ অগ্রসর হোক। মানুষ হয়ে উঠুক অতিমানব তথা ঋষি, স্বামীজির স্বপ্নের এই চিরন্তন প্রতিফলন তাঁর তুলসীধামে রথযাত্রার আনন্দঘন আয়োজন। ধন্য ঋষি, ধন্য ঋষিকূল।
লেখক : প্রধান শিক্ষক, কবি ও প্রাবন্ধিক