যানজট দুর্ভোগে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

12

 

ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পায়ন, নগরায়ণের ব্যাপক বিস্তারের পাশাপাশি সড়কে গাড়ির সংখ্যাও দিন দিন বেড়েই চলেছে। কিন্তু সে তুলনায় বাড়েনি গণপরিবহন, উন্নত হয়নি সেবার মান। সড়কে চলাচলকৃত নিবন্ধিত যানবাহনের বেশির ভাগ জুড়ে রয়েছে নানা রকম ব্যক্তিগত বাহন। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় কমসংখ্যক গণপরিবহন ও অধিকসংখ্যক ব্যক্তিগত যানবাহন গুরুত্বপূর্ণ শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে দিন দিন জটিল করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে সড়ক স¤প্রসারণ, ফ্লাইওভার নির্মাণসহ একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন সত্তে¡ও যানজটের তীব্রতা যেন দিন দিন বেড়েই চলেছে। এতে করে নির্বিঘেœ যাতায়তের পরিবর্তে যানজট যেন সড়কের ভয়ানক এক নিত্যসঙ্গী।
দীর্ঘক্ষণ যানজটে একটানা বসে থাকার দরুন সঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারা মানুষের মনের মধ্যে উদ্বিগ্নতা, হতাশা ও বিষন্নতার সৃষ্টি করে। এতে করে ব্যক্তির মধ্যে তৎক্ষনাৎ মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়ে স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে যা ব্যক্তির আচরণে প্রকাশ পাই। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা জিপজেটের তথ্যমতে মানসিক চাপের শহরগুলোর মধ্যে রাজধানী ঢাকার অবস্থান সপ্তম যার মূল কারণ দেখানো হয়েছে নিত্যদিনের যানজটকে। স¤প্রতি ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহর হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়া থেকে বুঝা যায় ঢাকা শহরের অধিবাসীরা কতটা মারাত্মক পরিবেশ দূষণের মধ্যে আছে। এ থেকে অন্যান্য শহরগুলোর ধারণা নিয়ে আধুনিক পরিকল্পনা গ্রহন করা জরুরি।
যানজটের প্রভাবে যে কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় তা না, নানান স্বাস্থ্য ঝুঁকিও ইতোমধ্যে বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপে উঠে এসেছে। কানাডার সেন্টার ফর ড্রাগ এডিকশন এন্ড মেন্টাল হেলথ্ (সিডিএএমএইচ) এর তথ্যানুযায়ী নিয়মিত যানজটে মানসিক অস্থিরতা বাড়ে ৩ গুণ পর্যন্ত এবং বিষন্নতার ঝুঁকি বাড়ে প্রায় ৫০ শতাংশ। আর নিয়মিত যানজটের বিরক্তি থেকে সংসার ভাঙার ঝুঁকি বাড়ে প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। যানজটের ভয়াবহ ভোগান্তির তথ্য মেলে যখন গবেষণা জরিপে উঠে আসে গাড়ির ঘণ্টা প্রতি গতি একজন সুস্থ মানুষের হাঁটার গতির চেয়ে কম।
যানবাহন দীর্ঘ সময় ধরে একই স্থানে আটকে থাকার ফলে দূষিত ধোঁয়া ওই স্থানের আশেপাশে ঘুরপাক খায়, কারণ যানজটে প্রায় গাড়ির ইঞ্জিন চালু থাকে। ফলে নিজের এবং আশপাশের সবার গাড়ির ধোঁয়া একত্রে প্রশ্বাসে চলে আসে। এছাড়া বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে রাস্তায় ধূলাবালির কুয়াশাছন্নতা মারাত্মকভাবে পরিবেশকে দূষিত করছে। এজন্য ট্রাফিক জ্যামে বসে থাকাকালীন মানুষ দূষণে বেশি এক্সপোজড হয়। এতে করে মানুষ ফুসফুসের অসুখসহ নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
সাধারণত গাড়ি এক যায়গায় আটকে থাকার কারণে যে ধোঁয়া নির্গত হয় সেটিকে বলা হয় ইন-কমপ্লিট কমবাস্টন। এতে কার্বন মনোক্সাইড, ডাইঅক্সিন, নাইট্রিক অক্সাইড, সালফার অক্সাইড এরকম নানা গ্যাস বাতাসের সাথে মানুষের ফুসফুসে চলে যাচ্ছে।
এছাড়া গাড়ির ধোঁয়ায় রয়েছে বিষাক্ত সীসা। উচ্চ মাত্রায় সীসা মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের উপরও প্রভাব ফেলে। বহুদিন সীসাযুক্ত বাতাসে নিশ্বাস নিলে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা কমে আসে, কিডনি, হৃদযন্ত্র, প্রজননতন্ত্রের কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।
সীসা বিশেষ করে শিশুদের বেশি আক্রান্ত করে কেননা প্রাপ্ত বয়স্কদের শরীরে রক্তের সীসা মস্তিষ্কে পর্যন্ত পৌঁছানো প্রতিরোধের ব্যবস্থা শক্তিশালী থাকলেও শিশুদের ক্ষেত্রে তা পুরোপুরি তৈরি হয়না। এতে শিশুদের বুদ্ধিমত্তা বিকাশ বিঘিœত এবং স্নায়ুবিক ক্ষতি হতে পারে।
এছাড়া ট্রাফিকে আটকে থাকা অবস্থায় এবং হঠাৎ জট খুলেও গেলে গাড়ির চালকদের গাড়ির হর্ন বাজানোর প্রবণতা বেশি থাকে। এতে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাথে চালক ও যাতায়াতকারীদের মেজাজ খিটখিটে হওয়া, স্বাভাবিক কাজকর্মে মনোনিবেশ হারানো , উচ্চ রক্তচাপসহ নানান শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি দেখা দেয়।
করোনা পরবর্তী সময়ে বিশেষ করে স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত সব পুনদ্যমে চালু হওয়ায় যানজট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এখন ছুটির দিন বাদে বাকি সব দিনই নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবে পরিচিত বন্দরনগরী চট্টগ্রামের যানজটের চিত্রও দিন দিন ঢাকার মতো হয়ে উঠছে। এখানকার যাত্রীদের অভিযোগ, বাস-মিনিবাস কম থাকায় নগরীতে অননুমোদিত ছোট গাড়ির দাপট বেড়েছে। এতে যাতায়াতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন তারা। বিশেষ করে অফিসগামী, স্কুল-কলেজগামী যাত্রীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। যাত্রীর তুলনায় কম যানবাহন ও ছোট গাড়িতে গাদাগাদি করে অস্বস্তিতে যাতায়াত করতে গিয়ে তাদের সময় অপচয় ও অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই বাহনগুলো ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ যাত্রী পরিবহন করে থাকে। একে তো যাত্রীর তুলনায় আয়তনে সংকীর্ণ সিট, সাথে অধিক যাত্রীর চাপে যাতায়তে সীমাহীন দূর্ভোগ পোহাতে হয় যাত্রীদের। প্রায়শই ঝুলে ঝুলে ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে দেখা যায় যাত্রীদের। অন্যদিকে সড়কে যেসব গণপরিবহন তথা বাস-মিনিবাস, অটোরিক্সা প্রভৃতি চলাচল করে, সেসব সড়কেও বিভিন্ন কারণে প্রায়ই যানজট লেগে থাকে। ফলে স্বল্প সময়ের পথ পার হতে কখনো কখনো দীর্ঘ সময় লেগে যায়। শুষ্ক মৌসুমে বা গরমের দিনে যাত্রীদের দুর্ভোগের যেন অন্ত থাকে না যখন গাড়িতে সংকীর্ণ সিটে বসে কিংবা ঠেসাঠেসি করে দাঁড়িয়ে রাস্তার ধূলাবালির সাথে গাড়ির কালো ধোঁয়া মিশ্রিত উৎকট পরিবেশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাত্রাতিরিক্ত হর্ণের মধ্যে অতিবাহিত করতে হয়।
বন্দরনগরী চট্টগ্রামের যানজট নিরসনে যে সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন, তার ঘাটতি এখানে প্রকট। চট্টগ্রামে নিবন্ধিত মোটরযানের সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখের মতো। কিন্তু সে তুলনায় সড়ক বাড়েনি; বাড়ানো সম্ভবও নয়। সে ক্ষেত্রে গণপরিবহনসেবা যত উন্নত হবে, মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারে ততই নিরুৎসাহিত হবে। সড়কও যানজটমুক্ত হবে। অবৈধ দখল, রাস্তার ওপর পার্কিং, যত্রতত্র নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা, বাস বা অন্য গণপরিবহনে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে।
নগরীতে ব্যক্তিগত যান ব্যবহারকারীর তুলনায় গণপরিবহনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। তাই গণপরিবহনের সংখ্যা বাড়াতে ডিটেইল প্ল্যান তৈরির তাগিদ বিশেষজ্ঞদের। সেই সঙ্গে ব্যক্তিগত যান ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করার কথাও বলছেন তারা। এতে করে অধিক হারে কার্বন নিঃসরণ ও জ্বালানি ব্যবহারের উপরও চাপ কমানো সম্ভব হবে।
তাই যত দ্রুত সম্ভব যানজট নিরসনে কার্যকর কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক হওয়া জরুরি।

লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়