ময়ুখ চৌধুরীর কবিতায় রাজনীতি

33

করিম রেজা

আধুনিক কবিদের কাব্যজগতের একটি অংশজুড়ে আছে রাজনৈতিক চেতনার কবিতা। অনেক সময় দেখা যায় প্রেম বা প্রকৃতির কবিতাতেও হঠাৎ একটি রাজনৈতিক পঙক্তি মাথা তুলে আছে। রাজনৈতিক কবিতা বলতে স্পষ্টত কী বোঝায় তা ব্যাখ্যা করার জন্য বিস্তৃত পরিসর দরকার। সাধারণভাবে যেসব কবিতারাষ্ট্রাচারের তত্ত্ব, ক্ষমতা, জনতা এবং সমাজব্যবস্থা সম্পর্কিত, সেসব কবিতাকে আমি রাজনৈতিক কবিতার তালিকায় বিবেচনা করব। ক্ষমতাকেন্দ্রের ঘাত-আঘাতের কবিতাগুলোও নিরীক্ষণ করবো এখানে।এই চৌহদ্দিতেই থাকবে রাজনৈতিক তত্ত¡ এবং অর্থনৈতিক দর্শন। কেননা রাজনীতির সাথে অর্থনীতির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। আদিকাল থেকেই অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রাজনৈতিক দর্শন। রাজনৈতিক বিভাজনও মূলত অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বিভাজনপ্রসূত। তবে কবিতার অনুষঙ্গ হয়ে যখন রাজনীতি আসে তখন তত্তে¡র চেয়েও বেশি বিচার্য এর সাহিত্যগুণ। কবিপাঠককে অভিধানের বাইরে বা তত্তে¡র সীমারেখার বাইরে এনেকতদূর ভাবাতে পারল- এখানে পর্যালোচনা হবে তার।
মূল পর্যালোচনায় প্রবেশের আগে ময়ুখ চৌধুরীর সর্বশেষ প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ অনিদ্রার কারুকাজ থেকে একটি কবিতা নিয়ে প্রাক-আলোচনা করে নেই। কবিতাটির নাম ‘মানুষেরা পারে’।মানুষ পশুপালনবিদ্যা আয়ত্ত করার পর দাস-সভ্যতার পরাজয় বা পরাভবের ইঙ্গিত আছে এই কবিতায়। আমার কাছে মনে হয়েছে এটি মানুষের অর্থনৈতিক পালাবদলের সম্ভবত প্রথম উদাহরণযোগ্য দৃষ্টান্ত। কেননা এখানে ক্ষমতা এবং জনতা- দুটোই কাব্যিক অলঙ্কারে চমক সৃষ্টি করেছে সামান্য পরিসরের ভেতরেই। অথচ যার দ্যোতনা সুদূরপ্রসারী:
অহংকারী পিরামিড মাথা তুলে দেখে একদিন
মানুষেরা পায়ে পায়ে পার হয়ে যায় নীলনদ
নীলের সীমানা।
সাঁতার জানে না বলে নদীরা সমুদ্রে ডুবে যায়,
মানুষেরা পার হতে পারে।
নদী সমুদ্রে ডুবুক বা দোর্দন্ড ফারাও ভূমধ্যসাগরে তলিয়ে যাক সেদিকে আর যাবো না। তবে মানুষ যখন নদী জয় করল, সাগর জয় করল, তারপর মানবসভ্যতার ইতিহাস, মানুষের অর্থনীতির ইতিহাস আমূল বদলে গেল। রাজনীতিরও পালাবদল হতে শুরু করল এখান থেকে।
উপরোক্ত আলোচনা দিয়ে আমি মূলত একটি প্রাক-সিদ্ধান্তে আসতে চেয়েছি ময়ুখ চৌধুরীর কবিতার রাজনৈতিক প্রেক্ষিতকে কোন দিকে রাখবো। তিনি কি জাতীয়তাবাদী কবি, না-কি মার্কসবাদী কবি, না-কি মানবতাবাদী কবি? প্রলেতারিয়েত আর বুর্জোয়া- তাঁর কবিতায় কাদের উচ্চারণ বেশি। ময়ুখের সবগুলো রাজনৈতিক কবিতা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে তিনি জাতীয়তাবাদী, মার্কসবাদী এবং পুঁজিবাদী- তিন শ্রেণির অনুষঙ্গ নিয়েই কবিতা লিখেছেন। তবে আমার প্রাক-আলোচনা নিশ্চিতভাবে ইঙ্গিত করছে ময়ুখ চৌধুরী মানুষের শক্তির ওপর দৃঢ় আস্থাশীল একজন কবি। দোর্দÐপ্রতাপ শক্তিকে সাধারণ মানুষ কীভাবে জলে ভাসিয়ে দিল তা প্রথমোক্ত কবিতাটিতেই স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়েছে।
চারু মজুমদারকবিতাটি (কালো বরফের প্রতিবেশী কাব্যের প্লাবনের পটভ‚মি অংশের সর্বশেষ কবিতা) ময়ুখকাব্যের রাজনৈতিক পক্ষপাত নির্ণয়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতা। গদ্যছন্দে লেখা এই কবিতাটিতে আমৃত্যু আপোসহীন বিপ্লবী চারু মজুমদারকে সূর্যের উপমা দিয়ে বর্ণনা করেছেন। ‘আমরাও; সূর্যের কাছ থেকে দূরে, অথচ তার আলোর কত কাছাকাছি!’ একজন রাজনৈতিক নেতাকে কত আপন করে নিলে পরে এমনভাবে পঙক্তি সাজানো যায়! তারপর কী বলছেন লক্ষ করুন: ‘কালরাতে চতুষ্পদ গাড়ি এসে সূর্যকে তুলে নিয়ে গেছে। পাড়াটা আজ খাঁ খাঁ করছে। ভুল সূর্যে পুড়ে যাচ্ছে সবুজ সংসার।’ সেই সূর্যের আলো এমনভাবে ছড়াতে লাগল যেন সেই আলো নেভানোর জন্য পুলিশের নিরন্তর চেষ্টাবিফলে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। ‘প্রতিরাতেই পুলিশের গাড়ি এসে তুলে নিয়ে যাচ্ছে ঐরকম চেহারার এক-একজন মানুষ। আর তার পরদিনই ঐ রকম চেহারা দু’জন করে মানুষ এসে যাচ্ছে সেই ঘরে। দেখতে দেখতে এ-পাড়া ও-পাড়া সব পাড়ার লোকগুলোর গাল বসে যাচ্ছে, চোয়াল উঁচু হয়ে উঠছে, লাল মার্বেলের মতো জ¦লে উঠছে জোড়া জোড়া চোখ।’
কালো বরফের প্রতিবেশী কাব্যের ‘স্মৃতি ও স্বপ্নের বাংলাদেশ’ কবিতায় রাজনৈতিক মাইলফলকের অবিস্মরণীয় বছরগুলো দুই দুই পঙক্তিতে বিন্যস্ত হয়েছে। তবে ১৯৫২ সালের ওপর লিখেছেন চার পঙক্তি। বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার আরেকটি মাইলফলক হলো ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন। ১৯৬৬ শিরোনামের পঙক্তি দুটো এরকম:
এবার জ¦লতে দাও জোনাকীকে তার অধিকারে,
মধ্যযুগী উট কেনো ঘাসের সবুজ কথা কাড়ে!
জোনাকী, মধ্যযুগী উট এবং ঘাস- এই তিনটি শব্দের পেছনের লক্ষ্যার্থ যদি আমরা পর্যালোচনা করি তাহলে যথাক্রমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এবং আপামর বাঙালি জনগোষ্ঠী যেন এই দুটি পঙক্তিতেই কাব্যিক প্রতীক ও উপমায় উঠে এসেছে।
মার্কসবাদী এবং পুঁজিবাদী দ্ব›েদ্বর ভেতরেও ময়ুখ চৌধুরী মানুষকে ‘চিরন্তন মানুষ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন কালো বরফের প্রতিবেশী কাব্যের ‘বিশ^শান্তি সম্মেলন, বিতর্কিত প্রেমিক-প্রেমিকা,এবং মার্কসবাদী ও পুঁজিবাদী তাত্তি¡কের গল্প’ কবিতায়। এই কবিতায় একেকটা পতাকাকেবৈশ্বিক অনৈক্যের একেকটি প্রতীকরূপে কবি চিহ্নিত করেছেন। ‘বিচিত্র পতাকা সব সকলের নাকের ডগায়/অনৈক্যের দুর্গন্ধ ছড়ায়,/ক্যাবারে মেয়ের মতো রুম-নম্বর থার্টিনের নিতম্ব দোলায়।’তবে কবিতাটির মূল সৌন্দর্য তন্ত্র-মতবাদ আর রাজনৈতিক ক‚টচালের ঊর্ধ্বে দুজন মানব-মানবীর প্রণয়সত্য নির্ণয়ের মধ্যে। প্রথমেই উল্লেখ করেছি, ময়ুখ চৌধুরীর আস্থা সবসময় মানুষের ওপর; যাবতীয় মতবাদ যেখানে বিপরীত পাতায় চাপা পড়ে থাকে। কবিতার পঙক্তিতেই দেখা যাক তার পরিবেশন:
সব রাজনীতিজীবী, ধনবাদী গবেষক, মার্কসবাদী সমাজতান্ত্রিক
সবকিছু দেখে যাচ্ছে নিজ নিজ রাজনীতির অকাট্য ধারায়;

একটি তরুণ আর একটি তরুণী
আদম-হাওয়ার মতো মুখোমুখি হয়েছিল স্বর্গভ্রষ্ট লেকের কিনারে,
ছেলেটির মৃদু হাসি, মেয়েটির চোখের কালোয়
মানচিত্র-নিরপেক্ষ দূর আকাশের তারা কেঁপে উঠেছিলো।

আলিঙ্গনে বর্বরতা, চুম্বনের ধ্বনি,
স্তনের কম্পিত ভাষা, নখের রক্তিম আলপনা,
নদী ও নৌকার মতো শরীরের আপেক্ষিক দোলা,
পারদের মতো বৃষ্টি, অক‚টনৈতিক শিহরণ,
আদম-হাওয়ার মতো চিরন্তন পাপের গৌরব।-
এইসব দৃশ্যমালা, অভিব্যক্তি- পুঁজিবাদী নাকি মার্কসবাদী?
ততক্ষণে রাজনীতিজীবীদের আর গবেষকদের তৎপরতা এগিয়ে গেছে বহুদূর। কিন্তু ততক্ষণে সবকিছু তুচ্ছ করে সেই ‘তরুণ-তরুণী দু’টি মধুর মধুর ক্লান্তির শেষে ঘুমায়, ঘুমায়।’ কবিতার সবরকম সৌন্দর্যের বিচারে এই কবিতাটি অনন্য।
মার্কসবাদের প্রতি ময়ুখ চৌধুরীর স্পষ্টত অবস্থানের ইশতেহার আছে প্যারিসের নীলরুটি কাব্যের ‘কার্ল মার্কস জেনিকে যা বলতে পারতো’ কবিতায়। কবি যার সাথে স্বপ্নের শয্যায় যেতে চান তিনি ‘প্রচলিত প্রথার’ পক্ষে এক প্রতিক্রিয়াশীল ‘রূপেগুণে কিছু বাড়াবাড়ি’ নারী। কবি বলেন ‘শস্য ও শ্রমের পক্ষে কথা’। কিন্তু রূপসীর তা ভালো লাগে না:
অতএব আমাদের নেই কোনো মিল।
দু’জনের পথচলা বামে আর ডানে;

বামপন্থী শুনলেই কেনো মনে জাগে এতো ভয়!
বাম যদি মন্দ তবে বামে কেনো মানবহৃদয়?
কবিতাটি মার্কসবাদের প্রতি কবির মমত্ববোধও তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান পর্যালোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য অনুষঙ্গ হতে পারে। রাশিয়া মুক্তবাজার অর্থনীতিতে প্রবেশের প্রায় দশ বছর পর (২০০০) ক্ষুব্ধকণ্ঠে কবি জানতে চান:
পিতাপুত্র এবং গাধার
গল্পের মতন তুমি করলে তো অনেক কিছুই,-
দরোজাটা খুলে দিয়ে সম্ভ্রমের গৃহকে উজাড়,
অনেক গাধার স্বার্থে বিসর্জন দিয়েছো ভলগায়-

কেমন আছে দরোজাটা, টুথপেস্ট, জিন্সপ্যান্ট আর
সাইবেরিয়ার ঠান্ডা জেব?
(কেমন আছো রাশিয়া/প্যারিসের নীলরুটি)
রাশিয়ায় কম্যুনিজমের পতনের পর দুনিয়ার সকল মার্কসবাদীই এমন অন্তর্দহনে ভুগেছেন। ‘যাদের রক্তের পুঁজ/মুক্তবাজারের নামে গড়েছে হেরেম অর্থনীতি,/এখন সে-সব/তৃপ্তকাম বাদুড়েরা উল্টো ঝুলে আছে দেখো মাথার ওপর।’ বলাবাহুল্য, সাম্প্রতিক রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মূল কুশীলবই হলো সেইসব ‘তৃপ্তকাম বাদুড়েরা’। ন্যাটো নামে যে জোট বিশ^ব্যাপী সামরিক রাজনীতির কলকাঠি নাড়ছে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর ময়ুখ চৌধুরীর দুটি কবিতা উল্লেখ করা যায়। একটি হলো কালো বরফের প্রতিবেশী কাব্যের ‘স্বাধীনতা, প্রিয় স্বাধীনতা’ এবং অন্যটি আমার আসতে একটু দেরি হতে পারে কাব্যের ‘চলো যাই মুক্তিযুদ্ধ’। প্রথম কবিতাটি শামসুর রাহমানের তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা (বন্দী শিবির থেকে) কবিতার স্পষ্টত প্রভাবপুষ্ট। ১৯৮৩ সালে এসে কবির প্রায় ঋদ্ধ কবিত্ব সত্তার বয়সে এমন প্রভাবপুষ্ট কবিতা আমাদেরকে বিচলিত করে। অন্যদিকে ‘চলো যাই, মুক্তিযুদ্ধ’ কবিতাটাও স্লোগানমুখর। যা ময়ুখীয় মেজাজের সাথে বেমানান। যেসব পাঠক ময়ুখ চৌধুরীর অন্তত একশটি কবিতা পাঠ করেছেন তারা এই কবিতা পাঠ করতে গিয়ে নিশ্চিতভাবে হোঁচট খাবেন।
আমার আসতে একটু দেরি হতে পারে কাব্যের ‘নূর হোসেন, সংসদে যাবে না?’ কবিতাটি ব্যাপক আবৃত্তিযোগ্য একটি রাজনৈতিক কবিতা। নূর হোসেন, গণতন্ত্রের জন্য যিনি রাজপথে প্রাণ দিয়েছিলেন- তাঁকে এই কবিতায় কবি প্রায় চিরন্তন করে তুলেছেন। যখনই এই কবিতা পঠিত হবে তখনই পাঠকের মনে হবে নূর হোসেন যেন তার নিকট স্বজন। সেই
স্বজনের জিজ্ঞাসা:
বিশাল অপরিচিত দামি ভারী দরোজাটা বন্ধ হয়ে গেলে
গণতন্ত্র জমে যাবে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে।

আঙুলে আঙুলে কালি, আজ আর কেউতো ভাবে না
জিরোপয়েন্ট পড়ে থাকে, কেউ কিছু ভাবে না, ভাবে না;
নূর হোসেন, কখনো কি সংসদে যাবে না?
কৃষক-শ্রমিক কেন অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষা! একদল অপরাধী যেন তেমনই করতে চেয়েছিল ১৯৭৫ সালে। শোষিত, বাঞ্চিত একটি জাতিকে যিনি নিজের পায়ে দাঁড়াবার জন্য টেনে তুলেছিলেন তাকেই কেন রক্তের লাল নদীতে ভাসতে হলো! ১৯৭৫ সালের আগস্টবেদনার ওপর অনন্য এক কাব্যিক আয়োজন চরণেরা হেঁটে যাচ্ছে মুÐহীন কাব্যের ‘অপরাধ ১৯৭৫’ কবিতাটি। ‘কোন অপরাধে বলো, রাতের আকাশে আজও/নক্ষত্রের ভেজাচোখ জ¦লজ¦ল করে?’ এই জিজ্ঞাসার সন্দিগ্ধ প্রতি-উত্তর, ‘দোঁ-আশ মাটির বুক চিরে/সবুজের প্রতিশ্রæতি তুলে আনে যারা,/তাদের ঘর্মাক্ত হাতে শিউলির সকাল তুলে দেওয়া-/এতোই দোষের!’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মর্মান্তিক হত্যাকান্ড নিয়ে বাংলা সাহিত্যে অজ¯্র কবিতা রচিত হয়েছে। সেসব কবিতার মধ্যে শব্দের জ্যামিতি ছাড়িয়ে যাওয়াএমন ক্ষোভ আর বেদনার কবিতা বিরল।
অপরাজনীতির শিকার বিশ^জিৎকেও (বিশ^জিৎ দাস, একজন নিরপরাধ দর্জি। যাকে ২০১২ সালে প্রকাশ্য দিবালোকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়) ময়ুখ চৌধুরী নিদারুণ বেদনায় কবিতায় তুলে এনেছেন। তাকে নিয়ে দুটি কবিতা আছে চরণেরা হেঁটে যাচ্ছে মুন্ডহীন কাব্যে। কবিতা দুটি হলো ‘দর্জির ছেলের মৃত্যু’ এবং ‘বাড়িফেরা’। বিশ^জিৎ রাত্রি জেগে কাপড় কেটেছে যাদের জন্য তারাই যেন দিনের আলোতে তাকে ফালি ফালি করে কেটেছে পাশবিক হিংস্রতায়! ‘আমাদের বন্যতা তোমার বদান্যতার কথা মোটেও ভোলেনি,/তাই/ঋণপরিশোধের যথাসাধ্য চেষ্টাও করেছি।/তুমি রাত্রি জেগে কাপড় কেটেছ,/আমরাও কেটেছি দিনের আলোতে প্রাকৃতিক আবরণ।’ (দর্জির ছেলের মৃত্যু/চরণেরা হেঁটে যাচ্ছে মুÐহীন) আর এই প্রাকৃতিক আবরণ হলো বিশ^জিতের প্রকৃতি প্রদত্ত নিরীহ শরীর।
বিশ্বজিৎ দাস অপরাজনীতির শিকার না-কি অপগণতন্ত্রের শিকার? এই প্রশ্নটি ব্যাপক বিতর্কযোগ্য। তবে ময়ুখের কবিতায় গণতন্ত্র কীভাবে বিবৃত হয়েছে তা একটু দেখে নেওয় যাক:
তবুও দশ প্রেমিকের বাজারী গণতন্ত্রে
আমার নিঃসঙ্গ ভালোবাসা শেষপর্যন্ত
মুখথুবড়ে পড়ে থাকে শুধু।
কারা যেন শকুনের মতো খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে
দশ কোটি হৃৎপিন্ড আর অধিকার।
এইসব শকুনের সঙ্গে গণতন্ত্র ভাগাভাগি করে
বেঁচে-থাকা হবে না আমার।
আমি ঢুকে পড়েছি বন্দুকের নলের মধ্যে
আরেক জন্মের জন্যে।
(জন্মান্তর/কালো বরফের প্রতিবেশী)
রাজনৈতিক কবিতা বিবেচনায় ময়ুখ চৌধুরী মানুষের কবি; বিপন্ন, বাস্তুচ্যুত মানুষের কবি। মার্কসবাদকে তিনি আলিঙ্গন করেছেন পরম মমতায়। চারু মজুমদারের মতো সূর্যতুল্য মানুষকে তিনি কবিতায় সাজিয়েছেন মানুষের জন্যই।কেননা মার্কসবাদীরাও মানুষের কাছ থেকে যখন দূরে সরে গিয়েছিল তখনও বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভেতর দেখেছেন জোনাকীর আলো। দেখেছেন গণতন্ত্র ফিরে আসতে না আসতেই নূর হোসেনকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছে গণতন্ত্রওয়ালারা। আর বিশ^জিৎ দাস নিজেই বিপন্ন মানুষ; যিনি রাজনৈতিক পাÐাবাহিনীর নির্মম নিষ্ঠুরতার শিকার।