যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাবাস কিনা সিদ্ধান্ত ১ ডিসেম্বর

9

যাবজ্জীবন কারাদন্ড মানে আমৃত্যু কারাবাস- আপিল বিভাগের এমন রায় ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ দাবি করে আসামিপক্ষ যে পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করেছিল, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আগামি গতকাল মঙ্গলবার (১ ডিসেম্বর)। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সাত বিচারকের পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চ এদিন রায় ঘোষণা করবে। এ রায়েই জানা যাবে যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাবাস না নির্দিষ্ট বছরের সাজা।
গতকাল মঙ্গলবার রায়ের তারিখ ঘোষণার সময় ভার্চুয়াল আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে যুক্ত ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিৎ দেবনাথ। আর আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন ও আইনজীবী শিশির মনির।
গত বছর ১১ জুলাই প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চে শুনানি শেষে রিভিউ আবেদনটির রায় (সিএভি) অপেক্ষমান রেখেছিল। তার আগে রিভিউ শুনানিতে সর্বোচ্চ আদালত পাঁচ অ্যামিচি কিউরির বক্তব্য শোনেন। তারা হলেন
আইনজীবী রোকন উদ্দিন মাহমুদ, এ এফ হাসান আরিফ, আবদুর রেজাক খান, মুনসুরুল হক চৌধুরী ও এ এম আমিন উদ্দিন।
যাবজ্জীবন কারাদন্ড মানে আমৃত্যু কারাবাস জানিয়ে আপিল বিভাগ যে রায় দিয়েছিল, তা ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ দাবি করে ২০১৭ সালের রিভিউ আবেদন করে আসামিপক্ষ।
তখন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছিলেন, এক হত্যা মামলার চূড়ান্ত বিচারে (ওই বছরের ফেব্রূয়ারিতে) দেওয়া ওই রায় আপিল বিভাগেরই আগের আরেকটি রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সেদিন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ওই রায়ের কারণে আইনের ব্যাখ্যা নিয়ে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে। সঠিক বিবেচনায় ওই রায় দেওয়া হয়নি। বিভ্রান্তি দূর করার জন্য পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করা হয়েছে।

২০০১ সালে সাভারের ব্যবসায়ী জামান হত্যা মামলায় দুই আসামির আপিল শুনানি শেষে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা নেতৃত্বাধীন চার বিচারকের আপিল বেঞ্চ ওই রায় দেয়। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশিত হয় ২০১৭ সালের ২৪ এপ্রিল।
রায়ে বলা হয়, দন্ডবিধির ৫৩ ধারা ও ৪৫ ধারায় যাবজ্জীবন কারাদন্ড হবে আমৃত্যু কারাবাস। এর ফলে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত সবাইকে আমৃত্যু কারাগারে থাকতে হবে। আপিল বিভাগের ওই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন জমা দিয়েই সেদিন সংবাদ সম্মেলনে আসেন এ মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন। তিনি বলেন, প্রচলিত ফৌজদারি আইন ও কারাবিধি অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদন্ড অর্থ ৩০ বছর সাজা। এরপর আসামি রেয়াত পেলে ওই সাজার সময় আরও কমে যাবে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫(ক) ধারা অনুযায়ী সাজার মেয়াদ থেকে বিচারিক সময়ের হাজতবাসের সময়ও বাদ যাবে।
খন্দকার মাহবুব আরও বলেছিলেন, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার নেতৃত্বে আপিল বিভাগ ২০১৩ সালে এক রায়ে বলেছে, যাবজ্জীবন কারাদন্ড অর্থ হল সাড়ে ২২ বছর কারাদন্ড।
আপিল বিভাগের ওই রায় ও আইন বলবৎ থাকা অবস্থায় বিচারপতি সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের অপর রায় আসে; সেখানে যাবজ্জীবন কারাদন্ড মানে ‘আমৃত্যু কারাদন্ড’ বলা হয়।
‘আপিল বিভাগের আগের রায় বাতিল না করেই এ রায় দেওয়া হয়েছে। ফলে রায়ের ব্যাখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। এছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫ (ক) ধারার কার্যকারিতা যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামির ক্ষেত্রে স্থগিত করা সমীচীন হয়নি। এটা দূর হওয়া প্রয়োজন’- বলেছিলেন খন্দকার মাহবুব হোসেন। এ কারণে রিভিউ আবেদন করা হয় বলে জানান তিনি।
জামান হত্যা মামলায় আপিলের রায়ে বলা হয়, যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির সাজা মওকুফ (রেয়াত) পাওয়ার কোনো অধিকার নেই। যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি অন্য কোনো সুবিধা (রেয়াত) পাওয়ার দাবি করতে পারে না।
ব্রিটিশ আমলে করা আইন ও কারাবিধির বর্তমান প্রেক্ষাপটে নানা অসঙ্গতির কথা তুলে ধরতে গিয়ে বিচারপতি এস কে সিনহা আদালতের বাইরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাবজ্জীবন কারাদন্ড নিয়ে বিভ্রান্তির কথা বলে আসছিলেন। ২০১৬ সালের ২৬ জুন গাজীপুরে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ‘যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত আসামি বলতে আপনারা মনে করেন ৩০ বছর। ধরে নেয়, সব জায়গায়। প্রকৃতপক্ষে এটার অপব্যাখ্যা হচ্ছে। যাবজ্জীবন অর্থ হলো একেবারে যাবজ্জীবন, রেস্ট অফ দ্য লাইফ’। এরপর আদালতে দেওয়া রায়েও একই মত প্রকাশ করেন তিনি।
ওই রায় প্রকাশের পরদিন তার ব্যাখ্যায় অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, আপিলে যাদের মৃত্যুদন্ডের সাজা কমে যাবজ্জীবন কারাদন্ড হবে, শুধু তাদের ক্ষেত্রেই আমৃত্যু কারাগারে কাটাতে হবে। আর বিভিন্ন মামলায় যাদের যাবজ্জীবন সাজা হবে, তাদের মৃত্যু পর্যন্ত কারাগারে থাকতে হবে না। দন্ডবিধি অনুযায়ী ৩০ বছর জেল খেটেই বের হবেন তারা। খবর বিডিনিউজের