ময়না

15

একদিন ময়নার ছোট মামীকে নিয়ে ময়নার বাবা দূরে কোথাও পালিয়ে গেলেন। কোথায় গেলেন, কেমন দিনকাল যাচ্ছে – কিছুই জানা হলোনা।
ময়নার বাবা মা প্রেম করেই পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন। তিন-চার বছর না যেতেই ভালোবাসার বাঁক বদল।
ময়না এসবকিছু বুঝেনা। বয়স মাত্র তিন বছর। ময়নাকে নিয়ে মায়ের কোনো রকম দিন কাটছিলো। মা-ও একদিন রাতের অন্ধকারে পাশের বাড়ির এক ভাড়াটিয়া দু’সন্তানের জনকের হাতধরে কোথায় যেন পাড়ি জমালেন।মধ্যরাতে ময়নার একাকী ঘরে চিৎকারের আওয়াজ শোনে প্রতিবেশীরা এগিয়ে এলেন।
ঘটনা পত্র-পত্রিকায় ভাইরাল হলেও বাবা মা কেউই ফিরে আসেনি। ময়নার অসহায় চিৎকার আকাশে মিলিয়ে গেলো। অবশেষে সন্তানহীন এক স্কুলশিক্ষক ময়নাকে দত্তক নিলেন।
ময়না এখন পেছনের সব ঝেড়ে ফেলে পড়াশোনা করে একজন নামকরা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। এখন তার সবই আছে; শৈশবের পিতৃ-মাতৃহীনতার দীর্ঘ-নিশ্বাস টুকুও জীবনের সাথে লেপ্টে আছে।
পৃথিবীর দেশেদেশে নোভেল-করোনা ভাইরাসে লন্ডভন্ড পরিস্থিতি। দেশেও ত্রাহি অবস্থা। ময়না একজন জাতির সাহসী করোনা-যোদ্ধা।
কাকতালীয়ে ভাবে ময়নার বাবাকে চট্টগ্রামে ও মাকে শেরপুরে করোনা আক্রান্তের সন্দেহে পরিত্যাক্ত অবস্থায় জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হলো। উভয়ের সন্তানেরাই তাদেরকে জঙ্গলে ফেলে দিয়েছিলো। উভয় ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়ে। সন্তানদের এমন বিবেকহীন কাজ পৃথিবীশুদ্ধ মানুষকে স্তব্ধ করে দিলো।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপে তাদের করোনা রোগী সন্দেহে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এনে নামকরা হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। সংবাদ মাধ্যম ইতিবৃত্ত সংগ্রহে হুমড়িখেয়ে পড়ল। পত্রিকায় পড়ে ময়না কিছুক্ষণের জন্য বাকহীন তাকিয়ে রইলো। অক্ষরগুলো ঝাপসা লাগলো। চোখের পানিতে পত্রিকার পাতা ভিজে গেলো। বিধাতার খেলা বুঝা দায়। গতকালও ময়না তাদেরকে চিকিৎসা দিয়ে এসেছে।
ময়না সকালের খাবার টেবিলে সাজানো রেখেই উর্ধশ্বাসে গাড়ি ড্রাইভ করে হাসপাতালে ছুটে যায়। গণমাধ্যম কর্মীর ভিড়, প্রশাসন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও উৎসুক রোগীদের টেলে ময়না পাগলিনী বেশে ওদের কাছে পৌঁছে।
এদিকে তাদের পরীক্ষার রিপোর্ট আসে, করোনা নেগেটিভ।
ময়না চোখমুছে টানটান চোখে দু’জনকে প্রশ্ন করে, ‘আপনারা যৌবনে সর্বনাশী ভাঙ্গা-গড়া খেলায় মজে যে শিশু-সন্তানটির সকল অধিকার পদদলিত করে, মৃত্যুর মুখে টেলে দিয়ে ফেলে এসেছিলেন, সে কি বেঁচে আছে? বলতে পারেননা, তার কী নাম ছিলো? তাও মনে নেই?’
হতবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে একসাথে জবাব এলো,-‘মুনমুন, ডাকনাম- ময়না।’
‘ময়নাকে দেখলে চিনতে পারবেন?’
দু’জনেই নীরব।
‘চিনবেন কী করে? চেনার অধিকারও হারিয়েছেন। সে-ই ফেলে দেয়া ময়না এই মুহূর্তে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মুখের খাবার ফেলে খবর পেয়ে ছুটে এসেছে। বিধাতার বিধানে আজ আপনারা জঙ্গলে পরিত্যক্ত আবিস্কৃত হলেন।
দু’জনেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন।
– ‘আমি বিধাতার কাছে নালিশ দেবো, আমাকে বাঁচিয়ে রেখে কেন আমার বাবা-মাকে জঙ্গলে পরিত্যক্ত করলেন? এ দৃশ্য দেখার আগে কেনো আমার মৃত্যু হলোনা?’
কান্না আরো ভারী হলো।
– ‘আপনাদের জন্য আমার গাড়ি প্রস্তুত। কী করবেন? যাবেন আমার সাথে?’
দু’জনেই মুখ ফিরিয়ে নিলেন। অঝোরে কাঁদলেন।
– ‘আমরা কোথায় যাবো? তোমার কাছে যাওয়ার অধিকার কই?’
– ‘আমাকে আর পাপী না বানিয়ে দয়া করুন। উঠুন গাড়িতে।’
ময়না দু’জনকে জড়িয়ে কাঁদলো। গাড়ি মিলিয়ে গেল পথের বাঁকে। দাঁড়ানো সকলেই কেঁদে নিল।
পরদিন সংবাদপত্রের শিরোনাম হলো,‘জঙ্গলে পরিত্যক্ত উদ্ধার আলোচিত দু’জন, দেশখ্যাত বিশেষজ্ঞ ডাক্তার মুনমুন ইসলাম ময়নার মা ও বাবা।’