যুদ্ধ মাঠে নয়, মুখে

18

পূর্বদেশ ডেস্ক

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন এখনো বহুদূর। নতুন করে নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে চলছে আলোচনা। এরই মধ্যে উত্তাপ ছড়াচ্ছে রাজনীতি। মাঠের লড়াই না থাকলেও ‘তত্ত¡াবধায়ক সরকার’ ইস্যু নিয়ে বড় দুদল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে শুরু হয়েছে রীতিমত বাকযুদ্ধ। আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার আর কোনো দিন ফিরে আসবে না। অন্যদিকে বিএনপির নেতারা বলছেন আগামী নির্বাচন আওয়ামী লীগের অধীনে নয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই করতে হবে। মূলত এই বাকযুদ্ধে জড়িয়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সরকারের সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ইস্যুতে বিএনপি আলোচনায় বসার আগ্রহের কথা জানালেও তা নাকচ করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। ফলে দল দুটির মধ্যে আলোচনায় বসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক অঙ্গনে ফের উত্তাপ ছড়ানোর আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। সেই উত্তাপ ছড়াতে পারে রাজপথেও।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলছেন, নির্বাচন-নির্বাচন খেলা আর হবে না। নির্বাচন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই হতে হবে। নিরপেক্ষ সরকার এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের অধীনে ছাড়া বিএনপি কোনো নির্বাচন মেনে নেবে না।
বিএনপির নিরপেক্ষ সরকারের দাবিকে মামার বাড়ির আবদার উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বললেন, উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে তত্ত¡াবধায়ক সরকার বাতিল হয়েছে, এ পদ্ধতি ছিল একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা, দীর্ঘমেয়াদে তত্ত¡াবধায়ক সরকার চলতে পারে না। আগামী নির্বাচন হবে সংবিধান অনুযায়ী। এ দেশে আর কখনো তত্ত¡াবধায়ক সরকার আসবে না। এ ইস্যুতে বিএনপি রাজপথে অরাজকতার চেষ্টা করলেও তা শক্তহাতে মোকাবিলা করা হবে হুঁশিয়ারি দেন ক্ষমতাসীন দলের এই নেতা।
‘সরকারকে আর সময় দেওয়া যায় না’ সম্প্রতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এমন বক্তব্যের জবাবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গতকাল মঙ্গলবার নিজ বাসভবনে ব্রিফিংকালে বলেন, সরকারকে সময় নির্ধারণ করে দেওয়ার উনি কে? তিনি বলেন, সরকারকে সময় নির্ধারণ করে দিয়েছে দেশের সংবিধান ও এদেশের জনগণ। আর ক্ষমতা দেওয়ার মালিক সর্ব শক্তিমান আল্লাহ।
বিএনপি নেতাদের উদ্দেশে ওবায়দুল কাদের বলেন, ৯০-এর পটভূমি আর ২০২১-এর পটভূমি এক নয়। সুতরাং গণ-অভ্যুত্থান করে সরকার পতনের দিবা স্বপ্ন বিএনপির রঙিন খোয়াবে পরিণত হবে।
বিএনপির আন্দোলনের হুমকি প্রসঙ্গে কাদের বলেন, তাদের জনসমর্থনের জোয়ার তো গত ১৩ বছরে কোনো নির্বাচনে দেখা যায়নি। ‘তারা ভরাডুবির ভয়ে এখন নির্বাচনবিমুখ। তাই রাজপথ আর ভোটের ময়দান ছেড়ে গণমাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় রাজনীতিকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছেন।’ বিএনপির উদ্দেশে তিনি বলেন, পৃথিবীর অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে নির্বাচন হয়, বাংলাদেশেও সময়মতো সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। মীমাংসিত বিষয় নিয়ে অযথা মাঠ গরম করবেন না।
এদিকে গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি কার্যালয় মিলনায়তনে জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রতিনিধি সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দেশের কোথাও আওয়ামী লীগ নেই। এখন হচ্ছে আমলা লীগ। এখন ডিসি, এসপি, ওসি- এরা অনেক বড় সাহেব। আওয়ামী লীগের চাইতে তারা অনেক বড় আওয়ামী লীগ। এই অবস্থার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে, তার সরকারকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।
বিএনপির মধ্যে গণতন্ত্র নেই, ওবায়দুল কাদেরের এমন বক্তব্যের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, তার কথায় ঘোড়াও হাসে। তাদের গণতন্ত্র মুখেই শুধু। তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন না। যারা আগের রাতে ভোট চুরি করে নিয়ে যায়, ১৫৪ জনকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত করে, বন্দুক আর পিস্তল দিয়ে জোর করে ক্ষমতায় বসে থাকে, তাদের মুখে গণতন্ত্রের কথা শোভা পায় না। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, তাদের লজ্জা হয় না, যখন গণতন্ত্রের কথা বলে?
আগামী জাতীয় নির্বাচন সম্পর্কে দলের অবস্থা স্পষ্ট করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, এদেশে অবশ্যই একটা নির্বাচন হতে হবে। সেই নির্বাচনের মধ্যদিয়ে জনগণ তাদের মতামত দেবেন এবং সেই নির্বাচন হতে হবে সম্পূর্ণ নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। যাতে জনগণ ভোট দিতে যেতে পারে। যাকে ইচ্ছা তাকে ভোট দেবে- সেই ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে।
নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে তিনি বলেন, ক্ষমতাসীনরা নির্বাচন কমিশন নিয়ে খুব মাতামাতি করছেন। সার্চ কমিটির কথা বলছেন। কিসের সার্চ কমিটি? এটা নাটক। কারণ তারা যাকে দেবেন তাকে দিয়ে ইসি গঠন করা হবে। তারা যাকে চাইবেন সেই হবে। নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার কিছু সত্য কথা বলেছেন। এখন তার বিরুদ্ধে উঠে-পড়ে লেগেছে, তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকম কথা বলছে, তাকে মানসিক রোগী বলছে। মানসিক রোগী তো আওয়ামী লীগ সরকার।
প্রতিদিনের এই পাল্টাপাল্টি রাজনীতির অঙ্গনে উপভোগ্য হলেও পেছনে নিগুঢ় উদ্দেশ্য আছে। আর তা হলো আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যে যার অবস্থানে জনমত গঠনে রাজনৈতিক যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে। কথা ও বলার ধরন নিয়ে সাধারণের আগ্রহ না থাকলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এটা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। নির্বাচন নিয়ম অনুযায়ী অনেক দূরে। তবুও আগাম এসব কথাবার্তার অর্থ হলো সরকার দল চাইছে বিদ্যমান অবস্থা বহাল রাখা এবং সে অনুযায়ী বিএনপিকে প্রভাবিত করা আর বিএনপি নির্বাচন, নির্বাচনকালীন সরকার, ইসি পুনর্গঠন বিষয়ে চাপ প্রয়োগ কিংবা আন্দোলনের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিজের অনুক‚লে নিয়ে আসা। দেখা যাক, মুখের যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।